
সুরমা টাইমস ডেস্কঃ সিলেট নগরীতে হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ, বকেয়া সমন্বয় ও নতুন হোল্ডিং নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, হয়রানি ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সহকারী কর কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমানের নেতৃত্বে আব্দুল বাসিত, বাবলু ও কবিরকে নিয়ে গড়ে ওঠা একটি সিন্ডিকেট নগরীর বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বড় ভবন মালিককে টার্গেট করে অতিরিক্ত হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ করছে এবং পরে ঘুষের বিনিময়ে কর কমিয়ে দিচ্ছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, নগরীর ২৭টি ওয়ার্ডে বড় ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ইচ্ছাকৃতভাবে বেশি হোল্ডিং ট্যাক্স আরোপ করা হয়। সংশ্লিষ্ট মালিকদের কাছে নোটিশ পাঠানোর পর তাঁরা করের পরিমাণ ও বকেয়া দেখে সিটি কর্পোরেশনে যোগাযোগ করলে তাঁদের সহকারী কর কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমানের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তাঁর সহযোগী আব্দুল বাসিত, বাবলু ও কবিরের মাধ্যমে গ্রাহকদের সঙ্গে টাকার অঙ্ক নিয়ে সমঝোতা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, মোটা অঙ্কের টাকা দিলে চার কর্মকর্তা রিভিউয়ের মাধ্যমে হোল্ডিং ট্যাক্সের পরিমাণ কমিয়ে দেন। তবে টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে কর কমানো হয় না, বরং গ্রাহকদের হয়রানির শিকার হতে হয়। এভাবে তাঁদের কাছে নগরবাসী জিম্মি হয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
আরও অভিযোগ করা হয়েছে, বড় ভবনগুলোর পুরোনো হোল্ডিং ট্যাক্সের বকেয়া ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা হয়ে গেলে ওই সিন্ডিকেট অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো বকেয়া পরিশোধ না করিয়েই নতুন হোল্ডিং নম্বর দিয়ে দেয়। টাকা নিয়ে পুরোনো হোল্ডিং নম্বর গায়েব করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এতে সরকার ও সিলেট সিটি কর্পোরেশন বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়ে ওই চার কর্মকর্তা নিজেদের নামে বিলাসবহুল বাড়ি ও গাড়ি করেছেন। তবে এসব সম্পদ ও অভিযোগের বিষয়ে কোনো স্বাধীন তদন্তের ফলাফল বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
সিলেট নগরীতে হোল্ডিং ট্যাক্স বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে এর আগেও একাধিকবার আন্দোলন ও প্রতিবাদ হয়েছে। ২০২৪ সালে নগরের বিভিন্ন এলাকায় হোল্ডিং ট্যাক্স ৫ থেকে ৫০০ গুণ পর্যন্ত বাড়ানোর অভিযোগে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয় এবং নতুন কর বাতিলের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়।
অভিযোগ রয়েছে, চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের পর সিলেট সিটি কর্পোরেশন তদন্ত কমিটি গঠন করলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগ ও নানা ধরনের প্রভাব খাটিয়ে তাঁরা তদন্ত কার্যক্রম থামিয়ে দেন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। ফলে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা পদে বহাল থেকে একইভাবে নগরবাসীর কাছ থেকে অর্থ আদায় করে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
২০২৫ সালের ৯ জুন মানবজমিনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তাঁদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরা হয়। একই বছরের ২২ জুন ও ৩ জুলাই শ্যামল সিলেটেও তাঁদের কথিত দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর সিলেট সিটি কর্পোরেশন তদন্ত কমিটি গঠন করলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
এ ছাড়া ২০২৬ সালের ৩ ও ৫ মার্চ সিলেটের সংবাদে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও হোল্ডিং ট্যাক্স শাখাকে ঘিরে কথিত সিন্ডিকেট, গ্রাহক হয়রানি ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ তুলে ধরা হয়। একই ধরনের অভিযোগ নিয়ে সিসিকের অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে তদন্ত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহলে।
অভিযোগকারীরা বলছেন, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের রাজস্ব ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব, হোল্ডিং নম্বর পরিবর্তনের নথি, রিভিউয়ের মাধ্যমে কর কমানোর ঘটনা এবং বকেয়া সমন্বয়ের প্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তদন্ত কমিটির কার্যক্রম প্রকাশ্যে এনে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
নগরবাসীর দাবি, হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ ও সংশোধনের পুরো প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা জরুরি। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত অনিয়মের সঙ্গে কারা জড়িত, কোথায় রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে এবং কীভাবে তা হয়েছে, তা বের করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
হোল্ডিং ট্যাক্স সিটি করপোরেশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজস্বের উৎস। ফলে কর নির্ধারণ ও আদায় প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ শুধু কয়েকজন কর্মকর্তা বা করদাতার ভোগান্তির বিষয় নয়, এর সঙ্গে সরাসরি নগর প্রশাসনের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির প্রশ্নও জড়িত। অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং তার ফল প্রকাশই এখন নগরবাসীর কাছে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।





