সুনামগঞ্জ, ১০ অক্টোবর: সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের মরাচেলা (সোনালী চেলা) এবং ছাতক ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় প্রতি রাতে বালু উত্তোলন ও লুটপাট চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসন, নৌপুলিশ, থানা পুলিশ, বন বিভাগ ও বিজিবিকে ম্যানেজ করে অবৈধ ড্রেজার দিয়ে নদী থেকে বালু তোলা হচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্র জানায়।
এসব লুটপাটের ঘটনায় জনপ্রতিনিধি এবং বিএনপি, জামায়াত, আওয়ামী লীগ, যুবদল ও যুবলীগের নেতাকর্মীদের সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে। পুলিশ প্রশাসন, নৌপুলিশ ও বন বিভাগের লোকজনকে ম্যানেজ করে প্রতি রাতে কোটি কোটি টাকার লুটপাট হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
নদীর পাড় কেটে অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলনের অভিযোগে ৩৭ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ১০ থেকে ১৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর সুনামগঞ্জ। গত মঙ্গলবার রাতে দোয়ারাবাজার থানায় বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত-২০১০)-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়। পরিবেশ অধিদপ্তর সুনামগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. মোহাইমিনুল হক বাদী হয়ে মামলাটি করেন।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ৫ অক্টোবর দুপুর ১২টার দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সহকারী পরিচালক মো. মোহাইমিনুল হকের নেতৃত্বে একটি দল মরাচেলা (সোনালী চেলা) নদীসংলগ্ন শ্রীপুর মৌজার সোনাপুর ও পূর্ব সোনাপুর এলাকায় সরেজমিন পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ এবং ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলনের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার কথা মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কোনো ধরনের পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলন করে আসছিলেন। এতে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ, তীরবর্তী ভূমি, পরিবেশ ও প্রতিবেশের ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়েছে। গত ২৫ আগস্ট থেকে ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন রাত ৮টার পর থেকে ভোর পর্যন্ত নদীর পাড় কেটে বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন, লোড ও আনলোড করা হয়েছে। এভাবে আনুমানিক ২৫ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলন করা হয়েছে। উত্তোলিত বালুর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকা বলে জানিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর সুনামগঞ্জ।
অভিযোগ রয়েছে, রাতের আঁধারে নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলন করায় নদীর তীরবর্তী এলাকায় ভাঙনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি নদীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে বালু উত্তোলন চললেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র উৎসাহিত হয়েছে।
মামলায় অভিযুক্ত ৩৭ জন হলেন—জয়নায় আবেদীন মেম্বার (৫৫), জিয়াউর রহমান বোঘ (৫৫), জহর মেম্বার (৫৫), আব্দুল হেকিম চেয়ারম্যান (৬০), মোহাম্মদ আলী (৩৫), ধন মিয়া মেম্বার (৬০), রফিকুল ইসলাম (৫৫), ফখরুল ইসলাম (৪০), নিজাম উদ্দিন নিধান (৫২), ফরিদ মিয়া (৪৫), শরীফ মিয়া (৩৫), মনসুর আলী (৪০), সিদ্দিক মিয়া (৪৫), চেনু মিয়া (৪০), জামশেদ মিয়া (৬২), আলা উদ্দিন (৪০), ওমর (৪০), রফিক মিয়া (৩৮), কালাম ডাক্তার (৪৮), আইনুদ্দিন (৪০), সাদ্দাম মিয়া (৩৫), সানির মিয়া (২৫), মনির মিয়া (২২), জালাল মিয়া (৫৫), মাসুক মিয়া (২৮), সমুর মিয়া (৪০), বসির মিয়া (২৫), রমজান মিয়া (৩৫), আবুল কালাম (৪৫), নুরু মিয়া (৪৪), বকুল মিয়া (৩৫), মো. আলী (৪০), শফিকুল ইসলাম (৪৫), দ্বীন ইসলাম (৪৫), বুলবুল আহমদ (৪৮), লিটন মিয়া (৪০) ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ (৪৩)। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ১০ থেকে ১৫ জনকে মামলায় আসামি করা হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত-২০১০)-এর ৬(ঙ), ১২ ও ১৫(১) ধারায় মামলাটি করা হয়েছে। সহকারী পরিচালক ও মামলার বাদী মো. মোহাইমিনুল হক বলেন, আসামিরা অনুমোদন ছাড়াই নদীর পাড় কেটে বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন করেছেন। এতে পরিবেশ ও প্রতিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। তিনি আরও জানান, মামলাটি তদন্ত শেষে পরিবেশ অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা আদালতে দ্রুত অভিযোগপত্র দাখিল করবেন।
এদিকে মরাচেলা নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলনের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। নদীর তীর রক্ষায় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মহি উদ্দিন এ মামলার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। এ মামলায় বিএনপি, জামায়াত, আওয়ামী লীগ, জাপা ও যুবলীগের নেতাকর্মীদের অভিযুক্ত করা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিশ্চিত হওয়ার পরই এ বিষয়ে চূড়ান্তভাবে বলা যাবে বলে তিনি জানান।






