সুনামগঞ্জ, ১৭ আগস্ট: সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারে জমিজমা লিখে না দেওয়ায় শ্বশুর মোহাম্মদ আলীকে ৫০ হাজার টাকায় চুক্তি করে শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তাঁর পুত্রবধূ হোসনা বেগমের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় পুত্রবধূসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, হোসনা বেগম হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। পরে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন নিহতের পুত্রবধূ ও মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হোসনা বেগম (৩৮), খাইরুল ইসলামের ছেলে রুহুল আমিন (২২) এবং মৃত আব্দুল কুদ্দুসের ছেলে নজরুল ইসলাম (২০)।
পুলিশের ভাষ্য, জমিজমা লিখে দেওয়ার জন্য মোহাম্মদ আলীকে দীর্ঘদিন ধরে চাপ দিচ্ছিলেন তাঁর ছেলে ইসমাইল হোসেন ও পুত্রবধূ হোসনা বেগম। কিন্তু তিনি রাজি না হওয়ায় তাঁরা ক্ষুব্ধ হন। একপর্যায়ে বাবাকে হত্যার জন্য সৌদি আরবপ্রবাসী ছেলে ইসমাইল টাকা পাঠান এবং হোসনা বেগম হত্যাকারী ভাড়া করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
হত্যার পর ঘটনাটিকে স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও জানিয়েছে পুলিশ। তবে মরদেহের গলায় দাগ ও মুখে রক্তের চিহ্ন থাকায় বিষয়টি পুলিশের সন্দেহের মধ্যে আসে।
যেভাবে ঘটনা জানাজানি
দোয়ারাবাজার থানার ২ নম্বর নরসিংপুর ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামে গত ১৪ আগস্ট রাত ১২টার দিকে নিজ শয়নকক্ষে মোহাম্মদ আলীকে হত্যা করা হয় বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
মোহাম্মদ আলীর একমাত্র ছেলে ইসমাইল হোসেন সৌদি আরবে থাকেন। বাড়িতে ছিলেন মোহাম্মদ আলী, তাঁর পুত্রবধূ হোসনা বেগম এবং ইসমাইল-হোসনা দম্পতির এক ছেলে।
শনিবার সকালে গ্রামে খবর ছড়িয়ে পড়ে, মোহাম্মদ আলী ঘুমের মধ্যে মারা গেছেন। হোসনা বেগমই বিষয়টি স্থানীয়দের জানান। এরপর তাঁকে স্বাভাবিক মৃত্যু ধরে নিয়ে দাফনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
দোয়ারাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম তালুকদার জানান, শনিবার দুপুরে গ্রামের এক ব্যক্তি থানায় এসে মোহাম্মদ আলীর মৃত্যুর খবর দেন। তিনি মরদেহের গলায় দাগ ও মুখে রক্তের চিহ্ন থাকার কথাও জানান।
এরপর ওসি ফোনে মরদেহ দাফন বন্ধ রাখতে বলেন এবং ঘটনাস্থলে যান। সেখানে গিয়ে সন্দেহ হওয়ায় পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে পাঠায়। ওই সময় হোসনা বেগমও মরদেহের সঙ্গে থানায় আসেন।
পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকারোক্তি
ওসি জানান, রাতে হোসনা বেগমকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে তিনি হত্যার কথা স্বীকার করেন এবং হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের ভাড়া করার বিষয়টি জানান বলে দাবি পুলিশের।
হোসনা বেগমের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রোববার অভিযান চালিয়ে রুহুল আমিন ও নজরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, জমি লিখে না দেওয়ায় মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে ছেলে ও পুত্রবধূর বিরোধ চলছিল। কিছুদিন ধরে মোহাম্মদ আলী তাঁদের থেকে আলাদা রান্না করে খাচ্ছিলেন। এ ঘটনায় ইসমাইল আরও ক্ষুব্ধ হন বলে হোসনা বেগম পুলিশকে জানিয়েছেন।
এরপর হোসনা তাঁর আত্মীয় রুহুল আমিনকে ডেকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। রুহুল আমিন এ বিষয়ে ইসমাইলের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বাবাকে হত্যার সম্মতি দেন এবং ৫০ হাজার টাকা পাঠান বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত শুক্রবার রাত ১২টার দিকে রুহুল আমিন, নজরুল ইসলাম ও একই গ্রামের জিয়াউর রহমান ওই বাড়িতে যান। হোসনা বেগম ঘরের পেছনের দরজা খুলে দেন। পরে ওই তিনজন তাঁর কক্ষ থেকে একটি মই দিয়ে মোহাম্মদ আলীর কক্ষে যান।
পুলিশের দাবি, মোহাম্মদ আলী তখন ঘুমিয়ে ছিলেন। তাঁরা ঘুমন্ত অবস্থায় তাঁর গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। হোসনা বেগম ওপর থেকে আলো দেখিয়ে তাঁদের সহযোগিতা করেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন। হত্যার পর তিনজন সেখান থেকে চলে যান এবং হোসনা ঘুমিয়ে পড়েন।
সকালে ঘুম থেকে উঠে হোসনা আশপাশের লোকজনকে জানান, তাঁর শ্বশুর দরজা খুলছেন না। পরে স্থানীয়রা ঘরে ঢুকে বিছানায় মোহাম্মদ আলীর মরদেহ দেখতে পান।
এ ঘটনায় নিহতের নাতনি মোছা. আছমা বেগম (২৬) বাদী হয়ে দোয়ারাবাজার থানায় পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন।
ওসি তরিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, গ্রেপ্তার হোসনা বেগমসহ তিনজন মোহাম্মদ আলীকে শ্বাসরোধে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। মামলার অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।







