ছাতকে অভিযানেও থামছে না অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন, ৫ মামলায়ও অধরা মূল হোতারা

ছাতকে অভিযানেও থামছে না অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন, ৫ মামলায়ও অধরা মূল হোতারা - Surma Times | Sylhet News

ছাতকে বালু লুটপাটের ঘটনায় ৫টি মামলা, গ্রেপ্তার ২ - Surma Times | Sylhet Newsছাতক (সুনামগঞ্জ), ২২ জুলাই: সুনামগঞ্জের ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলন ও পরিবেশ ধ্বংসের ঘটনায় ৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। বুধবার (২২ জুলাই) পৃথক তিনটি অভিযান চালিয়ে প্রশাসন ও নৌ পুলিশ দুইজনকে গ্রেপ্তার এবং একটি মাটি ডেকু ও অবৈধ ড্রেজার জব্দ করেছে।

দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অরুপ রতন সিংহ এবং থানার ওসি তরিকুল ইসলাম তালুকদারের নেতৃত্বে বুধবার সকালে দোয়ারাবাজারের মরা চৈলা ও ছাতক উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের জামুরা এলাকার পিয়াইন নদী, মরা চেলা, সোনাই নদীর চ্যানেল ও পেকুয়া বিল এলাকায় পৃথক তিনটি অভিযান চালানো হয়।

এদিকে, ছাতক উপজেলার সহকারী ভূমি কমিশনার (এসিল্যান্ড) মোজাহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে একটি মাটি ডেকু ও অবৈধ ড্রেজার আটক করা হয়। আটককৃত মালামাল ইসলামপুর ইউপির মেম্বার ইসলাম উদ্দিনের জিম্মায় রাখা হয়। এসময় এসিল্যান্ডকে দেখে বালুখেকোরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়।

অপরদিকে, গত মঙ্গলবার (২১ জুলাই) রাতে গোপন খবর পেয়ে নৌ পুলিশের ছাতক ইনচার্জ আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে সীমান্তবর্তী এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে দুটি বাংলা ড্রেজার জব্দ এবং দুইজনকে আটক করা হয়। মঙ্গলবার রাতে ইসলামপুর ইউনিয়নের দারুগাখালী গ্রামে ফজর আলীর বসতবাড়ির পাশের ইছামতী নদীর তীরে এ অভিযান পরিচালিত হয়।

নৌ পুলিশ সূত্রে জানা যায়, আটক ব্যক্তিরা ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার সীমান্তবর্তী কাজীরগাঁও-সোনাপুর (কলাবাগান) এলাকায় অবৈধভাবে বাংলা ড্রেজার ব্যবহার করে বালু উত্তোলন করে আসছে। আটককৃতরা হলেন, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার নতুন মেঘেরগাঁও গ্রামের মৃত আব্বাস আলীর ছেলে খালেক (২৭) এবং মো. জয়েদ আলীর ছেলে সুজন (২৫)।

এদিকে, উপজেলার বন বিভাগের বাগান পরিদর্শনে গেছেন এলাকার সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলন। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এ পরিদর্শনে তিনি বন বিভাগের বাগানের সার্বিক অবস্থা, সংরক্ষণ কার্যক্রম এবং চলমান উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ঘুরে দেখেন। পরিদর্শনকালে সংসদ সদস্যের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ মহিউদ্দিন, বন বিভাগের রেঞ্জ অফিসার মো. রিয়াজ উদ্দিন, ছাতক থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) ঝলক মোহন, নৌ পুলিশের ইনচার্জ আনোয়ার হোসেন, বন বিভাগের বিট অফিসার কে বি এম ফেরদৌস, ইসলামপুর ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিট অফিসার এসআই মোহাম্মদ রুমেন প্রমুখ।

প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযান পরিচালিত হলেও অবৈধ ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন বন্ধ হচ্ছে না। একই সঙ্গে হাদা টিলায় সরকারি টিলা কেটে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের অভিযোগও দিন দিন বাড়ছে। সম্প্রতি অবৈধ বালু উত্তোলন ও বালু লুটপাটকে কেন্দ্র করে পরিবেশ অধিদপ্তর, ফরেস্ট বিভাগ, দুটি উপজেলার উপ সহকারি তহসিলদার বাদী হয়ে প্রায় ৫টি মামলা দায়ের করেছেন।

৫টি মামলা দায়ের করা হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, মূল হোতারা এখনও আইনের আওতার বাইরে থাকায় অবৈধ কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ইসলামপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রায় ৬ হাজার ২শত ৪২ একর বন বিভাগের জমি এবং প্রায় এক হাজার একর খাস খতিয়ানের সরকারি টিলা রয়েছে। এই এলাকাজুড়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট অবৈধভাবে টিলা কেটে লাল পাথর উত্তোলন এবং নদী ও বিল থেকে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করে আসছে। প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দেড় শতাধিক শ্রমিকের মাধ্যমে শত শত ঘনফুট লাল পাথর ও বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন করে স্থানীয় বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, শুধু পাথর ও বালু উত্তোলনই নয়, সামাজিক বনায়ন প্রকল্পের গাছপালাও নির্বিচারে কেটে ফেলা হচ্ছে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে এবং পাহাড়ি টিলার অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। বন বিভাগের উদ্যোগে হাদা টিলার প্রায় ১৭৫ একর জমিতে সামাজিক বনায়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল পরিবেশ সংরক্ষণ, মাটি ক্ষয় রোধ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং স্থানীয় জনগণের জন্য বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি করা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে চলা অবৈধ পাথর উত্তোলনের কারণে প্রকল্পটি কার্যত ধ্বংসের মুখে। ইতোমধ্যে টিলার বড় একটি অংশ সমতল হয়ে গেছে। অনেক স্থানে গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছে, যা বর্ষাকালে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।

এদিকে প্রশাসন ও নৌ পুলিশ, থানা পুলিশ একাধিকবার অভিযান পরিচালনা করলেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। গত ১ জুলাই সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোজাহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে ইসলামপুর ইউনিয়নের জামুরা এলাকায় বিশেষ অভিযান চালানো হয়। অভিযানে অবৈধ বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত চারটি কাঠের ইঞ্জিনচালিত নৌকা এবং একটি ড্রেজার মেশিন জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় ছাতক সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপ-সহকারী কর্মকর্তা জুনেদ আহমদ বাদী হয়ে মোবাইল কোর্ট মামলা নং-৪৫/২০২৬-এর অভিযোগ নৌ-পুলিশের কাছে দায়ের করেন।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, ঘটনার ১৩ দিন তদন্তের পর নৌ-পুলিশ মূল সিন্ডিকেটের সদস্যদের নাম বাদ দিয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা দায়ের করেছে। এতে প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে এবং অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ হচ্ছে না। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১১ জুলাই ছাতক-দোয়ারাবাজার সীমান্তের মরা চেলা, কলাবাগান, কাজিরগাঁও ও সোনাপুর এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

পরে দোয়ারাবাজার সদর ভূমি অফিসের পক্ষ থেকে নরসিংপুর ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামের মরা চেলা নদীর খাস জায়গা থেকে কোটি কোটি টাকার বালু উত্তোলনের অভিযোগে কবির মিয়াসহ ২০ জনের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা দায়ের করা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা মেহেদী হাসানসহ একাধিক ব্যক্তি জানান, বছরের পর বছর ধরে অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলনের ফলে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং গ্রামীণ সড়কগুলো ভারী যানবাহনের চাপে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। তারা অভিযোগ করেন, প্রশাসনের অভিযান হলেও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় পরিস্থিতির কোনো স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।

বন বিভাগের কর্মকর্তা ফেরদৌস অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, অবৈধ পাথর ও বালু উত্তোলনের বিষয়ে নিয়মিত অভিযোগ করা হচ্ছে। তবে সিন্ডিকেটটি এতটাই প্রভাবশালী যে স্থানীয় পর্যায়ে স্থায়ীভাবে তাদের দমন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বন বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোজাহিদুল ইসলাম বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অভিযানে ড্রেজার ও নৌকা জব্দ করা হয়েছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, শুধু প্রশাসনের একক উদ্যোগে এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়; অবৈধ বালু ও পাথর উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

পরিবেশবিদদের মতে, জামুরা এলাকার পিয়াইন নদী, মরা চেলা, সোনাই নদীর চ্যানেল, পেকুয়া বিল এবং হাদা টিলা থেকে যেভাবে অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলন চলছে, তা অব্যাহত থাকলে পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হবে। এতে নদীর গতিপথ পরিবর্তন, ভূমিক্ষয়, জীববৈচিত্র্যের ধ্বংস এবং সামাজিক বনায়ন প্রকল্প পুরোপুরি বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তারা অবিলম্বে দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি, প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা, বন বিভাগের জমি সুরক্ষা এবং সামাজিক বনায়ন প্রকল্প পুনরুদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

★★★★★

সুরমা টাইমস পড়ে ভালো লাগলো?
আপনার মতামত জানান!

গুগলে রেটিং দিন রিভিউ লিখুন ⭐
Share This Article