বিএনপি করার ‘অপরাধে’ ৬ বছর বাড়িছাড়া! ছাতকে নিজ ভিটায় ঘর বানাতে গিয়ে হামলার অভিযোগ

বিএনপি করার ‘অপরাধে’ ৬ বছর বাড়িছাড়া! ছাতকে নিজ ভিটায় ঘর বানাতে গিয়ে হামলার অভিযোগ - Surma Times | Sylhet News

ছাতকে বিএনপি করার ‘অপরাধে’ ৬ বছর বাড়িছাড়া বৃদ্ধের নিজ ভিটায় ঘর বানাতে গিয়ে হামলার অভিযোগ - Surma Times | Sylhet Newsছাতক (সুনামগঞ্জ), ১৪ সেপ্টেম্বর। নিজের বসতভিটা থাকতেও প্রায় ছয় বছর ধরে বাড়িছাড়া জীবন কাটাচ্ছেন ৭২ বছর বয়সী মো. মস্তাব আলী। বিএনপির রাজনীতি করার কারণে তাঁর বসতঘর ভাঙচুর করে স্ত্রী-সন্তানসহ তাঁকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ করেছেন তিনি।

দীর্ঘদিন পর নিজ ভিটায় ফিরে ঘর নির্মাণের উদ্যোগ নিলেও সেখানে ফের বাধার মুখে পড়েছেন বলে দাবি তাঁর। গত ৭ সেপ্টেম্বর সকালে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে নিজ বসতভিটায় ঘর বানাতে গেলে কয়েকজন ব্যক্তি তাঁকে মারধরের উদ্দেশ্যে হামলার চেষ্টা করেন। তাঁর চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে তাঁকে রক্ষা করেন। এরপরও সুযোগমতো মারধর ও খুন-জখম করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন মস্তাব আলী।

এ ঘটনায় গত ১২ সেপ্টেম্বর রাতে ছাতক থানায় স্থানীয় সমুজ আলীসহ ছয়জনের নাম উল্লেখ করে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তিনি। অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের ২৩ নভেম্বর তাঁর বসতঘর ও দরজা ভাঙচুর করে স্ত্রী-সন্তানসহ তাঁকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। সে সময় তিনি ছাতক থানায় অভিযোগ করেন। পরে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ছাতক থানার মামলা নম্বর ০৬(০২)২১ রুজু হয়।

মামলা দায়েরের পর বিবাদীরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন বলে দাবি মস্তাব আলীর। তাঁকে ও পরিবারের সদস্যদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানোর পাশাপাশি হত্যার হুমকি দিতে থাকেন তাঁরা। এ কারণে নিরাপত্তাহীনতায় তিনি নিজ বসতভিটায় ফিরতে পারেননি। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে দীর্ঘ সময় রেলওয়ের একটি পরিত্যক্ত ঘরে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।

মস্তাব আলী নিজেকে বিএনপির একজন কর্মী হিসেবে উল্লেখ করে দাবি করেন, বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে তৎকালীন সময়ে তিনি রাজনৈতিকভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাঁর অভিযোগে সাবেক সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান এবং সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আবু সাদাত মোহাম্মদ লাহিনের নাম রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের নির্দেশে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা তাঁকে হয়রানি করে বাড়িছাড়া করেছেন বলে দাবি করেছেন তিনি।

তবে এ বিষয়ে অভিযুক্ত সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ফজলুর রহমানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তিনি বর্তমানে দেশের বাইরে রয়েছেন বলে জানা গেছে। অন্যদের বক্তব্যও তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া সম্ভব হয়নি।

অভিযোগপত্রে মস্তাব আলী তাঁর বসতভিটার জমির বিস্তারিত তফসিলও উল্লেখ করেছেন। সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ব্রাহ্মণগাঁও মৌজার জেএল নং-২৪২, হালে ১৭৩, খতিয়ান নং-২৭, নামজারি খতিয়ান নং-১৩, দাগ নং-১৫, হালে ৪৪ নম্বর দাগের ভূমিটি তাঁর মৌরসি ও খরিদা সূত্রে দখলীয় সম্পত্তি বলে দাবি করেন তিনি। সম্প্রতি তিনি ওই ভূমি নিজের নামে নামজারিও করেছেন।

লিখিত অভিযোগে অভিযুক্ত ছয়জন হলেন ছাতক উপজেলার সৈয়দেরগাঁও ইউনিয়নের ব্রাহ্মণগাঁও (তকিপুর) গ্রামের সমুজ আলী (৪০), লায়েক (৩৫), রাসেল (৩২), মতছির (৫০), মর্তুজ আলী (৩৩) ও বুলবুল (৩০)। স্থানীয় মরম আলী, সজ্জাদ আলী, মুক্তা বেগম ও হুসনা বেগমসহ কয়েকজন ঘটনার বিষয়ে অবগত থাকার কথা জানিয়েছেন এবং অভিযোগের কিছু বিষয় সম্পর্কে সত্যতা স্বীকার করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নাকি পারিবারিক বিরোধ? মস্তাব আলী একদিকে বিএনপির রাজনীতি করার কারণে বাড়িছাড়া ও রাজনৈতিক হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন। অন্যদিকে তাঁর অভিযোগে অভিযুক্ত কয়েকজনকে তাঁর সৎভাই, চাচাতো ভাই ও ভাতিজা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বিষয়টি নিছক রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, নাকি এর পেছনে পারিবারিক ও জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে—তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিরোধের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, জমির কাগজপত্র যাচাই, পূর্বের মামলার নথি পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নাম আসায় বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তের দাবি রাখে।

ছাতক থানার অফিসার ইনচার্জ মিজানুর রহমান মিজান মস্তাব আলীর লিখিত অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, অভিযোগটি পাওয়া গেছে এবং বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। “অভিযোগটি তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে,” বলেন ওসি মিজানুর রহমান।

পুলিশের তদন্ত শেষ হলে ২০২০ সালের ঘটনার প্রকৃত কারণ, ৭ সেপ্টেম্বরের ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে, জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে কোনো বিরোধ রয়েছে কি না এবং অভিযোগে উল্লিখিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা কতটুকু—এসব বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। এদিকে প্রায় ছয় বছর ধরে নিজ বসতভিটায় ফিরতে না পারার অভিযোগ তুলে ৭২ বছর বয়সী মস্তাব আলী এখন প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা ও নিজের ভিটায় শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসের সুযোগ দাবি করেছেন।

★★★★★

সুরমা টাইমস পড়ে ভালো লাগলো?
আপনার মতামত জানান!

গুগলে রেটিং দিন রিভিউ লিখুন ⭐
Share This Article