জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ৭ মামলায় ২৩ জনের মৃত্যুদণ্ড

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ৭ মামলায় ২৩ জনের মৃত্যুদণ্ড - Surma Times | Sylhet News

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ৭ মামলায় ২৩ জনের মৃত্যুদণ্ড - Surma Times | Sylhet Newsঢাকা, ২৫ অক্টোবর: ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের আলোচিত সাতটি মামলার বিচার শেষে ২৩ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন দুটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এসব মামলায় মোট ৬৮ জন দণ্ডিত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৩৩ জন বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড পেয়েছেন এবং একজন খালাস পেয়েছেন।

গত দুই বছরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের সর্বশেষ তথ্য সম্প্রতি প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে তুলে ধরা হয়েছে। প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সংখ্যা এখন পর্যন্ত ৭০টি। এর মধ্যে বিচারাধীন ২৬টি এবং মিস কেস হিসেবে রয়েছে ৪৪টি।

দুটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ পর্যন্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার আসামি ২০৩ জন। পলাতক আসামির সংখ্যা ৩৫২ জন।

চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের বিচারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠিত হয়েছিল। তিনি বলেন, এরই মধ্যে দুটি ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধের সাতটি আলোচিত মামলার রায় ঘোষণা করেছে। তিনি আশা করেন, জনআকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে অবশিষ্ট মামলাগুলোর বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ হবে এবং রায় কার্যকর হবে।

পলাতক আসামিদের বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, তাদের বিচারের মুখোমুখি করার চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানি না হন, আবার কোনো দোষী ব্যক্তি যেন ছাড় না পান।

প্রথম রায়ে হাসিনা-কামালের মৃত্যুদণ্ড

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এই মামলায় আসামি থেকে রাজসাক্ষী হওয়া পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন।

এই রায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে শহীদদের পরিবার ও আহতদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

চাঁনখারপুল হত্যাকাণ্ড

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চাঁনখারপুলে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশ গুলি চালায়। এতে শাহরিয়ার খান আনাস, শেখ মাহদী হাসান জুনায়েদ, মো. ইয়াকুব, মো. রাকিব হাওলাদার, মো. ইসমামুল হক ও মানিক মিয়া শাহরিক নিহত হন।

এ ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ও রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।

একই রায়ে পলাতক সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুলকে ছয় বছর, শাহবাগ থানার সাবেক ওসি (অপারেশন) মো. আরশেদ হোসেনকে চার বছর এবং কনস্টেবল মো. সুজন মিয়া, মো. ইমাজ হোসেন ইমন ও মো. নাসিরুল ইসলামকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানো

গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন আশুলিয়ায় ছয়জনের লাশ পোড়ানোসহ অপর একজনকে হত্যার ঘটনায় ২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি সাবেক এমপি মুহাম্মদ সাইফুল ইসলামসহ ছয় আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একই মামলায় আরও সাতজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্যরা হলেন আশুলিয়া থানার তৎকালীন ওসি এএফএম সায়েদ রনি, সাবেক এএসআই বিশ্বজিৎ সাহা, সাবেক এসআই আবদুল মালেক, সাবেক কনস্টেবল মুকুল চোকদার ও স্থানীয় যুবলীগ নেতা রনি ভূঁইয়া।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সাবেক পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান রিপন, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহিল কাফী, সাভার সার্কেলের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শহিদুল ইসলাম, ডিবির সাবেক পরিদর্শক মো. আরাফাত হোসেন, সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) নির্মল কুমার দাস ও সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান।

এ ছাড়া সাবেক এসআই আরাফাত উদ্দীন ও কামরুল হাসানকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এই মামলায় রাজসাক্ষী হওয়া শেখ আবজালুল হককে ক্ষমা করে দেন ট্রাইব্যুনাল।

আবু সাঈদ হত্যা মামলা

২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড ও তিন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। এই মামলায় অপর ২৫ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন সাবেক এএসআই (সশস্ত্র) মো. আমির হোসেন ও সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, সাবেক পুলিশ পরিদর্শক রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন এবং সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ এসআই বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধব।

এই রায়ে বেরোবির সাবেক ভিসি ড. হাসিবুর রশিদ ওরফে বাচ্চু, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মনিরুজ্জামান ওরফে বেল্টু, বেরোবির দুই সহযোগী অধ্যাপক এবং বেরোবি ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি পোমেল বড়ুয়াকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ও পুলিশের একাধিক সাবেক কর্মকর্তা, ছাত্রলীগ নেতাকর্মী ও কর্মচারীকে পাঁচ বছর ও তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

রামপুরায় তিন মৃত্যুদণ্ড

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় একটি নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণকে গুলি এবং একই এলাকায় আরও দুজনকে হত্যার ঘটনায় গত ২৮ জুন তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিরা হলেন ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. রাশেদুল ইসলাম এবং রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো. মশিউর রহমান।

একই মামলায় রামপুরা থানার সাবেক উপ-পরিদর্শক তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং গ্রেপ্তার একমাত্র আসামি, রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

ইনুর ১০ বছরের সাজা

গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। গত ৩০ জুন বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল এ রায় ঘোষণা করেন।

এই মামলায় দুটি চার্জে এক লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে আসামির প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়। গণঅভ্যুত্থান দমনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার কথোপকথন, কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি এবং কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।

ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের মৃত্যুদণ্ড

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামিকে গত ১৫ সেপ্টেম্বর মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্যরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।

এই রায়ে ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন খানের সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেওয়া হয়। বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি জুলাই শহীদ পরিবার ও আহতদের মধ্যে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।

বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলের গুম-খুনসহ ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার দুটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান রয়েছে। সূত্র: বাসস।

★★★★★

সুরমা টাইমস পড়ে ভালো লাগলো?
আপনার মতামত জানান!

গুগলে রেটিং দিন রিভিউ লিখুন ⭐
Share This Article