বিজেপি সরকারের ছয় মাসে সাংবাদিকদের ওপর চাপ বাড়ছে, আরএসএফের নিন্দা

বিজেপি সরকারের ছয় মাসে সাংবাদিকদের ওপর চাপ বাড়ছে, আরএসএফের নিন্দা - Surma Times | Sylhet News
বিজেপি সরকারের ছয় মাসে সাংবাদিকদের ওপর চাপ বাড়ছে, আরএসএফের নিন্দা - Surma Times | Sylhet News
Image: RSF

কলকাতা, ২৯ অক্টোবর: পশ্চিমবঙ্গে গত ৯ মে ২০২৬ তারিখে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ছয় মাসও পার হয়নি, এর মধ্যেই একাধিক সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকে হয়রানিমূলক মামলা, হামলা ও সাইবার হেনস্তার মুখে পড়তে হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সুভেন্দু অধিকারীকে সাংবাদিকতা ও তথ্যের অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ)।

আরএসএফের দক্ষিণ এশিয়া ডেস্কের প্রধান সেলিয়া মার্সিয়ের বলেছেন, আনন্দবাজার পত্রিকার কার্যালয় ভাঙচুর, এর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সাইবার হেনস্তা, কর্মকর্তাদের সংবাদমাধ্যমে তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা এবং গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা সবই সাংবাদিকদের মুখ বন্ধ করতে intimidation ও তথ্যের অধিকারে বাধা সৃষ্টির শামিল। তিনি বলেন, ক্ষমতায় আসার মাত্র ছয় মাসের মধ্যে বিজেপি সরকারের অধীনে পশ্চিমবঙ্গে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ভবিষ্যৎ অন্ধকার বলে মনে হচ্ছে। এসব হামলার নিন্দা জানিয়ে আরএসএফ রাজ্য কর্তৃপক্ষের কাছে গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা বন্ধ, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও সরকারি তথ্যে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং আনন্দবাজার পত্রিকার বিরুদ্ধে ভাঙচুর ও হেনস্তার ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

জানা গেছে, ক্ষমতায় আসার কয়েক দিনের মধ্যেই রাজ্য সরকার ১৯ মে এক সার্কুলার জারি করে। এতে কর্মকর্তাদের সরকারি অনুমতি ছাড়া সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সংবাদমাধ্যমকে কোনো দলিল বা তথ্য দেওয়া এবং ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের তৈরি মিডিয়া অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। সার্কুলারটি পুরোনো নিয়মের স্মারক হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও ভারতীয় ডিজিটাল অধিকার সংস্থা ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশনের (আইএফএফ) মতে, এতে ব্যাপক ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

চলতি বছরের ২১ আগস্ট কলকাতার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রগোষ্ঠীর সংঘর্ষের পরদিন বাংলা ভাষার শীর্ষ দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা প্রথম পাতায় সংঘর্ষের ঘটনাকে গেরুয়া গুণ্ডামি বলে শিরোনাম করে। এক সপ্তাহ পর মুখ্যমন্ত্রী সুভেন্দু অধিকারী পত্রিকার কাছে ক্ষমা দাবি করেন এবং এক ব্যক্তির অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ সম্পাদক ইশানি দত্ত রায় ও রিপোর্টিং বিভাগের প্রধান সোমা মুখার্জির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার এফআইআর করে। এরপর দুজনই সাইবার হেনস্তার শিকার হন, বিশেষ করে বিজেপি সমর্থকদের পক্ষ থেকে।

মামলার অভিযোগে গ্রেফতির আশঙ্কা থাকলেও সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে কলকাতা হাইকোর্ট পুলিশকে দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত কোনো জোরপূর্বক পদক্ষেপ না নেওয়ার নির্দেশ দেয়। এর আগে গত ১ সেপ্টেম্বর গেরুয়া পোশাক পরা একদল ব্যক্তি কলকাতায় পত্রিকার কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয়ে পত্রিকার বিরুদ্ধে স্লোগান দেয় এবং পুলিশের উপস্থিতিতে ভবনের কিছু অংশ গেরুয়া রঙে রাঙিয়ে দেয়। নতুন বিজেপি সরকার এ ঘটনায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করলেও অনলাইন মাধ্যম আল্ট নিউজ প্রকাশ করে, বিক্ষোভকারীদের অনেকেই দলের সক্রিয় কর্মী এবং তাঁদের একজন যুব শাখার নেতা।

এদিকে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ গত ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৪ সালে চালু হওয়া সংবাদমাধ্যম মাকতুব মিডিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ নথিভুক্ত করে। প্রতিষ্ঠানটি মানবাধিকার, সংখ্যালঘু, সামাজিক বর্জন ও ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ করে। পুলিশের অভিযোগটি প্রতিষ্ঠানটির এক্স ও ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে, যেখানে বিরোধী দলের এক সাংসদ দাবি করেছিলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের রাজ্য সফরের সময় তিনজন জ্যেষ্ঠ মুসলিম কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা বৈঠক থেকে বাদ দেওয়া হয়।

পুলিশ এক্সের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বিষয়বস্তুকে সম্পূর্ণ বানোয়াট ও বিদ্বেষপূর্ণ বলে অভিহিত করে। চিঠিতে ঘটনা ও অভিযোগের বহু মাস আগের, অর্থাৎ ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্ট, সংযোগ ও কম্পিউটার ডিভাইসের তথ্য চাওয়া হয়। এক্সের পক্ষ থেকে জানানো হলে মাকতুব মিডিয়া বিষয়টি জানতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ছয়টি অভিযোগের মধ্যে চারটি অভিযোগে জামিনের কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে সম্প্রদায়িক শত্রুতা উসকে দেওয়া, ধর্মীয় অনুভূতিতে ইচ্ছাকৃত হামলা, শত্রুতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উপযোগী বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো এবং একটি সম্প্রদায়কে অন্য সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অপরাধে প্ররোচিত করা।

প্রসঙ্গত, গত ২৩ ও ২৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিজেপি জয়লাভ করে। ওই সময়ও আরএসএফ নতুন সরকারকে হিংসা, সেন্সরশিপ ও হেনস্তা ছাড়া সংবাদ দেওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছিল।

রাজ্যে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও তথ্য পাওয়ার অধিকার অক্ষুণ্ন না থাকলে বাকস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংস্থাটি।

★★★★★

সুরমা টাইমস পড়ে ভালো লাগলো?
আপনার মতামত জানান!

গুগলে রেটিং দিন রিভিউ লিখুন ⭐
Share This Article