গাজায় যুদ্ধবিরতির এক বছর, তবু শেষ হয়নি অপেক্ষার লাইন

গাজায় যুদ্ধবিরতির এক বছর, তবু শেষ হয়নি অপেক্ষার লাইন - Surma Times | Sylhet News

গাজায় যুদ্ধবিরতির এক বছর, তবু শেষ হয়নি অপেক্ষার লাইন - Surma Times | Sylhet News

গাজা: যুদ্ধবিরতি ঘোষণার এক বছর পার হয়েছে। কিন্তু গাজার বাসিন্দাদের জীবনে যুদ্ধের ভয়, বোমাবর্ষণ আর মৃত্যুর আশঙ্কা এখনো রয়ে গেছে। গাজা সিটির লেখক ও কবি আকরাম আল-সুরানি নিজের লেখায় এভাবেই তুলে ধরেছেন বাস্তুচ্যুত মানুষের দৈনন্দিন জীবন।

তাঁর বর্ণনায়, প্রতিদিন সকালে তিনি পানির জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা নিজেকে ও প্রতিবেশীদের দেখেন। তখন মনে পড়ে, একসময় প্রত্যেকের নিজস্ব জীবন, গোপনীয়তা, টুথব্রাশ, বাড়ি ও বাথরুম ছিল। পরিষ্কার পানি পান করা বা মুখ ধোয়ার মতো সাধারণ কাজ যে একদিন লড়াইয়ে পরিণত হবে, তা কখনো কল্পনাও করেননি তাঁরা। গরম পানির শাওয়ারের নিচে দাঁড়ানো এখন তাঁর কাছে পরবর্তী নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত স্থগিত এক স্বপ্ন।

আল-সুরানির মতে, যুদ্ধ মানে কেবল ভবনে বোমা ফেলা বা আবাসিক এলাকা খালি করে দেওয়া নয়। এই বড় যুদ্ধের ভেতরেই আছে অনেক ছোট ছোট যুদ্ধ। তাঁবুতে থাকা একটি যুদ্ধ। নজরদারি ড্রোনের অবিরাম ভনভন শব্দও তাই, যাকে স্থানীয়ভাবে বলা হয় ‘জান্নানা’। পানির লাইন, শৌচাগারের জন্য অপেক্ষা, গোপনীয়তা হারানো, একটি তাঁবুতে ত্রিশজন মানুষের গাদাগাদি করে থাকা, সবই এর অংশ।

সন্তানদের নিয়ে উদ্বেগের কথাও লিখেছেন তিনি। প্রতিদিন সকালে একটি প্রশ্ন তাঁকে তাড়া করে: আজ কী হবে? তাঁর সন্তানেরা কি স্কুলের ধ্বংসাবশেষ থেকে রাস্তার ধ্বংসাবশেষ ধরে হেঁটে বাড়ির ধ্বংসাবশেষে ফিরতে পারবে? যেকোনো মুহূর্তে বোমাবর্ষণ তাদের কেড়ে নিতে পারে। জ্বালানি সংকট, বারবার সীমান্ত পারাপার বন্ধ থাকা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের স্বল্প সরবরাহের কারণে যাতায়াত কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। ফলে শিশুদের অনেক পথ হেঁটে যেতে হয়। তাঁর ভাষায়, জীবনটাই যেন ফোঁটায় ফোঁটায় মেপে দেওয়া হচ্ছে।

গাজায় বেঁচে ঘুম থেকে ওঠাই যথেষ্ট নয়, লিখেছেন তিনি। নিশ্চিত করতে হয়, যেখানে ঘুমিয়েছেন, পরের রাতেও সেই জায়গাটা থাকবে। আশা করতে হয়, সন্তানেরা এমন একটি সাধারণ দিনের স্বপ্ন দেখতে পারবে, যেদিন এক টুকরো রুটি, শিক্ষা বা চিকিৎসা পাওয়াটা উদযাপনের মতো কোনো কৃতিত্ব নয়। তাঁর অনুভূতি, যুদ্ধবিরতি যেন কখনো হয়নি। বোমাবর্ষণ, বিস্ফোরণ আর ড্রোনের শব্দ দিনরাত সঙ্গী হয়ে আছে। ঘরবাড়ি ও তাঁবুর যা অবশিষ্ট আছে, তা কাঁপছে। মানুষের হৃদয়ও।

লেখক স্মরণ করেছেন ২০২৩ সালের ১৩ অক্টোবর, শুক্রবার সকালের কথা। সেদিন গাজার আকাশে বৃষ্টির মতো ঝরে পড়েছিল উচ্ছেদসংক্রান্ত লিফলেট। তাতে ঘরবাড়ি ছেড়ে অবিলম্বে দক্ষিণে চলে যাওয়ার নির্দেশ ছিল। তাঁর বর্ণনায়, মানুষ ভগ্নহৃদয়ে উত্তর ছেড়ে এসেছিল এবং পা রেখেছিল উন্মাদনার ভেতরে। এরপর থেকে সরে যাওয়া মানে হয়ে উঠেছে আকাশ থেকে লিফলেটে ফেলা ইসরায়েলি আদেশের বিষয়। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়, এক তাঁবু থেকে অন্য হতাশায়, কিংবা এক বিপজ্জনক ভূখণ্ড থেকে তুলনামূলক কম বিপজ্জনক মনে হওয়া কোনো কোণে পালিয়ে যাওয়ার আদেশ।

সেদিন যা কিছু ফেলে আসতে হয়েছিল, তার তালিকাও দিয়েছেন আল-সুরানি। সিঁড়ির ঘর, পর্দা, জানালা। সোফা, রাউটার, ৫৫ ইঞ্চির টেলিভিশন, চুলার ওপর রাখা প্রেশার কুকার, না ধোয়া থালাবাসন। আর আধা টুকরো লেবু, যা কোনো অদ্ভুত কারণে তাঁরা সব সময় ফ্রিজের দরজায় যত্ন করে রেখে দিতেন। ফেলে এসেছেন ছবির অ্যালবাম, বিয়ের ছবি, স্টোররুমের এলোমেলো জিনিসপত্র, গ্যাস লাইটার, বাথরুমের দরজার পেছনে ঝোলানো গোসলের গাউন, ডাইনিং টেবিল, ব্যাকগ্যামন টেবিল এবং পানি, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের বিল। ফেলে এসেছেন কথাবার্তা, ঝগড়াঝাঁটি, আলিঙ্গন, অসমাপ্ত গোপন কথা, রাতের খাবারের পর বলা গল্প আর এক গোছা চাবি।

তালিকার একটি অংশ বিশেষভাবে স্মরণ করেছেন তিনি। কাচের তৈরি এক দামি গ্লাসের সেট ১৯৯৭ সাল থেকে শোকেসে বন্দি ছিল, কারণ সেগুলো ‘অতিথিদের সামনে বের করার জন্য ভীষণ মাত্রায় ভালো’ বলে ধরা হতো। বোমা হামলার পর সেগুলো রাস্তায় ছিটকে পড়ে। আল-সুরানি লিখেছেন, একটি কাপ ভাঙার জন্য ছোট ছেলেকে শাস্তি দেওয়াটা তাঁদের ভুল ছিল। তাঁরা কখনো কল্পনাও করেননি যে নিজেরাও ভেঙে পড়বেন।

তাঁর বক্তব্য, যুদ্ধের আগে তাঁরা যে মানুষ ছিলেন, তাঁকে হারিয়ে ফেলেছেন। যুদ্ধ তাঁদের পরবাসীতে পরিণত করেছে, এমনকি নিজেদের কাছেও অপরিচিত। তিন বছর কেটে গেছে, তবু সেই ঘোষণা আবার শোনার ভয় যায়নি: ‘অবিলম্বে নিজেদের বাড়ি ছেড়ে দক্ষিণে চলে যান’।

শিক্ষার প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, বাস্তুচ্যুতি, তাঁবু আর ভয়ের এই তিন বছরে তাঁদের সন্তানদের স্কুলজীবন স্বাভাবিক শিক্ষার ছিটেফোঁটা ছাড়াই শুরু ও শেষ হয়ে গেছে। এই প্রথমবার স্কুলজীবন গ্রেড বা সার্টিফিকেটে মাপা হচ্ছে না। মাপা হচ্ছে শিশুরা কত বছর বাস্তুচ্যুত অবস্থায় কাটিয়েছে, সেই সংখ্যা দিয়ে। এটি তাঁবুর স্কুলের তৃতীয় বছর।

নিজের পুরোনো লেখার সঙ্গেও বর্তমান বাস্তবতার এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পেয়েছেন আল-সুরানি। ২০১৭ সালে প্রকাশিত তাঁর বই ‘হোয়াট ইজ দ্যাট’-এ তিনি লিখেছিলেন, ‘একটা তাঁবু, যা শেষ পর্যন্ত আমাদের হতাশ করে’। একই বছর ফেসবুকের এক পোস্টে লিখেছিলেন, ‘আমরা সবাই ভবিষ্যতের ভিখারি’। তাঁর ভাষ্য, ব্যঙ্গ করে লেখা সেই কথাগুলো যে একদিন দৈনন্দিন জীবনের নির্মম বাস্তবতা হয়ে উঠবে, তা তিনি কখনো ভাবেননি। তাঁর মনে হয়, যেন তিনি একটি আগাম সতর্কবার্তা লিখেছিলেন, যা নিজেই গুরুত্ব দিয়ে নেননি।

বাস্তুচ্যুতির পথের বিবরণও রয়েছে লেখায়। গাজা থেকে খান ইউনিস, রাফা, আল-মাওয়াসি, আল-জাওয়াদা হয়ে দেইর আল-বালাহ। তাঁবু হোক বা বাড়ির যা অবশিষ্ট আছে, শেষ পর্যন্ত তাঁরা নিরাপদে পৌঁছেছেন এক অনিশ্চয়তার মাঝে। তাঁর আক্ষেপ, স্বপ্ন আর আশা এখনো সেখানে পৌঁছায়নি। তাঁর ভয়, পথেই কোথাও সেগুলো বাষ্পীভূত হয়ে গেছে।

যুদ্ধবিরতি ঘোষণার এক বছর পরও আল-সুরানি লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। ত্রাণের জন্য, রান্নার গ্যাসের জন্য, পানির জন্য। সন্তানদের স্কুল থেকে ফেরার অপেক্ষায় থাকেন তিনি, আর পেছনে ফেলে আসা জীবনের কিছু অংশ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর ভাষায়, এই অধ্যায়ের নাম বদলে গেছে, কিন্তু ভয় তার ঠিকানা বদলায়নি।

লেখার শেষে তিনি জানিয়েছেন, বলার মতো আরও অনেক কিছু আছে, যদি তাঁদের মন বা জীবনের কিছু অবশিষ্ট থাকে।

আকরাম আল-সুরানি গাজা সিটির একজন লেখক ও কবি। তিনি ‘অ্যা হোমল্যান্ড আউট অব কভারেজ’, ‘হাফ-বেকড হোমল্যান্ড’ ও ‘হোয়াটস দ্যাট’ বইয়ের রচয়িতা।

যুদ্ধবিরতির ঘোষণা একটি রাজনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু একজন বাসিন্দার এই বর্ণনা দেখায়, সেই ঘোষণা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কতটা পৌঁছেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। পানি, আশ্রয়, শিক্ষা ও নিরাপত্তার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো এখনো অনিশ্চয়তার ভেতরে। আর একটি প্রজন্মের শিশুরা বড় হচ্ছে সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেই।

★★★★★

সুরমা টাইমস পড়ে ভালো লাগলো?
আপনার মতামত জানান!

গুগলে রেটিং দিন রিভিউ লিখুন ⭐
Share This Article