ঢাকা, ১ আগস্ট: রাজধানীর মিরপুরের কাফরুল এলাকায় অবস্থিত আবাসন প্রকল্প ‘বিজয় রাকিন সিটি’ (কাশফুল সিটি)-তে হামলা, ভাঙচুর, অবরুদ্ধ করার চেষ্টা এবং আতঙ্ক সৃষ্টির অভিযোগ তুলেছেন প্রকল্পটির একাংশের ফ্ল্যাট মালিক ও বাসিন্দারা। শনিবার (১ আগস্ট) সকালে সংঘটিত এ ঘটনার জন্য তারা ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান রাকিন ডেভলপার্সের কর্মকর্তা, বর্তমান প্রশাসক এবং একটি চাঁদাবাজ চক্রকে দায়ী করেছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাসিন্দাদের দাবি, শনিবার সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে একাধিক বাস ও মাইক্রোবাসে করে বিপুলসংখ্যক বহিরাগত ব্যক্তি আবাসন প্রকল্পে প্রবেশ করে। এ সময় তারা কমপ্লেক্সের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং পুরো এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
ফ্ল্যাট মালিকদের অভিযোগ, প্রকল্পটির শুরু থেকেই ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান রাকিন ডেভলপার্স চুক্তি অনুযায়ী নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে পারেনি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এখনো প্রকল্পে অনেক কাজ অসমাপ্ত রয়েছে এবং বিভিন্ন ভবনে নির্মাণ ত্রুটি, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও সেবা ব্যবস্থার নানা সমস্যার কারণে বাসিন্দারা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। একই সঙ্গে শতভাগ মূল্য পরিশোধের পরও দীর্ঘদিন ধরে অনেক ফ্ল্যাটের নিবন্ধন ও হস্তান্তর সম্পন্ন হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তারা।
বাসিন্দাদের আরও দাবি, আইন ও রিহ্যাবের প্রচলিত বিধান অনুযায়ী নির্মাণকাজ শেষ করে প্রকল্প নিবন্ধিত মালিক সমিতি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের কথা থাকলেও তা করা হয়নি। বরং প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে তারা অভিযোগ করেন।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের অনাপত্তিপত্র (এনওসি) নিয়ে সমবায় অধিদপ্তরের অধীনে নিবন্ধিত ‘বিজয় রাকিন সিটি অ্যাপার্টমেন্ট ওনার্স কো-অপারেটিভ সোসাইটি’ দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করছিল। পরে ওই সোসাইটির কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর এবং নামফলক অপসারণের মাধ্যমে কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করা হয় বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে।
এছাড়া রাকিন ডেভলপার্সের দুই কর্মকর্তা রশিদুল আলম ও আবুল কালাম আজাদের সহায়তায় বহিরাগতদের দিয়ে একটি অবৈধ সংগঠন গঠন এবং বৈধ সমিতিকে নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন ফ্ল্যাট মালিকরা।
একই সঙ্গে তারা অভিযোগ করেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতি’র কাছে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর সমিতির কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয় এবং সমিতির কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে তাদের হয়রানি করা হয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, পরবর্তীতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রশাসক নিয়োগের প্রক্রিয়াও অনিয়মের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। তাদের দাবি, সাবেক প্রশাসক আবু মাসুদ এবং বর্তমান প্রশাসক ইশতিয়াক আজিজ সমিতির তহবিল থেকে অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত। এছাড়া ইশতিয়াক আজিজ এর আগে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন বলেও তারা দাবি করেছেন। তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং অভিযুক্তদের কোনো বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
ফ্ল্যাট মালিকদের ভাষ্য, প্রশাসকদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তারা একাধিকবার মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন। এরপরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তাদের অভিযোগ।
বাসিন্দারা জানান, বিভিন্ন দাবিতে তারা গত আট দিন ধরে আবাসন প্রকল্পের টেনিস কোর্টে শান্তিপূর্ণ গণ-অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলেন। শনিবার সকালে কর্মসূচি সাময়িকভাবে শিথিল করার পরই বহিরাগতদের হামলার ঘটনা ঘটে বলে তারা দাবি করেন।
খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছালে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে বাসিন্দাদের দাবি, এলাকায় এখনো আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে।
ভুক্তভোগী বাসিন্দারা বর্তমান প্রশাসক ইশতিয়াক আজিজকে অপসারণ ও গ্রেপ্তার, সাবেক প্রশাসক আবু মাসুদ ও বর্তমান প্রশাসকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ, রাকিন ডেভলপার্সের কর্মকর্তা রশিদুল আলম ও আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা, অভিযোগে উল্লিখিত চাঁদাবাজ চক্রকে গ্রেপ্তার, ঝুলে থাকা ফ্ল্যাটের নিবন্ধন ও প্রকল্প হস্তান্তর সম্পন্ন করা এবং ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, এ প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট ফ্ল্যাট মালিক ও বাসিন্দাদের দাবি ও বক্তব্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে রাকিন ডেভলপার্স, অভিযুক্ত কর্মকর্তা, প্রশাসক বা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা সংযোজন করা হবে।






