সিলেট, ২৫ জুলাইঃ গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ও তার দোসরদের বিচারের দাবিতে শনিবার (২৫ জুলাই) সিলেটে ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে দুপুর ২টায় শুরু হওয়া এই সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এমপি সরকারকে উদ্দেশ করে বলেন, “হাসিনা তাড়িয়েছি, ফ্যাসিবাদ কায়েম করলে আপনাদেরও জনগণ তাড়াবে।”
সমাবেশের প্রেক্ষাপট ও উপস্থিতি
দেশব্যাপী ধারাবাহিক বিভাগীয় সমাবেশ কর্মসূচির সমাপনী আয়োজন হিসেবে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে সিলেট বিভাগের চার জেলা ও বিভিন্ন উপজেলা থেকে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষ অংশ নেন। সকাল থেকেই নেতাকর্মীদের ঢল নামে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে এবং বাস, মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন যানবাহনে করে জনতা সমাবেশস্থলে উপস্থিত হন। নির্ধারিত সময়ের আগেই সমাবেশস্থল জনসমুদ্রে পরিণত হয় এবং প্রখর রোদ উপেক্ষা করেও নেতাকর্মীদের সমাবেশে উপস্থিত হতে দেখা যায়।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সাবেক মন্ত্রী ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম। সিলেট মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি শাহজাহান আলী ও জেলা সেক্রেটারি জয়নাল আবেদীনের যৌথ পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশের শুরুতে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত করেন ক্বারী হেলাল আহমদ।
প্রধান অতিথির বক্তব্য
ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে বলেন, জনগণ পরিবর্তন ও সংস্কারের জন্য গণভোটে রায় দিয়েছে, যেখানে ৭০ ভাগ মানুষ হ্যাঁ ভোট দিয়েছে। তিনি বলেন, গণভোটের রায়কে অপমান করতে দেওয়া হবে না এবং সেই রায় বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই তাদের আন্দোলন সফল হবে। তিনি বলেন, “বাংলাদেশে আমরা আর কোনো ফ্যাসিবাদ চাই না।”
বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, যারা আজ সরকারে আছেন তারাও একসময় মজলুম ছিলেন, কিন্তু এখন তারা ফ্যাসিবাদের পথ ধরে হাঁটছেন এবং সমাজের সব ক্ষেত্রে দলীয়করণের মাধ্যমে দুর্নীতিকে জাতীয়করণ করতে চাইছেন। তিনি বলেন, এই দেশের মানুষ জীবন দিয়ে, পঙ্গুত্ব বরণ করে ও গুলি খেয়ে মুক্তির পথ শিখেছে এবং শহীদ ও জুলাইযোদ্ধাদের সঙ্গে বেঈমানি করা হবে না। তিনি সরকারকে দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রয়োজনে ঢাকা থেকে ডাক আসবে এবং দাবি আদায়ে সবাইকে অংশ নিতে হবে।
সিলেট অঞ্চলের স্থানীয় দাবি তুলে ধরে শফিকুর রহমান বলেন, প্রবাসী অধ্যুষিত এই অঞ্চলের বহু ন্যায্য দাবি বছরের পর বছর ধরে অমীমাংসিত রয়েছে। তিনি সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরকে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপান্তর, সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা, সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর এবং সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরুর দাবি জানান। তিনি বলেন, ১১ দলীয় ঐক্য ক্ষমতায় গেলে এসব দাবি পূরণ করা হবে।
বিশেষ অতিথিদের বক্তব্য
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এমপি তার বক্তব্যে ভারতের একটি রাজনৈতিক ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, তীব্র আন্দোলনের মুখে সেখানে শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এবং সরকার সেখানে ছাত্র-তরুণ ও জনগণকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। তিনি বলেন, দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশের সরকার উল্টো পথে হাঁটছে এবং জুলাই বিপ্লবের পর ক্ষমতায় আসা সরকার গণভোটে পাওয়া ৭০ শতাংশ মানুষের রায়কে অবজ্ঞা করছে। তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি নিজের দলের ভেতরে কোনো সংস্কার আনেনি এবং রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য প্রতিষ্ঠিত ঐকমত্যও মানেনি। তিনি বলেন, এই পথে চললে এর পরিণতি বিএনপি ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারকেই ভোগ করতে হবে। নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, বিএনপি তাদের ৩১ দফায় সংবিধান সংস্কার কমিশনের কথা উল্লেখ করলেও নির্বাচিত হওয়ার পর সংস্কারের বিষয়টি ভুলে গেছে এবং এখন কেবল ‘সংশোধন’ শব্দটিই চিনছে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক বলেন, তাদের এই ঐক্য কেবল ক্ষমতার ভাগবাঁটোয়ারা বা ১১টি রাজনৈতিক দলের ভাগ্য গড়ার জন্য নয়, বরং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আন্দোলন থেকেই এই ঐক্যের সূচনা। তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লবের লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। সরকারকে সম্বোধন করে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সহযোদ্ধা ছিল এবং তারা তাদের বন্ধু মনে করেন। তবে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, জুলাই বিপ্লবের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হলে ক্ষমতায় থাকার কোনো অধিকার থাকবে না। তিনি আরও বলেন, গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষের সমর্থনের বিপরীতে সরকারের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে পরিণাম ভিন্ন কিছু হবে না।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের অন্যতম সমন্বয়ক সাবেক এমপি ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, সরকারের মাত্র পাঁচ মাস হয়েছে এবং এই সময়ে আন্দোলনে নামার প্রয়োজন হওয়ার কথা ছিল না, কিন্তু ধাপে ধাপে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হতে হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনের শুরুতেই ভোটের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং জাতীয় সংসদকে সব সমস্যার সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু বানানোর প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমির মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজী বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে সরকারকেও পালাতে হবে এবং জুলাই সংস্কারকে সামনে রেখে সংবিধান বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি প্রবল এবং সরকার ও বিএনপি সংস্কারের বিষয়টি বুঝতে চাইছে না। তিনি বিএনপি সমর্থিত কিছু বুদ্ধিজীবীর সমালোচনা করে বলেন, দেশের মানুষ সংস্কারের জন্যই জীবন দিয়েছে।
আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) মহাসচিব ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, অতীতে দুইবার আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের খেসারত জাতিকে দিতে হয়েছে এবং সরকারকে আর সেই সাহস না করার আহ্বান জানান। তিনি সরকারের বিচার-প্রক্রিয়ায় ধীরগতির সমালোচনা করে বলেন, নির্বাচন নিয়ে যতটা তৎপরতা দেখা গেছে, বিচারের ক্ষেত্রে ততটা দেখা যায়নি।
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র প্রকৌশলী রাশেদ প্রধান সিলেট অঞ্চলের দীর্ঘদিনের অবহেলার অভিযোগ তুলে বলেন, ক্ষমতায় আসার পাঁচ মাসেও সিলেটের উন্নয়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। তিনি ভারতের সঙ্গে সম্পর্কিত সীমান্ত পুশ-ইন ইস্যু এবং শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরার প্রসঙ্গ তুলে বিচারের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন এবং সাবেক বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি না দেখার প্রত্যাশা প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম চান বলেন, বিএনপির অতীত ভূমিকার কারণে জাতিকে দীর্ঘ সময় স্বৈরাচারের কবলে থাকতে হয়েছে এবং এখন তারা জনগণের ম্যান্ডেট মানতে রাজি নয়। তিনি গণরায় মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান।
সভাপতির বক্তব্য
সমাবেশের সভাপতির বক্তব্যে ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম সরকারকে উদ্দেশ করে বলেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি বন্ধ, সন্ত্রাস দমন ও চাঁদাবাজি বন্ধ করতে পারলেই একটি সুন্দর বাংলাদেশ সম্ভব। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বিভিন্ন পদে নিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অতীত ইতিহাস যাচাইয়ের পরামর্শ দেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকার স্মরণ করিয়ে দিয়ে সংস্কার বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তির প্রসঙ্গ টেনে অলি আহমদ বলেন, শফিকুর রহমান, নাহিদ ইসলাম ও মামুনুল হকের নেতৃত্বে তিন পক্ষ একত্র হলে এক সপ্তাহের মধ্যে সরকারের পতন অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অন্যান্য অংশগ্রহণকারী
সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মাওলানা রেজাউল করিম জালালী, জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন, জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা জেলা উত্তরের আমির মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, সিলেট জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান এবং আরও কয়েকজন স্থানীয় নেতা। সমাবেশে মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলা ও মহানগর পর্যায়ের বিভিন্ন দলের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
তাৎপর্য
সিলেটের এই সমাবেশ দেশব্যাপী ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশ কর্মসূচির সমাপনী আয়োজন হিসেবে অনুষ্ঠিত হওয়ায় এটি জোটের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থানের একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, সাংবিধানিক সংস্কার এবং জুলাই গণহত্যার বিচারের দাবিতে সরকারের প্রতি জোটের ক্রমবর্ধমান চাপ আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।







