কুমিল্লা, ১৪ অক্টোবর: বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা বলে কুমিল্লার বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রথমে ঢাকা, পরে হবিগঞ্জে চলে যাওয়া চার স্কুলছাত্রীকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। সোমবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট এলাকা থেকে তাদের উদ্ধার করা হয়। একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকের সন্দেহ হওয়ায় তিনি পুলিশকে খবর দিয়েছিলেন।
পুলিশ জানিয়েছে, টিকটকে পরিচিত তরুণদের সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করা এবং স্বাধীনভাবে বাঁচার পরিকল্পনা থেকে পঞ্চম শ্রেণির তিন ছাত্রী ঘর ছাড়ে। তাদের একজন সঙ্গে নেয় তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া ছোট বোনকেও।
বুধবার বেলা দুইটার দিকে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে উদ্ধারের বিস্তারিত জানান কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান। উদ্ধার চার শিশু কুমিল্লা নগরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। পঞ্চম শ্রেণির তিনজনের মধ্যে দুজনের বয়স ১২ বছর, অন্যজনের ১৩ বছর। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া শিশুটির বয়স ৮ বছর।
পুলিশ সুপার জানান, সোমবার সকালে বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা বলে তারা বাড়ি থেকে বের হয়। তবে কেউ শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হয়নি। বিকেলে বিষয়টি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নজরে এলে তাঁকে জানানো হয়। এরপর গোয়েন্দা পুলিশ ও কোতোয়ালি মডেল থানার পুলিশ অনুসন্ধান শুরু করে। পরে স্বজনেরা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ছবি ও পরিচয়সহ দেশের বিভিন্ন থানায় বেতারবার্তা পাঠানো হয়। পরে চুনারুঘাট থানার পুলিশের সহায়তায় চারজনকে উদ্ধার করা হয়।
শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, তারা নিয়মিত মুঠোফোন ব্যবহার করত এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। টিকটকে ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে তাদের পরিচিতি ও যোগাযোগ তৈরি হয়। একই পরিবারের দুই বোনের মধ্যে বড়জনের সঙ্গে চার তরুণের, অন্য ১২ বছর বয়সী ছাত্রীর সঙ্গে দুই তরুণের এবং ১৩ বছর বয়সী ছাত্রীর সঙ্গে আরও দুই তরুণের পরিচয় ও সখ্য গড়ে ওঠে। তবে ওই তরুণদের প্রকৃত ঠিকানা তারা জানত না।
পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় থেকে তৈরি হওয়া ধারণা ও কল্পনায় বিভ্রান্ত হয়ে তারা বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের পরিকল্পনা ছিল ঢাকায় গিয়ে নিজেরা উপার্জন করবে, স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করবে এবং পরিচিত তরুণদের সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করবে। এ জন্য বাসা থেকে স্বর্ণালংকার ও মুঠোফোন নিয়ে বের হয় তারা।
ছোট বোনকে সঙ্গে নেওয়ার বিষয়ে পুলিশ জানায়, বড় বোনের বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্তটি বুঝতে পেরেছিল শিশুটি। তাকে সঙ্গে না নিলে বিষয়টি বাবা-মাকে জানিয়ে দেওয়ার কথা বলে সে। পরে তাকেও সঙ্গে নেওয়া হয়।
বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর দুই বোনের একজন পরিবারের একটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন কুমিল্লার টাউন হল মার্কেটের একটি দোকানে চার হাজার টাকায় বিক্রি করে। সেই টাকা নিয়ে তারা ঢাকায় রওনা হয়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার বেলা ১১টার মধ্যে চারজন ঢাকায় পৌঁছায়।
ঢাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকার চেষ্টা করলেও বয়স কম হওয়ায় তারা বাসা পায়নি। এরপর হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। চারজনের মধ্যে একজনের দাদাবাড়ি সেখানে। কিন্তু রাত হয়ে যাওয়ায় অন্ধকারে ঠিকানা খুঁজে পাচ্ছিল না তারা।
একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে থাকে চার শিশু। তাদের আচরণ ও পরিস্থিতি দেখে চালকের সন্দেহ হয়। তিনি স্থানীয় পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করে। পুলিশ সুপার বলেন, ওই চালকের দায়িত্বশীল ভূমিকার কারণেই দ্রুত শিক্ষার্থীদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
পরে গোয়েন্দা পুলিশ বিক্রি করা মুঠোফোনটি উদ্ধার করে। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে স্বর্ণালংকারও উদ্ধার করা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
সন্তানদের প্রতি অভিভাবকদের মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, সন্তান কখন, কোথায় যাচ্ছে, বাসায় কীভাবে সময় কাটাচ্ছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কীভাবে ব্যবহার করছে, সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। তাদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার পাশাপাশি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হলে এবং যথাযথ নজরদারি থাকলে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়ানো সম্ভব।
এ ঘটনায় কোতোয়ালি মডেল থানায় করা সাধারণ ডায়েরির ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানান পুলিশ সুপার।







