প্রাথমিক শিক্ষা অবহেলিত থাকলে ঝুঁকিতে পড়বে জাতির ভবিষ্যৎ

প্রাথমিক শিক্ষা অবহেলিত থাকলে ঝুঁকিতে পড়বে জাতির ভবিষ্যৎ - Surma Times | Sylhet News

shujad picture - Surma Times | Sylhet Newsহোসাইন আহমদ সুজাদঃ একটি জাতির উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামোগত অগ্রগতি বা প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার ওপর নির্ভর করে না; এর মূল ভিত্তি গড়ে ওঠে শিক্ষার মাধ্যমে। আর সেই শিক্ষার ভিত্তিপ্রস্তর হলো প্রাথমিক শিক্ষা। কিন্তু বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান, শিক্ষার পরিবেশ এবং শিক্ষকতার পেশাগত মর্যাদা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাথমিক শিক্ষার এই দুর্বলতা ভবিষ্যতে জাতীয় উন্নয়নের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

শিশুর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় তার শৈশব। এই সময়েই গড়ে ওঠে নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ, ভাষাগত দক্ষতা, সামাজিক আচরণ এবং সৃজনশীল চিন্তার ভিত্তি। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে মুখস্থনির্ভর শিক্ষা পদ্ধতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের স্বাভাবিক কৌতূহল ও সৃজনশীলতা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার আগেই ঝরে পড়ে। এর পেছনে দারিদ্র্যের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের পরিবেশ, পাঠদানের মান এবং শিক্ষার প্রতি আগ্রহহীনতাও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

শিক্ষাবিদরা মনে করেন, প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও অনুপ্রাণিত শিক্ষক। অথচ দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান। অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষকদের কেবল পাঠ্যক্রম সম্পন্ন করার দায়িত্বে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে, ফলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের মধ্যে যে মানবিক ও শিক্ষামূলক সম্পর্ক গড়ে ওঠার কথা, তা অনেক সময়ই তৈরি হয়নি।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর শিক্ষা ব্যবস্থা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে বিবেচনা করে। জাপানে শিশুদের প্রথম দিকে একাডেমিক প্রতিযোগিতার চেয়ে নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও সামাজিক আচরণের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফিনল্যান্ডে শিক্ষকতা অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পেশা হিসেবে বিবেচিত এবং শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত সক্ষমতা বিকাশে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। নিউজিল্যান্ডে খেলাধুলাভিত্তিক শিক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে শিশুদের কৌতূহল ও সৃজনশীলতা বিকাশের চেষ্টা করা হয়। অন্যদিকে সিঙ্গাপুর শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে ব্যাপক বিনিয়োগ করে শিক্ষাব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেছে।

এশিয়ার অন্যান্য দেশেও প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয় অগ্রাধিকারের অন্যতম বিষয়। দক্ষিণ কোরিয়া প্রযুক্তিনির্ভর ও প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেয়। ভিয়েতনাম শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও মৌলিক শিক্ষার মান উন্নয়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। ভারতে প্রাথমিক শিক্ষা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক হলেও সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষার মধ্যে বৈষম্য এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা কাঠামোগতভাবে অনেক দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও গুণগত মানের ক্ষেত্রে এখনও উন্নতির বড় সুযোগ রয়েছে। শিক্ষা বিস্তারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হলেও দক্ষ শিক্ষক তৈরি, শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়ন এবং মুখস্থনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে সৃজনশীল শিক্ষার বিস্তার এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, শিক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষ গড়ে তোলা, শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল বা সনদ অর্জন নয়। একটি শিশুকে দায়িত্বশীল, নৈতিক ও সৃজনশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে পাঠ্যক্রমে জীবনবোধ, নৈতিকতা, মানবিকতা এবং বাস্তবমুখী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব বাড়াতে হবে।

এ জন্য প্রাথমিক শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চশিক্ষা বা অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে। কারণ শৈশবের ভিত্তি দুর্বল হলে পরবর্তী সব স্তরের শিক্ষা তার পূর্ণ কার্যকারিতা হারায়।

নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে শিক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দক্ষ ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক নিশ্চিত করতে হবে, শিক্ষার পরিবেশকে আধুনিক ও শিশুবান্ধব করতে হবে এবং শিশুদের জন্য আনন্দময় শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষা শক্তিশালী না হলে দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় উন্নয়নও টেকসই হবে না।

তাদের মতে, একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় শ্রেণিকক্ষের ভেতরে। তাই প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ বাড়ানোই হতে পারে একটি মানবিক, দক্ষ ও উন্নত জাতি গঠনের সবচেয়ে কার্যকর পথ।

 

হোসাইন আহমদ সুজাদ
সিনিয়র রিপোর্টার, একাত্তর টেলিভিশন
মোবাইল-০১৭১৬৭৮৩২১৫

★★★★★

সুরমা টাইমস পড়ে ভালো লাগলো?
আপনার মতামত জানান!

গুগলে রেটিং দিন রিভিউ লিখুন ⭐
Share This Article