ডিসি কেন শাহজালাল মাজারের দানবাক্সে তালা লাগালেন? প্রশ্নের ঝড়

ডিসি কেন শাহজালাল মাজারের দানবাক্সে তালা লাগালেন? প্রশ্নের ঝড় - Surma Times | Sylhet News

ডিসি কেন শাহজালাল মাজারের দানবাক্সে তালা লাগালেন? প্রশ্নের ঝড় - Surma Times | Sylhet Newsসুরমা টাইমস ডেস্কঃ হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্স সিলগালা করে বিতর্কের ঝড় তুলেছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক সরওয়ার আলম। এ ঘটনায় মাজারপ্রেমীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন— ডিসির এই এখতিয়ার কোথায়? কোন আইনে তিনি মাজারের দানবাক্স সিল করলেন?

স্থানীয় সূত্র ও মাজার সংশ্লিষ্টদের দাবি, শাহজালাল মাজার একটি ব্যক্তিগত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। এখানে ভক্তরা যে দান করেন, তা মাজারের খাদেম, বংশধর ও কর্তৃপক্ষের মধ্যে নির্দিষ্ট ব্যবস্থায় বণ্টন হয়। এটি কোনো সরকারি বা প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ নয় যে রাষ্ট্রীয় তহবিলে জমা দিতে হবে। তাই ডিসির কাছে হিসাব চাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না বলে মনে করছেন তারা।

একাধিক মাজারপ্রেমী বলেন, “যদি ট্যাক্স ফাঁকির বিষয় থাকে তাহলে সেটা দেখার দায়িত্ব আয়কর বিভাগের। কিন্তু দানবাক্সে সরাসরি সিল লাগানোর অধিকার কে দিয়েছে ডিসিকে?” তাদের অভিযোগ, এটা শুধু শাহজালাল মাজার নয়, দেশের বিভিন্ন মাজারকে টার্গেট করে এক ধরনের অভিযান চলছে।

নির্বাচিত প্রশ্ন কেন?

বিতর্কে উঠে এসেছে আরও কয়েকটি প্রশ্ন। কওমী মাদ্রাসাগুলোতে কোটি কোটি টাকা দান হয়, বিদেশ থেকেও ফান্ডিং আসে— সেগুলোর হিসাব কখনো চেয়েছেন ডিসি? জামায়াতে ইসলামীর বায়তুলমালের হিসাব কোথায়? হিন্দু মন্দির, বৌদ্ধ বিহার বা খ্রিস্টান প্যাগোডায় যে বিপুল অর্থ ও সোনা-রুপা জমা হয়, সেগুলোতে কেন তালা লাগানো হয় না?

অনেকে মনে করেন, এটা শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সুফি-মাজারভিত্তিক ইসলামের বিরুদ্ধে এক ধরনের অসহিষ্ণুতা। শাহজালাল (রহ.), খানজাহান আলী, পীর বদর, শাহ আমানতসহ আউলিয়াদের মাজারগুলো শত শত বছর ধরে এ দেশের সভ্যতা-সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে। জঙ্গল কেটে শহর বানানো, মানুষকে ইসলামের সহনশীল রূপ শেখানো— এসবের পেছনে তাদের অবদান অনস্বীকার্য।

মাজারপ্রেমীদের ক্ষোভ

এ ঘটনার পর মাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, “যারা মাজার ভাঙে, জ্বালায়, আর যারা ক্ষমতায় থেকে তালা লাগায়— উদ্দেশ্য একই।” তারা মাজারওয়ালাদের ঘুরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। দেশের সাধারণ মানুষ যে পরিশুদ্ধ ও সহনশীল ইসলাম মাজারের মাধ্যমে শিখেছে, সেটিকে নাকি কেউ কেউ মেনে নিতে পারছেন না।

এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। ডিসি সরওয়ার আলমের এই পদক্ষেপ কতটা আইনসম্মত, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।

মাজারকে ঘিরে এমন বিতর্ক বারবার ফিরে আসছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ উঠছে। সিলেটসহ দেশজুড়ে মাজারপ্রেমীরা এখন সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন।

মাজারের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি

এ ঘটনা ঘিরে দেশের সুফি ঐতিহ্য ও মাজারভিত্তিক ইসলাম নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে। অনেকে মনে করেন, বাংলাদেশের ইসলামের পরিশুদ্ধ, সহনশীল ও শাশ্বত রূপটি মাজারকেন্দ্রিক। শাহজালাল (রহ.), খানজাহান আলী, পীর বদর, শাহ আমানতসহ অসংখ্য আউলিয়ার মাজার এ দেশের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও সমাজব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে তুলেছে।

জঙ্গল সাফ করে জনপদ গড়া, অত্যাচারী সমাজ ভেঙে ন্যায়ের সমাজ প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা ও সেবার মাধ্যমে মানুষকে ইসলামের আলো দেখানো—এসবই মাজারওয়ালাদের অবদান। বাগেরহাট, সিলেট, চট্টগ্রামের মতো শহরগুলোর পত্তনেও তাদের অবিস্মরণীয় ভূমিকা রয়েছে।

ঐতিহাসিক তুলনা: ‘পাগলা ডিসি’ ফয়জুল্লাহ

সিলেটে ডিসিকে ঘিরে বিতর্ক নতুন নয়। ৪৬ বছর আগে ১৯৭৬ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত তৎকালীন ডিসি মোহাম্মদ ফয়জুল্লাহও ‘পাগলা ডিসি’ নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি খাসজমি ও অর্পিত সম্পত্তি বিভিন্ন জেলার ভূমিহীনদের মধ্যে বরাদ্দ দিয়ে সিলেটের জনসংখ্যা ও সংস্কৃতিতে বড় পরিবর্তন আনেন। এ নিয়ে তখনও তীব্র বিতর্ক হয়। তার সমর্থকরা উন্নয়নের কথা বললেও অনেকে এটাকে সিলেটি সংস্কৃতির ওপর ‘সাং’ বলে মনে করেন।

প্রত্যাহারের পর কী?

সারওয়ার আলমের প্রত্যাহারের পর সিলেটের প্রশাসনিক অঙ্গনে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। মাজার কর্তৃপক্ষ ও খাদেমদের সঙ্গে সমন্বয় করে বিষয়টি সমাধানের দাবি উঠেছে। অনেকে মনে করেন, এ ঘটনা মাজারভিত্তিক ঐতিহ্য রক্ষায় নতুন জাগরণের সূচনা করতে পারে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিষয়টি সংবেদনশীল হওয়ায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় জরুরি। অন্যথায় এটি ধর্মীয় অনুভূতি ও সামাজিক সম্প্রীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

এদিকে মাজার সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকেও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হতে পারে বলে জানা গেছে। পুরো বিষয়টি এখন স্থানীয় পর্যায় ছাড়িয়ে জাতীয় পর্যায়েও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।

(এই প্রতিবেদন ভক্ত ও স্থানীয় সূত্রের বক্তব্যের ভিত্তিতে তৈরি। প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।)

★★★★★

সুরমা টাইমস পড়ে ভালো লাগলো?
আপনার মতামত জানান!

গুগলে রেটিং দিন রিভিউ লিখুন ⭐
Share This Article