মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার সাক্ষীর বাড়িতে হামলা, ৩৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা

মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার সাক্ষীর বাড়িতে হামলা, ৩৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা - Surma Times | Sylhet News
মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার সাক্ষীর বাড়িতে হামলা, ৩৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা - Surma Times | Sylhet News
ফাইল ছবি

সুনামগঞ্জ, ২ নভেম্বর: একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার এক সাক্ষীর বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় ৩৩ জনের নাম এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৭০ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। রোববার (১ নভেম্বর) বিকেলে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য সেলিনা আক্তার উজ্জ্বলা শাল্লা থানায় এই মামলা করেন।

মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, হামলায় প্রায় ৪০ লাখ টাকার মালামাল লুট করা হয়েছে।

ঘটনাটি ঘটেছে গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাত ৯টার দিকে শাল্লা উপজেলার দৌলতপুর গ্রামে। বাড়িটি শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার সাক্ষী দুলাল মিয়ার।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, হামলাকারীরা বাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর ও পরিবারের সদস্যদের মারধর করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, এই হামলায় ছয়টি গরু, পাঁচটি ফ্রিজ, দুটি আইপিএস, দুটি ব্যাটারি, একটি এলইডি টেলিভিশন, সাড়ে পাঁচ ভরি স্বর্ণালংকার ও নগদ অর্থসহ প্রায় ৪০ লাখ টাকার মালামাল লুট করা হয়।

দুলাল মিয়ার মেয়ে সেলিনা আক্তার উজ্জ্বলার ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৩ অক্টোবর তাদের দোকানে চুরির ঘটনা ঘটে। এরপর তারা বিষয়টি পুলিশকে জানান। গত ২৯ অক্টোবর পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করতে তাদের বাড়িতে যায়। পুলিশ চলে যাওয়ার পর গ্রামে পুলিশ আসার কারণ নিয়ে কয়েকজন ক্ষুব্ধ হন। পরে রাত ৯টার দিকে গ্রামের জালাল মিয়া, আবদুল হেকিম ও তাদের পরিবারের সদস্যসহ অনেকে লাঠিসোঁটা নিয়ে বাড়িতে হামলা চালান বলে তিনি অভিযোগ করেন।

উজ্জ্বলার অভিযোগ, হামলাকারীরা বাড়িঘর ভাঙচুরের পাশাপাশি মালামাল লুট করেছেন এবং পরিবারের নারী-পুরুষদের মারধর করেছেন।

পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হামলায় দুলাল মিয়ার ছেলে সাদ্দাম হোসেনের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী কুলসুমা বেগম (৩২), মেয়ে সেলিনা আক্তার উজ্জ্বলা (৩৫), ছোট ছেলে উজ্জ্বল মিয়ার স্ত্রী রোকেয়া বেগম (৩২) এবং উজ্জ্বল মিয়ার ছেলে এলিম মিয়া (৩) আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে কুলসুমা বেগম দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং অন্যরা শাল্লা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেন।

দুলাল মিয়া ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার সাক্ষী। পরিবার সূত্রে জানা যায়, তার বাবা মামুদ মিয়া মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকারদের হাতে শহীদ হন। তার ফুফু প্রয়াত জমিলা খাতুন ছিলেন বীরাঙ্গনা।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় শাল্লা উপজেলার উজানগাঁও, শ্যামারচর ও পেরুয়া গ্রামে গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ ও ধর্ষণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা করেন পেরুয়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা রজনী দাস। ওই মামলায় জুবায়ের মুনির, জাকির হোসেন, সিদ্দিকুর রহমান, দৌলতপুর গ্রামের আবদুল হেকিম, আবদুল গণি মিয়া ও তোতা মিয়াসহ ১১ জন গ্রেপ্তার হন। দুলাল মিয়া ওই মামলার সাক্ষী।

দুলাল মিয়ার অভিযোগ, মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার সাক্ষী হওয়ায় তাদের পরিবারের ওপর আগে থেকেই ক্ষোভ রয়েছে একটি পক্ষের। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তারা বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে তিনি দাবি করেন।

দুলাল মিয়া জানান, তার মেয়ে সেলিনা আক্তার উজ্জ্বলা ও মেয়ের জামাই হেলাল মিয়া বাড়িতে থাকেন। তারা বাড়ির সামনে একটি দোকান দিয়ে ব্যবসা করেন। হামলাকারীরা দোকান ও বাড়ির মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

অন্যদিকে অভিযুক্ত জালাল মিয়া ভুক্তভোগী পরিবারের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেন, উজ্জ্বলার পরিবার এলাকায় মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত বলে পরিচিত। এলাকার মাদকবিরোধী ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে তাদের বারবার এই ব্যবসা ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু তারা তা করেননি বলে তিনি দাবি করেন।

জালাল মিয়া বলেন, আমরা উজ্জ্বলার বাড়িঘর লুটপাটের সঙ্গে জড়িত নই। এলাকার লোকজন ক্ষুব্ধ হয়ে হামলা করতে পারে।

এর বিপরীতে সেলিনা আক্তার উজ্জ্বলা জানান, তিনি মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করেন এবং এর আগে অন্তত ১২ জনকে মাদকসহ পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন। তার দাবি, ওই ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ কেউ এখন তাদের হয়রানি ও হুমকি দিচ্ছেন। তাদের বিরুদ্ধে মাদকসহ বিভিন্ন মামলায় হয়রানি করা হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ভুক্তভোগী পরিবারের বিরুদ্ধে মাদক কারবারের অভিযোগ রয়েছে। গত কয়েক বছরে তাদের বিরুদ্ধে মাদক ও চুরিসহ ২০ থেকে ২৫টি মামলা হয়েছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

শাল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সুহেল বলেন, দৌলতপুর গ্রামে উজ্জ্বলার বাড়িতে হামলা ও লুটপাটের অভিযোগে রোববার বিকেলে মামলা হয়েছে। মামলায় ৩৩ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৭০ থেকে ৮০ জনকে আসামি করা হয়েছে। তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

প্রসঙ্গত, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সাক্ষীরা প্রায়ই চাপ ও হুমকির মুখে পড়েন বলে অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন সময়ে। সুনামগঞ্জের এই ঘটনায় দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ Situation-কে আরও জটিল করেছে। একটি পক্ষ বলছে মামলার সাক্ষী হওয়ার কারণে হয়রানি, অন্যপক্ষ বলছে মাদক কারবারের বিরোধ। তদন্তে বেরিয়ে আসবে কোনটি সত্য। তবে নারীর ও শিশুদের আহত হওয়ার বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তই এখন সবচেয়ে জরুরি।

★★★★★

সুরমা টাইমস পড়ে ভালো লাগলো?
আপনার মতামত জানান!

গুগলে রেটিং দিন রিভিউ লিখুন ⭐
Share This Article