সিলেট, ৯ আগস্ট: বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু ও পিতৃহীন এতিমদের শিক্ষা এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে গড়ে ওঠা সিলেটের বাগবাড়িস্থ ‘সিলেট ইনক্লুসিভ স্কুল এন্ড কলেজ’ এখন অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, দলাদলি ও অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার অভিযোগে আলোচনায়। কয়েকজন শিক্ষকের কর্মকাণ্ড ও পারস্পরিক বলয় তৈরির কারণে প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভীতি ও মানসিক অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জেলা প্রশাসক ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের তদারকিতে পরিচালিত এই বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে একটি শিক্ষক বলয় প্রভাব বিস্তার করে আসছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। ওই বলয়ের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা ভঙ্গ, কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য, অননুমোদিত ছুটি ভোগ, ক্লাসে অনিয়ম এবং সহকর্মীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে।
জেলা শিক্ষা অফিসের তদন্ত নথি ও শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে দেওয়া আবেদনপত্রে এসব অভিযোগের বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে বলে জানা গেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সহকারী শিক্ষক আকলিমা বেগম এবং খণ্ডকালীন শিক্ষক মিনহাজুল ইসলাম, আশরাফুল ইসলাম ও রুহুল আমিন।
নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন
তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ন্যূনতম স্নাতক ডিগ্রির যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও মানবিক বিবেচনায় এইচএসসি পাস আকলিমা বেগমকে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তাঁর বিরুদ্ধে মাতৃত্বকালীন ছুটির তথ্য গোপন করে সরকারি অর্থ গ্রহণ, কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া দীর্ঘ সময় ছুটি ভোগ এবং অপ্রাসঙ্গিক কোর্সের নামে ছুটি নেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ ওঠে।
তাঁর বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কুরুচিপূর্ণ আচরণের অভিযোগও রয়েছে।
অন্যদিকে, আকলিমা বেগমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত তিন খণ্ডকালীন শিক্ষক মিনহাজুল ইসলাম, আশরাফুল ইসলাম ও রুহুল আমিনের বিরুদ্ধেও ক্লাসে অনিয়ম, প্রধান শিক্ষকের নির্দেশ অমান্য, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে বিভাজন সৃষ্টি এবং শিক্ষক মিলনায়তনে নারী সহকর্মীদের উদ্দেশে আপত্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগ উঠেছে।
সাবেক প্রধান শিক্ষকের অভিযোগ
প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সাবেক প্রধান শিক্ষক ফারজানা ইসরাত একাধিকবার উদ্যোগ নিলেও ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাননি বলে অভিযোগ করেছেন। তাঁর দাবি, অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণে তাঁকে মিথ্যা অপপ্রচার ও মানসিক হয়রানির শিকার হতে হয়েছে।
সাবেক প্রধান শিক্ষকের ভাষ্য, তিনি প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণেই তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ ছড়ানো হয়েছে। তবে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন না বলেও দাবি করেছেন তিনি।
তদন্তে অনিয়মের সত্যতা পাওয়ার দাবি
বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সুরাইয়া আক্তার জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানের নথিপত্র পর্যালোচনা করে তিনি আগের তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসা বিভিন্ন অনিয়মের সত্যতা পাওয়ার কথা জানতে পেরেছেন।
এদিকে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কোমলমতি শিক্ষার্থীরাও নিজেদের নিরাপত্তা, মানসিক স্বস্তি ও স্বাভাবিক শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিতে লিখিত আবেদন জানাতে বাধ্য হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগ অস্বীকার অভিযুক্তদের
তবে তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত শিক্ষকরা। নিজেদের নির্দোষ দাবি করে সহকারী শিক্ষক আকলিমা বেগম নিয়োগের সময় প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, তাঁকে শর্তসাপেক্ষে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
মাতৃত্বকালীন ছুটি সংক্রান্ত অভিযোগও অস্বীকার করেছেন তিনি। আকলিমা বেগমের ভাষ্য, করোনাকালীন সময়ে স্কুল বন্ধ থাকায় দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের সময় তিনি কোনো ছুটি নেননি।
অন্যদিকে, খণ্ডকালীন শিক্ষক মিনহাজুল ইসলাম, আশরাফুল ইসলাম ও রুহুল আমিন ক্লাস ফাঁকি দেওয়া কিংবা প্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন। তাঁদের দাবি, তাঁরা নিয়মিত ক্লাস নেন এবং দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের অবহেলা করেন না।
প্রতিষ্ঠানে তাঁদের মধ্যে কোনো বিশেষ বলয় বা ‘গ্রুপিং’ রয়েছে, এমন অভিযোগও তাঁরা অস্বীকার করেছেন। তাঁদের ভাষ্য, চারজনের মধ্যে শুধু ‘মনের মিল’ থাকায় তাঁরা একসঙ্গে চলাফেরা করেন।
নিরাপদ শিক্ষা পরিবেশের দাবি
অভিভাবক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের অভিযোগ, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ও এতিম শিশুদের জন্য পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, অনিয়ম কিংবা ক্ষমতার বলয় কোনোভাবেই কাম্য নয়। এসব কারণে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেই শিশুরাই, যাদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে উঠেছে।
তাঁদের দাবি, প্রতিষ্ঠানে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করতে হবে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ, স্বাভাবিক ও ভয়মুক্ত শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
অভিভাবক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের ভাষায়, কয়েকজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব বা কোনো নির্দিষ্ট বলয়ের কারণে শত শত এতিম ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর ভবিষ্যৎ কোনোভাবেই জিম্মি হতে পারে না। তাঁদের মতে, প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য যাতে কোনো অভ্যন্তরীণ বিরোধ বা অনিয়মের কারণে ব্যাহত না হয়, তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।







