
শাল্লা (সুনামগঞ্জ), ৬ নভেম্বর: পতিত জমির দখল নিয়ে গ্রামের দুই পক্ষের সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার জেরে সুনামগঞ্জের শাল্লায় প্রায় ৪০টি বাড়িঘরে টানা তিন দিন লুটপাট হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি ঘটেছে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার আটগাঁও ইউনিয়নের নিজগাঁও গ্রামে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সংঘর্ষে একজন নিহতের পর প্রতিপক্ষের পুরুষশূন্য বাড়িঘর থেকে ধান-চাল, স্বর্ণালংকার, আসবাবপত্র, জমি চাষের টিলার, কৃষিকাজের ইঞ্জিন, হাঁস-মুরগি, গবাদিপশু ও নৌকাসহ অন্তত অর্ধ কোটি টাকার সম্পদ লুট করে নেওয়া হয়েছে। খুনের ঘটনার পর গ্রামের পাশের বাজারে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
রাতের আঁধারে লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে বলে নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় আটগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। থানার ওসি বলেছেন, ঘটনার পরপরই পুলিশ যাওয়ার আগে কিছু ঘটনা ঘটেছে। এখন এমন হয়ে থাকলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শাল্লা উপজেলার নিজগাঁও গ্রাম সংলগ্ন পূর্ব দিকের একটি পতিত জমির দখল নিয়ে রুপ মিয়া ও আজব আলীর মধ্যে বিরোধ চলছিল। এর জের ধরে গত ৩১ অক্টোবর দুই পক্ষের সংঘর্ষে রুপ মিয়ার চাচাতো ভাই আব্দুল মান্নান মারা যান। এরপর আজব আলীর পক্ষের লোকজন পুলিশের গ্রেপ্তারের ভয়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর তাদের বাড়িঘর লুট হয়। বাজারে পুলিশ থাকলে গ্রাম দূরে থাকার সুযোগে লুটপাট করেছে প্রতিপক্ষের লোকজন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, ঘটনার পর রুপ মিয়ার লোকজন তাদের বাড়িঘরে টানা তিন দিন লুটপাট চালিয়েছে। তিন দিনে আজব আলীর পক্ষের এলিম উদ্দিনসহ প্রায় ৪০টি বাড়ি থেকে ৬৫টি গরু, চাষাবাদের ৫টি টিলার, ২টি মোটরসাইকেল, টিউবওয়েল থেকে পানি তোলার ৫টি মটর, ডিজেলচালিত ২০টি ইঞ্জিন, ধান মাড়াইকল ২টি, শতাধিক ব্যাগ বোরো বীজ ধান, প্রায় ৪০০ মণ বোরো ধান, ২টি ফ্রিজ, ১২টি গ্যাসের চুলা ও সিলিন্ডার, নগদ ৫ লাখ টাকা ও ৩ ভরি স্বর্ণালংকার এবং গৃহস্থালির জিনিসপত্র ও হাঁড়িপাতিল পর্যন্ত লুট করা হয়েছে। পুরুষ মানুষ বাড়ি ছাড়া হওয়ার পর থেকে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন নারীরা।
নিজগাঁও গ্রামের মৃত উমর আলীর স্ত্রী মিনারা বেগম বলেন, রাতে এসে ঘরের দরজা খোলার জন্য অনেক লাথি দিয়েছে, ঘরের বেড়ায় লাথি লেগেছে, গালিগালাজ করেছে। কিন্তু ভয়ে তারা দরজা খোলেননি। ঘরের বাইরে থাকা দুই ছেলের দুটি মেশিন, চারটি গরু ও একটি নৌকা নিয়ে গেছে।
মাসুম মিয়ার স্ত্রী মোছা. আসমিনা বেগম বলেন, বাড়িঘরের সবকিছু লুট করে নিয়ে গেছে। তিন দিনের লুটপাটে তারা এখন পথের ফকিরের সমান হয়ে গেছেন। ৪০০ মণ ধান, ২০ মণ চাল, তিন ভরি স্বর্ণ, ১৭টি গরু, নগদ ৫ লাখ টাকা, ফ্রিজ, পানি তোলার মটর, মোটরসাইকেল, ট্রলি, ধান ভাঙানোর মেশিনসহ ঘরে যা ছিল সব নিয়ে নিয়েছে। এখন তারা কীভাবে চলবেন, সেই প্রশ্নই তাদের।
রেজু মিয়ার স্ত্রী তানিয়া আক্তার বলেন, তাঁর ও শাশুড়ির খাট-পালং, আলমিরা, ঘরের সব জিনিসপত্র, হাঁড়িপাতিল, ধান-চাল, জমিতে পানি দেওয়ার পাম্প লুট করে নিয়ে গেছে। রান্নার সব চুলা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। রান্না করার মতো কিছুই ঘরে নেই।
আহাদ নুর মিয়ার স্ত্রী লিমা আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, কোনো বাড়িতেই পুরুষ মানুষ নেই। খালি বাড়ি থেকে গরু-বাছুর, ধান-চাল সব নিয়ে গেছে। এখন পানি খাওয়ার একটি গ্লাসও নেই। ৫০ কিয়ারের জমির খড় ছিল, গভীর রাতে আগুন দিয়ে খড়গুলো জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের ভয়ে বাড়ি ছাড়া গ্রামের এলিম উদ্দিন। লুটপাটের খবর শুনে তাঁর ছোট বোন মাহমুদা আক্তার এসেছিলেন ভাইয়ের বাড়ি দেখতে। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত এমন ঘটনা জীবনে দেখেননি। খালি বাড়িতে মহিলাদের গালিগালাজ করে ও হুমকি দিয়ে সব লুটপাট করা হয়েছে। মারামারিতে আব্দুল মান্নান মারা যাওয়ার পর রুপ মিয়ার লোকজন তাদের ভাইদের পক্ষের প্রায় ৪০টি ঘরের কিছুই লুট করার বাকি রাখেনি।
নিহত আব্দুল মান্নানের চাচাতো ভাই রুপ মিয়া বলেন, জমিটি তাঁর বাবার নামে এবং তিনি মাটি ভরাটও করেছেন। এখন আজব আলী দাবি করেন এই জায়গা তাঁর। আজব আলীর লোকজনের হামলায় তাঁর ভাই মারা গেছেন এবং ৩০ থেকে ৪০ জন আহত হয়েছেন। তাঁর বাম পা ও মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে। তিনি বিছানা থেকে উঠতে পারেন না।
লুটপাটের অভিযোগ অস্বীকার করে রুপ মিয়া আরও বলেন, তাদের কেউ প্রতিপক্ষের বাড়িঘর লুটপাট করেনি, অন্যের জিনিসপত্র আনতে কড়া নিষেধ করা হয়েছে। তারা নিজেরাই আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে মালামাল পাচার করে তাদেরকে অভিযুক্ত করছে। পুলিশকে জানানো হয়েছে, যারাই এসবের সঙ্গে জড়িত থাকুক, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে।
আটগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, মারামারির পর রাতের আঁধারে নিজগাঁও গ্রামে লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে, এটি সত্যি। তবে কে বা কারা করছে তা তারা জানেন না। একটি বাড়ির বিশাল খড়ের গাদায় আগুন দেওয়া হয়েছে। অনেকেই জানিয়েছেন, ধান-চাল, পাওয়ার টিলার ও ইঞ্জিন লুট করে নিয়ে গেছে।
শাল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সুহেল বলেন, সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার পর নিজগাঁও গ্রামে পুলিশ যাওয়ার আগে কিছু ঘটনা ঘটেছে। এখন গ্রামের বাজারে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। রাতে এমন ঘটনা ঘটছে বলে শোনা যাচ্ছে। সবার বাড়িঘরে পুলিশের যাওয়া কঠিন। তবে পুলিশ এলাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে এবং লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একটি পতিত জমিকে কেন্দ্র করে গড়া এই বিরোধে একটি প্রাণহানি ও বহু পরিবারের সর্বস্ব হারানোর ঘটনা গ্রামীণ সমাজে জমি নিয়ে চলা দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বের ভয়াবহ রূপ তুলে ধরেছে। ক্ষতিগ্রস্ত নারীরা বলছেন, তারা কেবল বিচার চান।







