সিলেটগামি রেলপথে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি, ৮ মাসে ২০ বার বিকল ট্রেন

সিলেটগামি রেলপথে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি, ৮ মাসে ২০ বার বিকল ট্রেন - Surma Times | Sylhet News

সিলেটগামি রেলপথে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি, ৮ মাসে ২০ বার বিকল ট্রেন - Surma Times | Sylhet Newsসিলেট ৪ নবেম্বরঃ ঢাকা সিলেট অথবা সিলেট-চট্টগ্রাম, কিংবা সিলেট থেকে রেলপথে বাংলাদেশের দুরপাল্লার যেকোন যাত্রায় মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া এলাকা দিয়েই রেলের অনিবার্য যাত্রা। কিন্তু মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে যাওয়া আখাউড়া-সিলেট রেলপথে ট্রেন চলাচল ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। মাত্র পাঁচ কিলোমিটারের আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে প্রায়ই বিকল হচ্ছে ট্রেনের ইঞ্জিন, ঘটছে বগি বিচ্ছিন্ন ও লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনা।

চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই অন্তত ২০ বার ইঞ্জিন বিকল হয়ে লাউয়াছড়ার নির্জন বনে আটকে পড়ে যাত্রীবাহী ট্রেন। এতে যাত্রীদের চরম দুর্ভোগের পাশাপাশি নিয়মিত ঘটছে ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়। জরাজীর্ণ রেললাইন, পুরোনো ইঞ্জিন এবং দীর্ঘদিনের সংস্কারহীনতাকে এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সর্বশেষ গত ১ অক্টোবর রাতে লাউয়াছড়া বনের ভেতর আন্তনগর কালনী এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। এতে প্রায় এক ঘণ্টা ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়। পরদিন ২ অক্টোবর দুপুরে চট্টগ্রামগামী পাহাড়িকা এক্সপ্রেসের হুক ছিঁড়ে নয়টি বগি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এ ঘটনায় প্রায় তিন ঘণ্টা বন্ধ থাকে ট্রেন চলাচল। পরপর দুই দিনের এসব ঘটনায় আবারও আলোচনায় এসেছে গুরুত্বপূর্ণ এ রেলপথের নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ১৮৯৮ সালে তৎকালীন আসাম-চট্টগ্রাম যোগাযোগের জন্য নির্মিত হয়েছিল এ রেলপথ। শত বছরেরও বেশি পুরোনো এই লাইনে বর্তমানে ঢাকা-সিলেট ও চট্টগ্রাম-সিলেট রুটে প্রতিদিন ছয়টি আন্তনগর ট্রেন চলাচল করে। এসব ট্রেনে প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। ফলে লাউয়াছড়ার ভেতরের পাঁচ কিলোমিটার রেলপথের দুরবস্থা পুরো সিলেট অঞ্চলের রেল যোগাযোগের ওপর প্রভাব ফেলছে।

রেললাইনের নাট-বল্টু উধাও, বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা

সরেজমিনে শ্রীমঙ্গল ও ভানুগাছ রেলওয়ে স্টেশনের মধ্যবর্তী লাউয়াছড়া বনের ভেতরের রেলপথ ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন স্থানে স্লিপারের নাট-বল্টু ও ক্লিপের অধিকাংশই নেই। কোথাও ঢিলে হয়ে যাওয়া ক্লিপে নামমাত্র ঝালাই দেওয়া হয়েছে। আবার কোনো কোনো স্থানে নাট তার দিয়ে পেঁচিয়ে রাখা হয়েছে। রেললাইনের এমন অবস্থায় পাহাড়ি ও আঁকাবাঁকা পথে ট্রেন চলাচল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

তাঁদের আশঙ্কা, দুর্বল রেললাইন ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষ করে বনের নির্জন এলাকায় দুর্ঘটনা ঘটলে উদ্ধারকাজ পরিচালনা এবং যাত্রীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, লাউয়াছড়া বনের ভাঙা ব্রিজ এলাকায় রেললাইনের ঢাল অনেক বেশি। পাহাড়ি এই উঁচু পথ অতিক্রম করতে ট্রেনের শক্তিশালী ইঞ্জিন প্রয়োজন। কিন্তু সিলেট রুটে বর্তমানে ব্যবহার করা হচ্ছে ১৮ থেকে ১৯ বছরের পুরোনো এবং মেয়াদোত্তীর্ণ ২৯০০ ও ২৬১০ সিরিজের ইঞ্জিন।

পুরোনো ইঞ্জিনে পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হিমশিম

শ্রীমঙ্গল ও ভানুগাছ রেলওয়ে স্টেশনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা থেকে যে ইঞ্জিন নিয়ে ট্রেন সিলেটে পৌঁছায়, পর্যাপ্ত বিকল্প না থাকায় একই পুরোনো ইঞ্জিন দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ফিরতি ট্রেন পরিচালনা করতে হয়। ফলে ইঞ্জিনগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।

বিশেষ করে লাউয়াছড়ার পাহাড়ি ঢাল বেয়ে ট্রেন ওপরে ওঠার সময় পুরোনো ইঞ্জিনের প্রেসার কমে যায়। এতে অনেক সময় মাঝপথেই ট্রেন থেমে পড়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ট্রেনের বগির সংখ্যা বাড়ানো হলেও ইঞ্জিনের সক্ষমতা বাড়ানো হয়নি। ফলে অতিরিক্ত চাপের কারণে যান্ত্রিক ত্রুটির ঘটনা কমছে না।

ভানুগাছ রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার গৌড় প্রসাদ দাস পলাশ বলেন, লাউয়াছড়ার ভাঙা ব্রিজ এলাকায় পাহাড়ি চড়াইয়ে উঠতে গিয়ে প্রায়ই আন্তনগর ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়। গত আট মাসে অন্তত ২০ বার এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে।

একাধিকবার আটকে পড়েছে আন্তনগর ট্রেন

চলতি বছরের বিভিন্ন সময়ে লাউয়াছড়ার ভেতরে একাধিক ট্রেন দীর্ঘ সময় আটকে পড়েছে। রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, গত ৭ ফেব্রুয়ারি পাহাড়িকা এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন বিকল হয়ে পাঁচ ঘণ্টা আটকে থাকে। ১ মার্চ রাতে উপবন এক্সপ্রেসও একইভাবে পাঁচ ঘণ্টা আটকে ছিল।

এরপর ৭ মার্চ ও ১৯ মার্চ কালনী এক্সপ্রেস যথাক্রমে দেড় ও দুই ঘণ্টা বিলম্বের শিকার হয়। ১ এপ্রিল একই ট্রেন পাঁচ ঘণ্টা আটকে থাকে। ২৯ মে একটি তেলবাহী ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হয়। সর্বশেষ ১ ও ২ অক্টোবর কালনী ও পাহাড়িকা এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন বিকল এবং বগি বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনায় আবারও ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়।

এভাবে বারবার ট্রেন বিকল হওয়ায় যাত্রীদের দীর্ঘ সময় বনের মধ্যে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। পাশাপাশি একটি ট্রেনের বিলম্বের প্রভাব পড়ছে পরবর্তী ট্রেনগুলোর চলাচলেও। এতে পুরো রেলপথের সময়সূচি এলোমেলো হয়ে পড়ছে।

১৬ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পেও অগ্রগতি নেই

আখাউড়া-সিলেট রেলপথের আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল কয়েক বছর আগেই। ২০১৯ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় মিটারগেজ রেলপথকে ডুয়েল গেজে রূপান্তরের জন্য ১৬ হাজার ১০৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও মাঠপর্যায়ে কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। ফলে পুরোনো অবকাঠামো ও জরাজীর্ণ রেললাইন দিয়েই চলছে গুরুত্বপূর্ণ এই রুটের ট্রেন।

আট দফা দাবিতে আন্দোলন

রেলপথের বেহাল অবস্থা সংস্কার এবং সিলেট অঞ্চলে নতুন ট্রেন চালুর দাবিতে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় ‘আট দফা দাবি বাস্তবায়ন আন্দোলন পরিষদ’ লাগাতার কর্মসূচি পালন করছে।

পরিষদের মুখ্য সমন্বয়ক আজিজুল ইসলাম বলেন, সিলেট বিভাগের রেলপথ দীর্ঘদিন ধরে চরম অবহেলার শিকার। এই বেহাল অবস্থা দূর করতে তাঁরা মানববন্ধন ও ট্রেন অবরোধের মতো কর্মসূচি পালন করেছেন। রেল যোগাযোগের উন্নয়নে সরকারের দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বন বিভাগের কাছেও নিয়মিত যাচ্ছে খবর

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতরে ট্রেন আটকে পড়ার ঘটনা বন বিভাগের নজরেও আসছে। বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী নাজমুল হক বলেন, প্রায়ই লাউয়াছড়া বনের মাগুরছড়া এলাকায় ট্রেন আটকে পড়ার খবর পাওয়া যায়। এ ধরনের ঘটনায় বন বিভাগের কর্মীরা তাঁদের সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করে থাকেন।

অন্যদিকে, শ্রীমঙ্গল রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী মো. সাইফুল্লাহ বলেন, লাউয়াছড়ার রেলপথটি পাহাড়ি হওয়ায় সতর্কতার সঙ্গে এবং গতি কমিয়ে ট্রেন পরিচালনা করতে হয়। রেললাইনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রকৌশল দল নিয়মিত লাইন পর্যবেক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করছে।

নতুন ইঞ্জিন সংগ্রহের উদ্যোগ

বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) ফকির মো. মহিউদ্দীন বলেন, নতুন ইঞ্জিনের সংকটের কারণে মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন দিয়েই ট্রেন পরিচালনা করতে হচ্ছে। এসব ইঞ্জিন কাঙ্ক্ষিত গতি তুলতে পারছে না। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্রুত নতুন ইঞ্জিন সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে নতুন ইঞ্জিন সংগ্রহের উদ্যোগের পাশাপাশি লাউয়াছড়ার ঝুঁকিপূর্ণ রেললাইন সংস্কার, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপন এবং দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সিলেট অঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী ও বন্দরনগরীর রেল যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ এই আখাউড়া-সিলেট রেলপথ। প্রতিদিন হাজারো যাত্রীর চলাচল নির্ভর করছে এর ওপর। অথচ শত বছরের পুরোনো অবকাঠামো, মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন এবং দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকা আধুনিকায়ন প্রকল্পের কারণে লাউয়াছড়ার পাঁচ কিলোমিটার পথই এখন রেল যোগাযোগের বড় দুর্বলতায় পরিণত হয়েছে। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত সংস্কার, আধুনিক ইঞ্জিন সরবরাহ এবং রেলপথ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের বিকল্প দেখছেন না সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

★★★★★

সুরমা টাইমস পড়ে ভালো লাগলো?
আপনার মতামত জানান!

গুগলে রেটিং দিন রিভিউ লিখুন ⭐
Share This Article