নাসির উদ্দিন, সিলেট, ৪ নভেম্বর: সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে হামলার শিকার হচ্ছেন রোগীর স্বজনেরা। সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে আক্রান্ত হচ্ছেন সাংবাদিকেরা। কখনো লাঞ্ছিত, কখনো মারধরের শিকার, আবার কখনো জিম্মি করে রাখা হচ্ছে। এসব ঘটনার পর দৃষ্টান্তমূলক কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার নজির নেই। ফলে হাসপাতালটিতে বারবার ফিরে আসছে একই পরিস্থিতি।
গত দশ বছরে বহু ঘটনার সাক্ষী এই হাসপাতাল। এ অঞ্চলের চিকিৎসার আতুড়ঘর খ্যাত প্রতিষ্ঠানটিতে বিভিন্ন সময় রোগীর স্বজনরা হামলার শিকার হয়েছেন। কতিপয় ইন্টার্ন চিকিৎসকদের হামলা থেকে বাদ যাননি সাংবাদিকেরাও। গত ২৮ অক্টোবর হাসপাতালে রোগীর স্বজনদের পেটানোর ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে দৈনিক শ্যামল সিলেটের ফটোসাংবাদিক রেজা রুবেল ও সিলেটভিউ২৪ডটকমের স্টাফ রিপোর্টার নিবেন্দু তালুকদার আহত হন। এই ঘটনাকে পাশ কাটাতে চিকিৎসা সেবা বন্ধ রেখে শাটডাউন কর্মসূচি পালন করেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা।
ঘটনাটি নিয়ে সাংবাদিকদের মধ্যে প্রতিবাদ তৈরি হয়। ৩১ অক্টোবর সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের উদ্যোগে মানববন্ধন করে হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
এ বছরের ১৬ জানুয়ারি হাসপাতালের চতুর্থ তলার সার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসক, নার্স ও রোগীর স্বজনদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি থেকে সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত পাঁচজন আহত হন। এক নারী ইন্টার্ন চিকিৎসককে হেনস্তার অভিযোগও ওঠে। পরে রোগীর তিন স্বজনকে পুলিশ আটক করে আদালতে পাঠায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিতে কর্মবিরতি শুরু করেন।
১৭ জানুয়ারি চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলে ইন্টার্ন চিকিৎসক ও স্টাফদের সঙ্গে রোগীর স্বজনরা তর্কে জড়ান। ১৬ জানুয়ারি দিবাগত রাত ১২টার দিকে চতুর্থ তলার ৬ নম্বর ওয়ার্ডে হামলার ঘটনা ঘটে। পরে তারা ওয়ার্ডের ভেতরে ভাঙচুরের অভিযোগ আনেন। এক নারী শিক্ষানবিশ চিকিৎসককে হেনস্তারও অভিযোগ তুলেন। ডাক্তার ও স্টাফরা মিলে রোগীর তিন স্বজনকে বেধড়ক পিটিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেন। উল্টো শিক্ষানবিশ চিকিৎসকরা কর্মবিরতি পালন করেন। আটককৃতরা হলেন সুনামগঞ্জের ছাতক থানার খৈতর গ্রামের শিমুল আহমদ (৩৫), নাজিরা সিদ্দিকা (২২) ও জাবেদ মিয়া (২৬)।
গত ৮ জুলাই হাসপাতালে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে মারামারিতে লিপ্ত হন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। জরুরি বিভাগের সামনে কয়েক দফা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি ঘোষণা করা হয়। ইন্টার্ন ডক্টরস ফোরাম রোগীর স্বজনদের হামলায় জড়িত অভিযোগ এনে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানায়।
গত বছরের ২৭ এপ্রিল ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে রোগীর স্বজনকে লাথি মারেন চিকিৎসক তন্ময় দেবনাথ। লাথি মারার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অভিযুক্ত চিকিৎসককে কর্তব্য থেকে বিরত রেখে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ঘটনার সময় রোগী জুবায়ের আহমদের অ্যাপেন্ডিকসের ব্যথা হচ্ছিল। মারধরের শিকার যুবক ওই রোগীর বন্ধু।
২০২৪ সালের ২১ মার্চ এক প্রবীণ রোগীকে চিকিৎসকেরা মারধর করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় এক নারী চিকিৎসক হাসপাতাল পরিচালকের কাছে অভিযোগ করেন।
২০২৩ সালের ২১ আগস্ট ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডে এক রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ক্ষুব্ধ রোগীর স্বজনদের ওপর হামলা চালান ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। রোগীর স্বজনরাও ভাঙচুর করেন। পরিপ্রেক্ষিতে রোগীর স্বজনদের চারজনকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। আটক হন আবদুল মালিক (৫৪), সাবেল আহমদ, জুবেল আহমদ ও জুয়েল আহমদ। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ ছিল চিকিৎসা না পেয়ে তাদের রোগী মারা যান।
২০২২ সালের ৩ আগস্ট শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ এনে কর্মবিরতি দেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। প্রশাসনিক ভবনে তালা দেন। অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস ও পরীক্ষা বয়কট করেন। তৎকালীন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়াকে তাঁর কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। এ ঘটনায় হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ হানিফের দায়ের করা মামলায় আব্দুল্লাহ নামের এক যুবক ও অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়।
একই বছরের ১২ আগস্ট চার তলার ১ নম্বর ওয়ার্ডে রোগীর স্বজনকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। আহত হন রুবেনা বেগম (২৭)।
২০২১ সালের নভেম্বরে এক সিনিয়র সাংবাদিক তাঁর শ্বশুরকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসা শুরুতে বিলম্ব করায় উপ-পরিচালকের কাছে অভিযোগ করেন। ঘটনা জানতে পেরে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা তাঁর ওপর চড়াও হন। অন্য সাংবাদিকরা এসে তাঁকে অবরোধ থেকে উদ্ধার করেন।
২০১৯ সালের ১২ মার্চ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগ এনে রোগীর দুই স্বজনকে মারধর করা হয়। ইন্টার্ন চিকিৎসকরা রোগীর স্বজনদের মারতে কর্মরত আনসারদের নির্দেশ দেন। জনসম্মুখে কান ধরিয়ে ওঠবস করান। আহতরা যাতে অভিযোগ না করেন, এজন্য সাদা কাগজে সই নিয়ে ছেড়ে দেন। আহতরা হলেন সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ইসমাইল আলী (৩৫) ও জ্যোতিন্দ্র বিশ্বাস (২৫)।
২০১৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর নিরাপত্তাকর্মীদের টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে বচসা ও হামলার অভিযোগ ওঠে। রোগীর দুই স্বজন আহত হন।
এসব ঘটনার মধ্যে কয়েকটিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কোথাও অভিযুক্তকে দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে, কোথাও মামলা হয়েছে। তবে তদন্তের সুপারিশ বাস্তবায়ন বা বিভাগীয় শাস্তির কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। ২০০৮ সালেও কয়েকজন ফটোসাংবাদিক ইন্টার্ন চিকিৎসকদের হামলার শিকার হয়েছিলেন। সে সময় সাংবাদিকরা ঐক্যবদ্ধ থাকায় দুঃখ প্রকাশ করে আপসে নিষ্পত্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়। ২০২৬ সালে সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।
ওসমানী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাঁদের স্বজনদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব, তেমনি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি। কিন্তু একই হাসপাতালে রোগীর স্বজনদের ওপর বারবার হামলা, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, সংঘর্ষ এবং চিকিৎসাসেবা বন্ধের ঘটনা হাসপাতালের সেবাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।







