সিলেট, ৪ সেপ্টেম্বর: সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে আগামী সাত দিনের মধ্যে হাসপাতালের সব সমস্যার সমাধান হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। শুক্রবার সকালে হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে নির্মিত ১০০ শয্যার বিশেষায়িত ক্যান্সার ও কিডনি ইউনিট আগামী ছয় মাসের মধ্যে চালু হবে বলেও জানান তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “আমি দায়িত্ব নেয়ার পর ২৫ টির উপরে হাসপাতাল পরিদর্শন করেছি। সব জায়গায় চিকিৎসকদের শতভাগ উপস্থিতি ছিল। রোগীরাও বলছেন, এখন চিকিৎসার মান ও পরিবেশ উন্নত হয়েছে। খাবারের মানও ভালো হয়েছে। এখানের কি অবস্থা আমি জানি না, যদি কোনো সমস্যা থেকে থাকে তাহলে ৬ মাসের মধ্যে সমাধান হবে।” ওসমানী হাসপাতালে চিকিৎসকদের সময়মতো উপস্থিত না হওয়া সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে ডাক্তারদের আসা-যাওয়ায় সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করা হবে এবং এ ব্যাপারে ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সিলেটের নির্মাণাধীন ও অনুমোদিত সরকারি হাসপাতালগুলো শিগগিরই চালুর আশ্বাসও দেন তিনি।
স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক অগ্রগতি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ছয় মাসে দেশের সব হাসপাতালে চিকিৎসাসেবার মান বেড়েছে। চলতি মাসের শেষেই দেশব্যাপী হামের বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন শুরু হতে যাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারের উদ্যোগে পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন আনা হয়েছে এবং ইতোমধ্যে রাঙামাটি ও বান্দরবান বাদে দেশের সব জেলায় হামের টিকা দেওয়া হয়েছে।
এর আগে সকালে হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, চিকিৎসক ও নার্সদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডা. জিয়াউর রহমান চৌধুরী এবং ওসমানী হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল উমর রাশেদ মুনিরসহ সংশ্লিষ্টরা। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, সিলেটে স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে বর্তমানে তিনটি প্রধান প্রকল্প নিয়ে পুরোদমে কাজ চলছে এবং ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের বাকি কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন।
তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা মন্ত্রীর আশ্বাসের তুলনায় বেশ জটিল। জানা গেছে, ‘আটটি বিভাগীয় শহরে পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার, কিডনি ও হৃদরোগ চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন’ প্রকল্পের আওতায় ২০১৯ সালের অক্টোবরে সিলেটে এই ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়। ওসমানী হাসপাতাল প্রাঙ্গণে ১৭ তলা ভিত্তির ওপর নির্মিত ১৫ তলা এই ভবনের মূল বাজেট ধরা হয়েছিল ৮৯ কোটি ৫৬ লাখ ৯৮ হাজার ৪০৬ টাকা। ২০২১ সালের ১৮ আগস্ট চুক্তির পর ২৪ মাসের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো তা সম্পূর্ণ হয়নি। গণপূর্ত বিভাগের তত্ত্বাবধানে ভবনের ভৌত কাঠামো ও ফিনিশিংয়ের প্রায় ৯৮ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে; দুটি বেজমেন্টসহ সিভিল, স্যানিটারি ও অভ্যন্তরীণ বৈদ্যুতিক কাজও সম্পন্ন হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী এই কেন্দ্রে থাকার কথা জটিল ক্যান্সার রোগীদের জন্য রেডিওথেরাপি, ব্র্যাকিথেরাপি ও ডে-কেয়ার কেমোথেরাপি ওয়ার্ড, পুরুষ ও নারীদের জন্য পৃথক আধুনিক ওয়ার্ড, সার্জিক্যাল ব্লক, নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র, নেফ্রোলজি ইউনিট, সর্বাধুনিক ডায়ালাইসিস সেন্টার এবং ডে-কেয়ার কার্ডিয়াক সেন্টারের সুযোগ-সুবিধা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, অবকাঠামো প্রায় প্রস্তুত হলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বাস্তবায়নকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতায় হাসপাতালটি চালু করা যাচ্ছে না। হাসপাতাল পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল কাঠামোর চূড়ান্ত অনুমোদন এখনো মেলেনি, ফলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ান নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুই করা যায়নি। অন্যদিকে ক্যান্সার চিকিৎসার প্রধান যন্ত্র লিনিয়ার অ্যাকসিলারেটর ও ব্র্যাকিথেরাপি মেশিনসহ ডায়ালাইসিস সরঞ্জাম কেনার বৈশ্বিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়াও থমকে আছে।
এই দীর্ঘসূত্রতার প্রভাব সরাসরি পড়ছে রোগীদের ওপর। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক ক্যান্সার ও কিডনি রোগী প্রতিদিন ওসমানী হাসপাতালের সাধারণ ওয়ার্ডে সিটের জন্য হাহাকার করছেন। যাদের সামর্থ্য নেই, তারা প্রয়োজনীয় রেডিওথেরাপি বা ডায়ালাইসিস সেবা না পেয়ে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন, আর সামর্থ্যবানদের ছুটতে হচ্ছে চড়া মূল্যে ঢাকা কিংবা দেশের বাইরে।
নির্মাণকাজের অগ্রগতি নিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম জামাল অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার মনসুর রহমান বলেন, “এক বছর ধরে ভবনটি হস্তান্তরের জন্য অপেক্ষায় রয়েছি। ভবনের আসবাব ও লিফট স্থাপন পিডি ও গণপূর্তের কাজ। এখন ভবনটি বুঝিয়ে দিতে পারলেই আমাদের কাজ শেষ।” প্রকল্প তদারকের দায়িত্বে থাকা সিলেট গণপূর্ত বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী খালেদ সাইফুল্লাহ জানান, ভবন নির্মাণসংক্রান্ত ৯৮ ভাগ কাজ শেষ হলেও লিফট ও আনুষঙ্গিক কিছু কাজ এখনো বাকি। তিনি বলেন, একাধিকবার লিফট কেনার দরপত্র আহ্বান করা হলেও ২০১৮ সালের রেটে কোনো প্রতিষ্ঠান সরবরাহ দিতে রাজি হচ্ছে না, ফলে মন্ত্রণালয় পুনরায় দাম নির্ধারণ করছে। ডলারের দর বৃদ্ধির কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রকল্প পরিচালক ডা. তৌফিক হাসান ফিরোজ বিষয়টি আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে বলেন, মূল খরচের হিসাব করার সময় ডলারের দাম ছিল প্রায় ১০৯ টাকা, কিন্তু পরে সরকারি রেট বেড়ে ১২৩ টাকা হওয়ায় কেনাকাটার খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে। তিনি জানান, নতুন সংশোধিত প্রস্তাব ইতোমধ্যে পাঠানো হয়েছে এবং তা অনুমোদিত হলেই যন্ত্রপাতি কেনার প্রক্রিয়া শুরু হবে। তিনি বলেন, “এ প্রকল্পে কেবল সিলেট নয়, সারা দেশে আটটি পৃথক প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। সিলেট ইউনিট অবকাঠামো দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে। আমাদের সবকটা প্রকল্প মাথায় নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে।” আটটি কেন্দ্রের জন্য চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মী মিলিয়ে প্রায় ১৮ হাজার পদে জনবল সৃষ্টির একটি নতুন প্রস্তাব সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি, এবং আশা প্রকাশ করেন যে দ্রুততম সময়ে জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হবে। তবে তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশ থেকে যন্ত্রপাতি আমদানির জটিলতার কারণে হাসপাতালটি পুরোপুরি চালু করতে আরও প্রায় দুই বছর সময় লাগতে পারে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ছয় মাসের মধ্যে ইউনিট চালুর আশ্বাস এবং প্রকল্প পরিচালকের দুই বছরের বাস্তব হিসাবের মধ্যে স্পষ্ট ফারাক থেকে যাচ্ছে। এই ফারাকই মূলত তুলে ধরছে সিলেটের স্বাস্থ্যসেবা খাতের প্রকৃত চিত্র, যেখানে অবকাঠামো প্রায় প্রস্তুত হলেও জনবল সংকট, যন্ত্রপাতি সংগ্রহের জটিলতা এবং আন্তঃসংস্থা সমন্বয়হীনতা মিলিয়ে বৃহত্তর সিলেটের লাখো ক্যান্সার ও কিডনি রোগীর ভাগ্য এখনো ঝুলে আছে অনিশ্চয়তার মধ্যে।






