রায়নগর হত্যাকাণ্ডে জমি বিরোধের অভিযোগ, এজাহারে আইনজীবী সিরাজের নাম

রায়নগর হত্যাকাণ্ডে জমি বিরোধের অভিযোগ, এজাহারে আইনজীবী সিরাজের নাম - Surma Times | Sylhet News

রায়নগর হত্যাকাণ্ডে জমি বিরোধের অভিযোগ, এজাহারে আইনজীবী সিরাজের নাম - Surma Times | Sylhet Newsসিলেট, ১৫ আগস্ট: সিলেট নগরের রায়নগরে প্রবীণ ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনা হত্যাকাণ্ডে জমিসংক্রান্ত বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে। নিহত দম্পতির মেয়ে সেলিনা সুলতানা শুক্রবার রাতে কোতোয়ালি থানায় জমা দেওয়া এজাহারে অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর বাবার জমি নিয়ে বিরোধের কথা উল্লেখ করেছেন এবং হত্যাকাণ্ডে তাঁর সম্পৃক্ততার সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তবে এ অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন এবং আদালতে প্রমাণিত হয়নি।

সেলিনা সুলতানার অভিযোগ, জমিসংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে তাঁর বাবা-মা ও গৃহকর্মীকে ভাড়াটে খুনি দিয়ে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। এজাহারে তিনি দাবি করেন, হত্যাকাণ্ডের আগে মামলা প্রত্যাহারের জন্য তাঁর বাবা ও তাঁকে বিভিন্ন সময়ে হুমকি দেওয়া হয়েছিল।

গত বুধবার সকালে রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলা থেকে আব্দুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনার গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পর বাবুল মিয়া নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা জানিয়েছেন বলে পুলিশ দাবি করেছে। তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো কারণ বা ব্যক্তির সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

এজাহারে জমি বিরোধের বিবরণ

এজাহারে সেলিনা সুলতানা উল্লেখ করেন, ১৯৯৭ সালে তিনি ও তাঁর বাবা পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতি সিলেটের কাছ থেকে রিকাবীবাজারের সরষপুর এলাকায় আনুমানিক ১২ শতক জমি লিজ নিয়ে সেখানে বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছিলেন।

তাঁর অভিযোগ, ২০০৬ সালে ইম্পালস বিল্ডার্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম তাঁদের লিজ নেওয়া জমিসহ সমিতির ৮০ শতক জমি ইম্পালস বিল্ডার্সের নামে ১৮৫২২/০৬ নম্বর সাফকবলা দলিল করেন। পরে তিনি ওই জমির নামজারি করে মালিকানা দাবি করেন বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই বিরোধের জের ধরে ২০১৬ সালে সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে স্বত্ব মামলা করেন আব্দুস সাত্তার। পরে মামলাটি স্বত্ব-২১১/২০২৩ নম্বরে রূপান্তরিত হয়ে যুগ্ম জেলা জজ অতিরিক্ত আদালতে বিচারাধীন রয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করেন সেলিনা।

সেলিনার দাবি, মামলা প্রত্যাহারের জন্য তাঁকে ও তাঁর বাবাকে বিভিন্ন সময়ে হুমকি দেওয়া হয়েছে। ২০২৩ সালে সিরাজুল ইসলাম তাঁর বাবা এম এ সাত্তার, মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম, পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির বর্তমান চেয়ারম্যান জমিংথাংগা লুসাইসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করেন বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই মামলাটি অতিরিক্ত জেলা জজ পঞ্চম আদালতে বিচারাধীন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।

এজাহারে আরও বলা হয়, ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি সিরাজুল ইসলাম আমিন হোসেনসহ কয়েকজনকে নিয়ে আব্দুস সাত্তারের বাসায় গিয়ে স্বত্ব মামলা প্রত্যাহারের জন্য হুমকি দেন। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হয়। পরে ঘটনাটি নিয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

সেলিনার অভিযোগ, ২০২৫ সালের ১৮ মে সিলেট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সামনে মামলাসংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে সিরাজুল ইসলাম মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামকে মারধর করে রক্তাক্ত জখম করেন। এ ঘটনায় তৌহিদুল ইসলাম থানায় অভিযোগ করেন। পরে প্রতিকার না পেয়ে ৬ আগস্ট ২০২৫ আদালতে কোতোয়ালি সিআর ১০৫৭/২০২৫ নম্বর মামলা করেন। মামলাটি ডিবি সিলেট তদন্ত করছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

সর্বশেষ গত ২৮ জুলাই মুখ্য জেলা জজ দ্বিতীয় আদালতে পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির ভূমিসংক্রান্ত স্বত্ব ৭৩/২৩ মামলার শুনানির সময় আব্দুস সাত্তারের নিয়োজিত আইনজীবীকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন সেলিনা। ৩০ জুলাই তাঁর বাবা আদালতে গেলে তাঁকেও মামলা প্রত্যাহারের জন্য আবার হুমকি দেওয়া হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

হত্যাকাণ্ড নিয়ে পরিবারের বক্তব্য

এজাহারে সেলিনা সুলতানা অভিযোগ করেন, স্বত্ব মামলা থেকে ১৮৫২২/০৬ নম্বর সাফকবলা দলিলটি রক্ষা করার জন্য পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ভাড়াটে খুনিদের দিয়ে গত ১২ আগস্ট সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে তাঁর বাবা, মা ও গৃহকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাসা থেকে কাগজপত্র, সাধারণ ডায়েরির কপি ও দলিলাদি নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।

থানায় অভিযোগ দেওয়ার পর সাংবাদিকদের সেলিনা বলেন, “আমি বিশ্বাস করি না তিনজনকে একা একটা ছেলে হত্যা করেছে। এর পেছনে বড় কোনো হাত আছে। আমাদের মা-বাবা যেভাবে খুন হয়েছেন, পরবর্তীতে যেন আর কোনো মা-বাবার এ রকম না হয়। ছেলের কাঁধে যেন আর কোনো মা-বাবার লাশ না ওঠে।”

সেলিনার করা মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খান মোহাম্মদ মাঈনুল জাকির বলেন, নিহত দম্পতির মেয়ে বাদী হয়ে মামলা করেছেন। মামলায় বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে আব্দুস সাত্তারের বিরোধের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।

সিরাজুল ইসলামের বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম বলেন, “বিষয়টি আপনারা সবাই জানেন, তিন দিন ধরে সিলেটে আলোচনা হচ্ছে। তদন্ত হোক। এ বিষয়ে পরে কথা বলব।”

সিরাজুল ইসলাম জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে জালিয়াতি, প্রতারণা ও চেক ডিজঅনারের অভিযোগে আগে একাধিক মামলা হয়েছে এবং এসব মামলায় তিনি ২০২১ ও ২০২২ সালে কারাগারে ছিলেন বলে অভিযোগ সূত্রে জানা যায়।

২০২১ সালের ২৯ জুন রিকাবীবাজারের পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির জায়গা ও কবরস্থানের ভূমি জালিয়াতি করে সাফকবলা দলিল তৈরি, জমির শ্রেণি পরিবর্তন ও নামজারি করার অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ইসমাইল হোসেন মামলা করেন। মামলায় সিরাজুল ইসলাম ছাড়াও সদর উপজেলা সাবরেজিস্ট্রার, ভূমি অফিসের কানুনগো ও তহশিলদারকে আসামি করা হয়।

২০২২ সালের আগস্টে ওই মামলার জামিন শুনানি শেষে আদালত সিরাজুল ইসলামের জামিন নামঞ্জুর করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এর আগে চেক ডিজঅনার ও প্রতারণার মামলাতেও তিনি কারাগারে ছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগ সূত্রে আরও জানা যায়, রিকাবীবাজারে সিলেট জেলা স্টেডিয়ামের সামনে গির্জা সমিতির জায়গা ও কবরস্থান দখল করে ইম্পালস টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছে বলে সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে গির্জা সমিতি, বিনিয়োগকারী ও সিরাজুল ইসলামের মধ্যে একাধিক মামলা হয়। তবে এসব অভিযোগ ও মামলার সঙ্গে রায়নগরের হত্যাকাণ্ডের সরাসরি যোগসূত্র তদন্তে নিশ্চিত হয়নি।

জমি বিরোধের বিষয়টি তদন্তে

হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির লিজ নেওয়া জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি আলোচনায় আসে। নিহতের আইনজীবী আজিজুর রহমান মানিক জানান, মামলার কাজে আব্দুস সাত্তার নিয়মিত আদালতে যেতেন। প্রায় দুই সপ্তাহ আগেও আদালত এলাকায় তাঁকে প্রতিপক্ষের লোকজন হেনস্তা করেছিল বলে তিনি দাবি করেন।

মামলাসংশ্লিষ্ট তৌহিদুল ইসলাম বলেন, কয়েক মাস আগে আব্দুস সাত্তারের বাসায় গিয়েও তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তবে তিনি আপস করেননি বলে জানান তৌহিদুল।

এ ছাড়া রায়নগরের পাশের শিবগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা ও বিএনপির কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্রঋণবিষয়ক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক হত্যাকাণ্ডের দিন ঘটনাস্থলে গিয়ে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, মদনমোহন কলেজের সামনে নিহত পরিবারের একটি সম্পত্তি রয়েছে এবং ওই সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ ছিল বলে তিনি পরিবারের কাছ থেকে শুনেছেন।

তবে পুলিশ ইতিমধ্যে গ্রেফতার বাবুল মিয়ার জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া আলামত, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং পরিবারের করা অভিযোগ একসঙ্গে যাচাই করছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও এতে কারা জড়িত, সে বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।

★★★★★

সুরমা টাইমস পড়ে ভালো লাগলো?
আপনার মতামত জানান!

গুগলে রেটিং দিন রিভিউ লিখুন ⭐
Share This Article