জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস: দুর্ঘটনা রোধে প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস: দুর্ঘটনা রোধে প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ - Surma Times | Sylhet News

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস: দুর্ঘটনা রোধে প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ - Surma Times | Sylhet Newsসড়ক দুর্ঘটনা কেবল একটি প্রাণহানির ঘটনা নয়, এটি একটি পরিবার, সমাজ এবং জাতীয় অর্থনীতির ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। প্রতিটি মৃত্যু অপূরণীয় ক্ষতি, আর প্রতিটি গুরুতর আহত মানুষের সঙ্গে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে তাঁর পুরো পরিবার। তাই জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসকে শুধু আনুষ্ঠানিকতা কিংবা সচেতনতামূলক স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। সড়কব্যবস্থার উন্নয়ন, আইনের কার্যকর প্রয়োগ, যানবাহনের মান নিশ্চিতকরণ, চালকের দক্ষতা বৃদ্ধি, জরুরি চিকিৎসাসেবা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার বাস্তব উদ্যোগ নিতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে প্রয়োজন সবার সদিচ্ছা, দায়িত্বশীলতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ব্যক্তিগত শোক থেকেও একটি শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলনের জন্ম হতে পারে। ১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চন। তাঁর অকালমৃত্যু ইলিয়াস কাঞ্চনকে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এবং জনসচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নিতে অনুপ্রাণিত করে। এরই ধারাবাহিকতায় ওই বছরের ১ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)।

জাহানারা কাঞ্চনের প্রয়াণদিবস ২২ অক্টোবরকে ঘিরে নিরাপদ সড়কের দাবিকে জনপরিসরে তুলে ধরার উদ্যোগ নেয় নিসচা। সংগঠনটি ১৯৯৪ সাল থেকে দিনটিকে নিরাপদ সড়ক দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। নিসচার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ সালে সরকার ২২ অক্টোবরকে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে।

এই দিবসের তাৎপর্য শুধু প্রয়াত জাহানারা কাঞ্চনকে স্মরণ করা কিংবা সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, আহত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সড়ক ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার অঙ্গীকার নতুন করে দৃঢ় করারও উপলক্ষ এটি।

দুর্ঘটনা নয়, প্রতিরোধযোগ্য ঝুঁকিই মূল বিবেচ্য

সড়ক দুর্ঘটনাকে প্রায়ই দুর্ভাগ্য বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়। অথচ অধিকাংশ দুর্ঘটনার পেছনে থাকে চিহ্নিত ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য ঝুঁকি। অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া গাড়ি চালানো, চালকের ক্লান্তি ও অদক্ষতা, অনিরাপদ যানবাহন, পথচারীদের নিরাপদে রাস্তা পারাপারের অভাব, সড়কের নকশা ও রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতা এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা না পাওয়া এসবই সড়ক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রস্তাবিত ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ বা নিরাপদ ব্যবস্থা পদ্ধতি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে। এই পদ্ধতির মূল কথা হলো, মানুষ ভুল করতে পারে, কিন্তু সেই ভুল যেন মৃত্যু বা গুরুতর আঘাতের কারণ না হয়, সে জন্য পুরো পরিবহনব্যবস্থাকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে ঝুঁকি কমে আসে এবং দুর্ঘটনা ঘটলেও তার পরিণতি যতটা সম্ভব সীমিত থাকে।

এই দৃষ্টিভঙ্গিতে সড়ক নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধু চালক কিংবা পথচারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। যারা সড়ক পরিকল্পনা ও নির্মাণ করেন, যানবাহন তৈরি ও অনুমোদন দেন, গণপরিবহন পরিচালনা করেন, ট্রাফিক আইন প্রয়োগ করেন এবং দুর্ঘটনার পর চিকিৎসাসেবা দেন, তাঁদের প্রত্যেকেরই নির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। চালককে আইন মানতে হবে, একই সঙ্গে রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে মানুষের একটি ভুলের কারণে প্রাণহানি না ঘটে।

আইন আছে, প্রয়োজন কার্যকর প্রয়োগ

বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ভিত্তি। তবে আইন প্রণয়ন করলেই সড়ক নিরাপদ হয়ে ওঠে না। প্রয়োজন আইনের ধারাবাহিক ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ, প্রয়োজনীয় বিধিমালা বাস্তবায়ন, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত তদারকি।

আইন প্রয়োগে বৈষম্য, অনিয়ম কিংবা দায় এড়ানোর প্রবণতা থাকলে জনসচেতনতামূলক প্রচারও কার্যকারিতা হারায়। তাই দুর্ঘটনার তদন্তে শুধু চালককে দায়ী করে থেমে গেলে চলবে না। সড়কের নকশা, যানবাহনের যান্ত্রিক অবস্থা, পরিবহন প্রতিষ্ঠানের তদারকি, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং উদ্ধার ও চিকিৎসাসেবার ভূমিকা খতিয়ে দেখতে হবে। কোথায় ত্রুটি ছিল, কার দায়িত্ব পালনে ঘাটতি ছিল এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ঘটনা কীভাবে ঠেকানো যায়, তদন্তে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।

সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জবাবদিহি। নিয়ম ভাঙলে শাস্তির বিধান যেমন কার্যকর হতে হবে, তেমনি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে স্বচ্ছতার সঙ্গে

সড়ক নিরাপত্তায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো সময়ের দাবি। ঢাকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ক্যামেরার মাধ্যমে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের প্রযুক্তি অতিরিক্ত গতি, ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।

তবে প্রযুক্তি স্থাপন করাই যথেষ্ট নয়। ক্যামেরায় ধারণ করা তথ্যের নির্ভুলতা যাচাই, জরিমানা নির্ধারণের স্বচ্ছ পদ্ধতি, আপিলের সুযোগ এবং আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় ধারাবাহিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার যেন হয়রানি কিংবা বৈষম্যের মাধ্যম না হয়ে ওঠে, সে জন্য নজরদারি ও জবাবদিহির ব্যবস্থাও থাকতে হবে।

আইন সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ হচ্ছে কি না, সংগৃহীত তথ্য কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে দুর্ঘটনা ও আইন লঙ্ঘন কতটা কমছে, এসব বিষয় নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। প্রযুক্তির প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে এর ব্যবহার কতটা কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হচ্ছে তার ওপর।

পরিকল্পিত পরিবহনব্যবস্থা যানজট কমাতে পারে

ঢাকার যানজট ও সড়কের ওপর চাপ কমাতে আন্তজেলা বাস টার্মিনালগুলো শহরের বাইরে স্থানান্তরের উদ্যোগও গুরুত্বের সঙ্গে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। সরকারের পক্ষ থেকে রাজধানীর টার্মিনাল স্থানান্তর নিয়ে নির্দেশনা ও পরিকল্পনার কথা সংবাদমাধ্যমে এসেছে। তবে এ ধরনের উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে এর বাস্তবায়ন পরিকল্পনা ও যাত্রীসেবার মানের ওপর।

টার্মিনাল স্থানান্তরের সময় যাত্রীদের সুবিধা, নিরাপদ ওঠানামা, শহরতলি থেকে নগরের সঙ্গে নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন সংযোগ এবং আন্তজেলা ও নগর পরিবহনের সময়সূচির সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে শহরের ভেতরে দূরপাল্লার বাসের চলাচল ও যানজট কমতে পারে। বিপরীতে, পর্যাপ্ত সংযোগব্যবস্থা ছাড়া টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়া হলে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ার আশঙ্কা থাকবে।

তাই শুধু টার্মিনালের অবস্থান পরিবর্তন নয়, এর সঙ্গে সংযোগসড়ক, গণপরিবহন, যাত্রী ওঠানামার ব্যবস্থা এবং নিরাপদ চলাচলের পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা যুক্ত করতে হবে। নগর পরিবহন ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

নিরাপদ সড়ক গড়তে প্রয়োজন সমন্বিত অবকাঠামো

সড়ক নিরাপত্তার জন্য নিরাপদ সড়ক ও সড়কপাশ, নিয়ন্ত্রিত গতি, নিরাপদ যানবাহন, দায়িত্বশীল সড়ক ব্যবহারকারী এবং দুর্ঘটনার পর উন্নত জরুরি সেবা, সব ক্ষেত্রেই একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

ফুটপাত, নিরাপদ পারাপার, সাইকেল চলাচলের উপযোগী জায়গা, পরিকল্পিত বাসস্টপ, পর্যাপ্ত সড়কবাতি এবং স্পষ্ট নির্দেশক সড়ক নিরাপত্তার মৌলিক উপাদান। স্কুল, হাসপাতাল, বাজার ও আবাসিক এলাকার মতো জনবহুল স্থানে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা জরুরি। একইভাবে মহাসড়কে পথচারী ও ধীরগতির যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পৃথক ও উপযোগী অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

বিদ্যমান সড়কগুলোর নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। যেসব স্থানে বারবার দুর্ঘটনা ঘটে, সেসব স্থান চিহ্নিত করে সড়কের নকশা, বাঁক, দৃশ্যমানতা, সাইনবোর্ড, আলোকসজ্জা ও পারাপারের ব্যবস্থা সংশোধন করতে হবে। দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানগুলোতে শুধু সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন নয়, ঝুঁকির মূল কারণ দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে।

নিরাপদ গতি নিশ্চিত করতে সাইনবোর্ডের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, নিয়মিত টহল, কার্যকর জরিমানা এবং ধারাবাহিক আইন প্রয়োগ জরুরি। যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা যেন কাগজে-কলমে আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। ত্রুটিপূর্ণ ব্রেক ও টায়ার, অতিরিক্ত যাত্রী বা মালামাল বহন এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জামের ঘাটতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

চালকের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে দক্ষতা যাচাই ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। পেশাদার চালকের কর্মঘণ্টা ও বিশ্রামের নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তা তদারকি করতে হবে। গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার, ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো এবং মাদক বা অ্যালকোহলের প্রভাব দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। এসব বিষয়ে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি আইন প্রয়োগও জোরদার করা প্রয়োজন।

দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে

সড়ক নিরাপত্তার আলোচনা দুর্ঘটনা প্রতিরোধেই শেষ হতে পারে না। দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং উপযুক্ত হাসপাতালে আহত ব্যক্তিকে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা পাওয়া একজন আহত মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ক্ষতির ঝুঁকি কমাতে পারে।

এ জন্য কার্যকর জরুরি ফোনসেবা, পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স, প্রশিক্ষিত প্রাথমিক চিকিৎসাকর্মী এবং হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। বিশেষ করে মহাসড়ক ও দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, স্বাস্থ্য বিভাগ, হাসপাতাল এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজে বিলম্ব, চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা কিংবা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব যেন আহত মানুষের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কমিয়ে না দেয়, সে জন্য জরুরি সেবার সক্ষমতা নিয়মিত মূল্যায়ন ও উন্নত করতে হবে।

সমন্বিত তথ্যব্যবস্থা ও জবাবদিহি জরুরি

সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে নেতৃত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়, দায়িত্বের স্পষ্ট বণ্টন এবং অগ্রগতি পরিমাপের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

পরিবহন, সড়ক ও জনপথ, স্থানীয় সরকার, পুলিশ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সিটি করপোরেশন, বীমা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট হওয়া প্রয়োজন। কোন সংস্থা কী কাজ করবে, কত সময়ের মধ্যে করবে এবং তার ফলাফল কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে।

সড়ক দুর্ঘটনার নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের জন্য একটি সমন্বিত তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি। পুলিশ, হাসপাতাল, অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), সড়ক কর্তৃপক্ষ এবং বীমা প্রতিষ্ঠানের তথ্য সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করা গেলে দুর্ঘটনার স্থান, সময়, কারণ ও ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠী সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য চিত্র পাওয়া সম্ভব হবে।

তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে কোন এলাকায় কী ধরনের ঝুঁকি বেশি, কোন বয়সের মানুষ বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন এবং কী ধরনের অবকাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করা সহজ হবে। এর ভিত্তিতে বাজেট বরাদ্দ ও অবকাঠামো বিনিয়োগ করা গেলে প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ আরও কার্যকর হতে পারে।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে

সড়ক নিরাপত্তায় অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকেও বাংলাদেশের শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সুইডেনের ‘ভিশন জিরো’ নীতি, নেদারল্যান্ডসের পথচারী ও সাইকেলবান্ধব অবকাঠামো এবং বিভিন্ন দেশের স্বয়ংক্রিয় গতি নিয়ন্ত্রণ ও যানবাহন নিরাপত্তা পরীক্ষার ব্যবস্থা দেখায়, দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার, নিরাপদ সড়ক নকশা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং ন্যায়সংগত আইন প্রয়োগ একসঙ্গে কাজ করলে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।

তবে এসব অভিজ্ঞতা সরাসরি অনুকরণ না করে বাংলাদেশের জনঘনত্ব, সড়কের ধরন, যানবাহনের বৈচিত্র্য এবং বিদ্যমান পরিবহনব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োগ করতে হবে। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সব সময় বড় অবকাঠামো প্রকল্পের প্রয়োজন হয় না। নিরাপদ পারাপার নির্মাণ, গতি নিয়ন্ত্রণ, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা এবং চালকের পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করার মতো উদ্যোগও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গেও রয়েছে যোগসূত্র

সড়ক নিরাপত্তা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এসডিজি ৩.৬-এ সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও আঘাত কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে এসডিজি ১১.২ নিরাপদ, সাশ্রয়ী, সহজপ্রাপ্য ও টেকসই পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়।

জাতিসংঘের ২০২১-২০৩০ সড়ক নিরাপত্তা কর্মদশকের লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও আঘাত অন্তত অর্ধেকে নামিয়ে আনা। এই লক্ষ্য অর্জন শুধু আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার পূরণের বিষয় নয়, বরং প্রতিটি নাগরিকের নিরাপদে স্কুল, কর্মস্থল, হাসপাতাল ও বাড়িতে পৌঁছানোর অধিকার প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

বাংলাদেশের জন্য এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রয়োজন সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং অগ্রগতি মূল্যায়নের নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও আহত হওয়ার সংখ্যা কমাতে হলে ঘোষিত লক্ষ্যকে বাস্তব কাজের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

এক দিনের কর্মসূচি নয়, সারা বছরের অঙ্গীকার

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে নিসচাসহ বিভিন্ন সংগঠন র‍্যালি, আলোচনা সভা, সচেতনতামূলক প্রচার, কবর জিয়ারত ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে। এসব কর্মসূচি সড়ক নিরাপত্তার গুরুত্ব মানুষের সামনে তুলে ধরে এবং আন্দোলনের ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়।

তবে দিবসটির প্রকৃত সার্থকতা তখনই আসবে, যখন ২২ অক্টোবরের অঙ্গীকার সারা বছরের কর্মপরিকল্পনায় রূপ নেবে। আইনের কার্যকর প্রয়োগ, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক সংশোধন, প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার, দক্ষ চালক তৈরি এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার মতো উদ্যোগ ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

সড়ক নিরাপত্তা রাষ্ট্রের একার দায়িত্ব নয়। আবার নাগরিকদের ওপর সব দায় চাপিয়ে রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব এড়ানোরও সুযোগ নেই। পরিবহনমালিক, শ্রমিক সংগঠন, চালক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, চিকিৎসক, গণমাধ্যম, নাগরিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস: দুর্ঘটনা রোধে প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ - Surma Times | Sylhet Newsচালককে ট্রাফিক আইন মানতে হবে, পরিবহন প্রতিষ্ঠানকে চালকের প্রশিক্ষণ ও বিশ্রাম নিশ্চিত করতে হবে, যাত্রীকে নিরাপত্তাবিধি মেনে চলতে হবে এবং পথচারীর জন্য নিরাপদ ফুটপাত ও পারাপারের ব্যবস্থা রাখতে হবে। একই সঙ্গে সরকারের দায়িত্ব হলো নিরাপদ অবকাঠামো নির্মাণ, আইন প্রয়োগ, সমন্বিত তথ্যব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক, সড়ক দুর্ঘটনাকে নিয়তি বলে মেনে নেব না। ঝুঁকি চিহ্নিত করব, নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ করব, আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করব এবং প্রতিটি সড়ক ব্যবহারকারীর নিরাপত্তাকে উন্নয়নের কেন্দ্রে রাখব।

সরকারের কাছে প্রত্যাশা, সড়ক নিরাপত্তার ঘোষিত অঙ্গীকারগুলোকে সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা ও দৃশ্যমান ফলাফলে রূপ দেওয়া হবে। প্রয়োজন সুস্পষ্ট দায়িত্ব বণ্টন, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, কার্যকর তদারকি এবং ধারাবাহিক উদ্যোগ। রাষ্ট্রের নেতৃত্ব ও সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টা একসঙ্গে এগিয়ে এলে নিরাপদ সড়ক গড়ে তোলা সম্ভব।

নিরাপদ সড়ক মানে নিরাপদ জীবন। প্রতিটি প্রাণের মূল্য রয়েছে, প্রতিটি দুর্ঘটনা প্রতিরোধের সম্ভাবনা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাই সড়ক দুর্ঘটনা রোধে প্রয়োজন সবার সদিচ্ছা, দায়িত্বশীলতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা।

 

লেখক পরিচিতি:
লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি (কৃষি) কেন্দ্রীয় কমিটি
যুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) কেন্দ্রীয় কমিটি
ফোন: ০১৫৫২৬৩১১১৮, ০১৮৪২৬৩১১১৮
ইমেইল: [email protected]

★★★★★

সুরমা টাইমস পড়ে ভালো লাগলো?
আপনার মতামত জানান!

গুগলে রেটিং দিন রিভিউ লিখুন ⭐
Share This Article