সিলেট, ১২ আগস্ট: সিলেট নগরের রায়নগর রাজবাড়ি এলাকার নিজ বাসায় প্রবীণ ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার (৯০), তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৫) ও গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমকে (২৫) হত্যার ঘটনায় বাবুল মিয়া নামে এক ব্যক্তিকে আটক করেছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে সম্পর্কের জেরে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে বাবুল একাই তিনজনকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছেন বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সন্দেহভাজনকে আটকের পর পুলিশ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের দাবি করলেও এ ঘটনায় এখনো বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট হয়নি। বিশেষ করে নিহত ব্যবসায়ীর জমিসংক্রান্ত বিরোধ, ঘরের আলমারি-ওয়ারড্রব তছনছ, মামলার গুরুত্বপূর্ণ নথি ও মূল দলিল নিখোঁজ হওয়া এবং হত্যাকাণ্ডের সময়-পরিস্থিতি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে নগরের রায়নগর মিতালী এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহত আব্দুস সাত্তার সিলেট চেম্বার অব কমার্সের সাবেক পরিচালক ও প্রবীণ ব্যবসায়ী। তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম এবং গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমও ঘটনাস্থলে নিহত হন। সাত্তার-সুরাইয়া দম্পতির চার সন্তানই প্রবাসে—দুই মেয়ে যুক্তরাজ্যে এবং দুই ছেলে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন।
পুলিশের দাবি, প্রেমের সম্পর্কের জেরেই তিন খুন
হত্যাকাণ্ডের পর বিকেলে রায়নগর এলাকার একটি কলোনি থেকে বাবুল মিয়াকে আটক করে পুলিশ। তিনি ওই বাসায় আগে রংমিস্ত্রির কাজ করতেন এবং মাঝে মাঝে কসাইয়ের কাজও করতেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম জানান, গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে বাবুলের সম্পর্ক ছিল। ঘটনার দিন সকাল ৯টার দিকে তাহমিনার সম্মতিতে বাবুল ওই বাসায় প্রবেশ করেন। একপর্যায়ে দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও ধস্তাধস্তি হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তাহমিনা শারীরিক সম্পর্কে রাজি না হওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে বাবুল সঙ্গে থাকা ছুরি দিয়ে তাঁকে আঘাত করেন।
তাহমিনার চিৎকার শুনে গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে গৃহকর্তা আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে তাকেও আঘাত করেন বাবুল। এতে তিনজনই মারা যান।
পুলিশ আরও জানায়, হত্যাকাণ্ডের পর বাবুল ভেতর থেকে দরজা লক করে বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যান। পরে বাসার পাশের জঙ্গলাকীর্ণ একটি মাঠে হত্যায় ব্যবহৃত ছুরিটি ফেলে দেন। বৃহস্পতিবার সকালে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে।
কোতোয়ালি থানার ওসি খান মুহাম্মদ মাইনুল জাকির জানান, সিসিটিভি ফুটেজের ভিত্তিতে স্থানীয়দের সহায়তায় বাবুলকে শনাক্ত করা হয়। ঘটনার পর তিনি এলাকা ছেড়ে যাননি; বরং রায়নগর রাজবাড়ির আক্তার মিয়ার কলোনিতে অবস্থান করছিলেন। সাদাপোশাকে অভিযান চালিয়ে তাঁকে আটক করা হয়। আটকের সময় তাঁর পরনে লাল টি-শার্ট ছিল এবং হাতে ছুরিকাঘাতের চিহ্নও পাওয়া যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
শুরুতেই তদন্তে উঠে এসেছিল অন্য কয়েকটি বিষয়
হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পুলিশ কমিশনার জানিয়েছিলেন, বাসার আলমারি ও ওয়ারড্রব খোলা ছিল এবং স্বর্ণালংকারসহ দামি জিনিসপত্র খোয়া যাওয়ার কথা জানা গেছে। একই সঙ্গে ঘরের মেঝেতে একটি জমির দলিল পড়ে থাকার কথাও জানিয়েছিল পুলিশ।
তখন পুলিশ কমিশনার বলেছিলেন, চুরি-ডাকাতির ঘটনা কি না, জমিসংক্রান্ত বিষয় কিংবা পারিবারিক বিরোধ—সবকিছু সামনে রেখেই তদন্ত করা হচ্ছে।
কিন্তু পরদিন কোতোয়ালি থানার ওসি জানান, বাসা থেকে কী কী মালামাল খোয়া গেছে, সে বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো তথ্য বা অভিযোগ পাওয়া যায়নি। বাবুলও কোনো মালামাল নেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন বলে পুলিশ জানায়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আলমারি ও ওয়ারড্রব খোলা দেখে আগের দিন পুলিশ কমিশনার সম্ভাব্য চুরির বিষয়টি তদন্তের কথা বলেছিলেন।
এখানেই প্রশ্ন উঠছে—তাহলে কেন হত্যাকাণ্ডের পর ঘরের একাধিক আলমারি ও ওয়ারড্রব তছনছ অবস্থায় পাওয়া গেল?
জমির বিরোধ কি শুধুই কাকতালীয়?
নিহত আব্দুস সাত্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ জমিসংক্রান্ত মামলা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
জানা গেছে, নগরের রিকাবীবাজারে পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির জায়গা ও সেখানে ইম্পাস টাওয়ার নির্মাণকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী পক্ষের সঙ্গে তাঁর কোটি টাকার জমি নিয়ে স্বত্ব মামলা চলছিল।
নিহতের আইনজীবী আজিজুর রহমান মানিক জানান, আব্দুস সাত্তার ২০২৩ সালে এ বিষয়ে স্বত্ব মামলা করেন। পরে আদালতের আদেশের পর মামলার বিবাদী সিরাজুল ইসলাম বাদী হয়ে সাত্তারকে বিবাদী করে সিভিল রিভিশন মামলা করেন। ওই মামলার শুনানির তারিখ নির্ধারিত ছিল আগামী ১৯ আগস্ট।
আইনজীবীর দাবি, প্রতিটি শুনানিতে সাত্তার আদালতে হাজিরা দিতেন। এমনকি দুই সপ্তাহ আগের শুনানিতেও তিনি আদালতে উপস্থিত ছিলেন এবং সেদিন বিবাদী সিরাজুল ইসলাম তাঁকে হুমকি ও দুর্ব্যবহার করেছিলেন।
হত্যাকাণ্ডের পর সাত্তারের ঘরের তিনটি ওয়ারড্রব ও আলমারি তছনছ অবস্থায় পাওয়া যায়। তাঁর আইনজীবীর দাবি, সেখান থেকে মামলার নথিপত্র ও মূল দলিল খোয়া গেছে। অথচ ঘরের মেঝেতে একটি দলিলের অনুলিপি পড়ে থাকতে দেখা যায়।
শুনানির মাত্র কয়েক দিন আগে একজন মামলার বাদী-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির এভাবে নিহত হওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি তদন্তে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্বজন ও পরিচিতজনেরা।
নিহতের এক আত্মীয়ও জানিয়েছেন, এর আগে আব্দুস সাত্তারকে বাসায় এসে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এমনকি হুমকির ঘটনায় তাঁর মেয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
এক বাবুলের স্বীকারোক্তিতেই কি সব প্রশ্নের উত্তর মিলছে?
পুলিশের দাবি অনুযায়ী, বাবুল একাই তিনটি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। তবে ঘটনাটির কিছু দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইনজীবী ও সাংবাদিক মইনুল হক বুলবুল।
তাঁর প্রশ্ন—শারীরিক সম্পর্কের উদ্দেশ্যে কারও বাসায় গেলে সকাল সাড়ে ৯টার সময়টি কতটা স্বাভাবিক? যদি উদ্দেশ্য কেবল সম্পর্ক স্থাপন হয়, তাহলে সঙ্গে ধারালো ছুরি রাখার প্রয়োজন কেন? তিনজনকে হত্যার পরও বাবুল কেন একই এলাকায় অবস্থান করছিলেন? হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি ঘটনাস্থলের কাছাকাছি ফেলে যাওয়ার কারণই বা কী?
এসব প্রশ্নের পাশাপাশি আরও একটি বিষয় আলোচনায় এসেছে—একজন ব্যক্তি যদি কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই তিনজনকে হত্যা করে থাকেন, তাহলে হত্যাকাণ্ডের পর বাসার বিভিন্ন আলমারি-ওয়ারড্রব তছনছ হওয়ার কারণ কী?
তবে এসব প্রশ্নের কোনোটি হত্যাকাণ্ডে বাবুলের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করার প্রমাণ নয়। পুলিশ বলছে, সিসিটিভি ফুটেজ, ঘটনাস্থলের আলামত, বাবুলের শারীরিক চিহ্ন এবং তাঁর দেওয়া তথ্য—সবকিছু মিলিয়ে তাঁকেই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
সন্তানরা দেশে ফিরলে দাফন
এদিকে নিহত দম্পতির মরদেহ সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। বৃহস্পতিবার তাঁদের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
নিহত দম্পতির চার সন্তানই বিদেশে থাকেন। তাঁদের মধ্যে দুই মেয়ে যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফিরছেন। অপরদিকে ছেলে আরিফ ইফতেখার শুক্রবার দেশে আসবেন বলে পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে। সন্তানরা দেশে পৌঁছানোর পর জানাজা শেষে আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগমের দাফন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
তদন্তেই মিলবে আসল উত্তর
নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশের দ্রুত একজন সন্দেহভাজনকে আটক এবং হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি উদ্ধারের ঘটনায় তদন্তে অগ্রগতি হয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত উদ্দেশ্য, বাসার আলমারি-ওয়ারড্রব তছনছ হওয়ার কারণ, মামলার নথিপত্র ও মূল দলিল নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ এবং আব্দুস সাত্তারের জমিসংক্রান্ত বিরোধের কোনো যোগসূত্র আছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো তদন্তের অপেক্ষায়।
নিহতের পরিচিতজনদের কেউ কেউ সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধকে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে পুলিশ এখন পর্যন্ত বাবুল মিয়ার স্বীকারোক্তি ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনাটিকে দেখছে।
ফলে একজনের স্বীকারোক্তিতে তিন খুনের তাৎক্ষণিক রহস্যের সমাধান মিললেও, হত্যাকাণ্ডের পেছনের পূর্ণাঙ্গ উদ্দেশ্য ও সংশ্লিষ্ট সব প্রশ্নের উত্তর পেতে তদন্তের ফলাফলের দিকেই এখন তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে।







