সিলেট, ২৪ অক্টোবর: শনিবার সকালে হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের সাতটি দানবাক্স খোলা হয়। পঞ্চমবারের মতো প্রকাশ্যে টাকা গণনার সময় দেশি-বিদেশি মুদ্রা ও স্বর্ণালঙ্কারের পাশাপাশি উঠে আসে নানা ধরনের চিঠি।
এসব চিঠিতে আছে বিএনপির সাংগঠনিক সংস্কারের প্রস্তাব। আছে স্বামীর চাকরি ও মানসিক শান্তির প্রার্থনা। আছে বিদেশে নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে প্রতারণার অভিযোগ। আছে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবর অনিয়মের অভিযোগ। আর আছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে লেখা এক চিঠি।
একটি চিঠি লেখা হয়েছে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উদ্দেশে। প্রেরকের নাম নেই। লেখক জানিয়েছেন, ২০১১ সালে রাজনীতিতে যুক্ত হলেও পরে সরে দাঁড়ান। তিনি দলের সদস্য হতে এসএসসি পাস অথবা জিপিএ ২.৫ এবং কর্মী হতে এইচএসসি পাস ও জিপিএ ৩.৫ থাকার শর্ত চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন। এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার আগে কাউকে দলের সঙ্গে যুক্ত না করারও পরামর্শ দিয়েছেন। চিঠির শেষে ইংরেজিতে লেখা রয়েছে, ‘ও ধিহঃ ঃযব পযধহমব ঃড় পড়সব ঃযৎড়ঁময ুড়ঁ…..’। তারেক রহমানের হাত ধরে পরিবর্তন আসার প্রত্যাশা জানিয়েছেন তিনি।
আরেকটি চিঠিতে এক নারী লিখেছেন, ‘হে শাহজালাল রহমাতুল্লাহি আলাইহি, আপনার উছিলায় আমার আহালকে একটা ভালো চাকরি দিন এবং উনার মানসিক শান্তি দান করুন।’ নাম-পরিচয় নেই।
ভৈরবের আবু বক্কর ছিদ্দিক নিজের ভাইয়ের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ তুলে চিঠি দিয়েছেন। তার অভিযোগ, বিদেশে নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ভাই তাকে অনেক স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। পরে সেই আশ্বাস পূরণ করেননি। আবু বক্কর জানিয়েছেন, ভাইদের মধ্যে তিনি সবার ছোট। এ ঘটনায় অসহনীয় মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছেন। তবু ভাইয়ের সমৃদ্ধি কামনা করেছেন। তার প্রার্থনা, ভাই যেন হাজার কোটি টাকার মালিক হন। চিঠিটি গণমাধ্যমে প্রকাশের জন্য মাজার কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। পরিচয় হিসেবে শুধু নাম ও ভৈরবের কথা উল্লেখ করেছেন।
দানবাক্সে পাওয়া গেছে দুদকের চেয়ারম্যান বরাবর লেখা একটি চিরকুটও। এতে মাজারের অর্থ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে। দেশ-বিদেশ থেকে আসা ভক্ত ও দর্শনার্থীরা শ্রদ্ধা থেকে দান করেন। এই অর্থের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছ হিসাব, জবাবদিহি ও নিয়মিত নিরীক্ষা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়। দানবাক্সের অর্থ গণনা, ব্যাংকে জমা, খরচের হিসাব ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষার দাবি জানানো হয়েছে। অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণ মিললে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান চিরকুটদাতা।
চিরকুটে ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা হলেন শামুন মাহমুদ খান, নূর ইসলাম পচা, রুহের আহমদ মনি, রং বাবুল, দেওয়ান, তাহের, ধান চুরা আক্তার, সৌরভ সোহেল (বাবুর্চি), বকরি খোকন ও বদ্রনূর সায়েক। শেষোক্ত ব্যক্তির নাম ও পরিচয় সঠিক কি না, তা যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে বলেও বলা হয়। চিরকুটটি কে দিয়েছেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। দুদক বা মাজার কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনও পাওয়া যায়নি। বিষয়টি সিলেটে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
আরেকটি চিঠি পাওয়া গেছে শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে। নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলা ছাত্রলীগের পক্ষে হাবিবুর রহমান রাজু লিখেছেন এটি। গত ২৮ সেপ্টেম্বর ওই উপজেলা ছাত্রলীগের উদ্যোগে বিশেষ দোয়া ও প্রার্থনার আয়োজন করা হয়। চিঠিতে লেখা হয়েছে, ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। তারিখঃ ২৮/০৯/২৬। নোয়াখালী জেলা শাখা সুবর্ণচর উপজেলা ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর কন্যা দেশ রত্ন শেখ হাসিনার ৮০তম জন্মদিন উপলক্ষে হযরত শাহ্ জালাল মাজারে নেত্রীর জন্য দোয়া ও প্রার্থনা করছি। আল্লাহ পাক যেন তাকে সর্বদা সুস্থ রাখেন এবং বাংলাদেশের মানুষের আশার আলো হয়ে যেন ফিরে আসেন। আমিন।’
হযরত শাহজালাল (রহ.) দরগাহ শরিফের সরেকওম মোতাওয়াল্লি ফতেহ উল্লাহ আল আমান বলেন, দানবাক্সে পাওয়া এসব চিঠিতে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের নানা সমস্যা, কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা, পারিবারিক সংকটসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে। অনেকে নিজেদের চাওয়া-পাওয়া পূরণের আশায় এসব চিঠি লিখে দানবাক্সে রেখে যান। এটি তাদের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও আবেগের বহিঃপ্রকাশ।
মাজারের দানবাক্স শুধু অর্থের আধার নয়। সেখানে জমা হচ্ছে মানুষের আশা, অভিযোগ, প্রার্থনা ও রাজনৈতিক বার্তাও।






