সিলেটে পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করেছেন মুমিনুল ইসলাম চৌধুরী। তাঁর অভিযোগ, মায়ের আইনগত ও পারিবারিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করতে এবং হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ অমান্য করে তাঁর ভাই এহসানুল ইসলাম চৌধুরী ও বোন তানজিন ইসলাম চৌধুরী অপপ্রচার চালাচ্ছেন। পৈতৃক সম্পত্তি দখল, জালিয়াতি ও কোটি টাকার ভাড়া আত্মসাতের অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ মাল্টিমিডিয়া জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন (বিএমজেএ) সিলেট বিভাগীয় কমিটির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মুমিনুল ইসলাম চৌধুরী এসব অভিযোগ তুলে ধরেন। এ সময় পরিবারের সম্পত্তি নিয়ে চলমান বিরোধ, আদালতের আদেশ এবং ভাড়ার টাকা বণ্টনসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, তাঁদের বাবা মরহুম এনামুল ইসলাম চৌধুরী জীবিত থাকাকালে ২০১০ সালের ২৮ নভেম্বর ১৭১/২০১০ নম্বরের একটি রেজিস্টার্ড দলিল সম্পাদন করেন। ওই দলিলে বাবার মৃত্যুর পর নালিশি সম্পত্তি আমৃত্যু ভোগদখলের সম্পূর্ণ অধিকার স্ত্রী বুলবুল নাহার চৌধুরীকে দেওয়া হয়। পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে তিন ভাই-বোনের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের একটি রূপরেখাও নির্ধারণ করা হয়।
২০২১ সালের জানুয়ারিতে এনামুল ইসলাম চৌধুরীর মৃত্যুর পর ২০২২ সালে কানাডা ও আমেরিকা থেকে এহসানুল ইসলাম ও তানজিন ইসলাম দেশে আসেন। সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, ওই সময় তাঁরা মায়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করে ৩৬২৪/২০২২ নম্বরের একটি বাটোয়ারা দলিল সম্পাদন করান।
পরবর্তী সময়ে বাবার সম্পাদিত মূল দলিল সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর বুলবুল নাহার চৌধুরী ওই বাটোয়ারা দলিল বাতিলের দাবিতে সিলেট আদালতে ৮৭/২০২৫ নম্বর স্বত্ব মোকদ্দমা দায়ের করেন। ওই মামলার পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বিভাগের তিনটি পৃথক সিভিল রিভিশন, যার নম্বর ৩৫৬৮/২০২৫, ৪৭৩৮/২০২৫ ও ৫৩০৯/২০২৫, এর আদেশে সম্পত্তির দখলসংক্রান্ত স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
একই সঙ্গে পরবর্তী সময়ে সম্পাদিত বাটোয়ারা দলিলের কার্যকারিতা স্থগিত করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়। মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত জেলা রেজিস্ট্রার, সাব-রেজিস্ট্রার ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) (এসি ল্যান্ড)সহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ওপর জমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়।
তবে হাইকোর্টের ওই আদেশ বহাল থাকা অবস্থায় এহসানুল ইসলাম ও তানজিন ইসলাম চৌধুরী নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে বহিরাগত ব্যক্তিদের নামে আমমোক্তারনামা সম্পাদন করেছেন বলে অভিযোগ করেন মুমিনুল ইসলাম চৌধুরী। তাঁর দাবি, এ ধরনের পদক্ষেপ আদালতের আদেশ অমান্য করার শামিল। এ বিষয়ে আদালতের আদেশ ও সংশ্লিষ্ট দলিলের আইনগত অবস্থান নিয়ে বিরোধ রয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়।
পৈতৃক সম্পত্তির ভাড়ার টাকা বণ্টন নিয়েও বিস্তারিত বক্তব্য দেওয়া হয় সংবাদ সম্মেলনে। এতে বলা হয়, বাবার মৃত্যুর পর থেকে নালিশি সম্পত্তির ভাড়ার একটি অংশ শরিয়াহ আইন অনুযায়ী মা নিয়মিত সন্তানদের ব্যাংক হিসাবে পাঠাতেন। এহসানুল ইসলাম নিজেই স্বত্ব মোকদ্দমায় দায়ের করা রিসিভারশিপ আবেদনে স্বীকার করেছেন যে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তাঁর ব্যাংক হিসাবে মা নিয়মিত টাকা জমা দিয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে আরও দাবি করা হয়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বুলবুল নাহার চৌধুরী জানতে পারেন, তাঁর সন্তানরা পৈতৃক সম্পত্তি দেখাশোনার জন্য বহিরাগত হাবিবুর রহমান শিবলু ও আব্দুল কাইয়ুমকে নোটারাইজড পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিয়েছেন। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি ভাড়ার লভ্যাংশ দেওয়া স্থগিত করেন।
এরপর হাবিবুর রহমান শিবলুকে দিয়ে মা, ভাই, তাঁর স্ত্রী এবং ৪৮ বছরের পুরোনো ম্যানেজারের বিরুদ্ধে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সিআর মামলা করা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। মামলাটির নম্বর ৯৪৭/২০২৬। মুমিনুল ইসলাম চৌধুরীর দাবি, এ মামলা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ভাড়ার লভ্যাংশ বন্ধ করার ঘটনার সঙ্গে এর যোগসূত্র রয়েছে।
ভাড়ার টাকা মায়ের ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও ব্যাখ্যা দেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, করোনাকালে বিদেশে অবস্থানরত তিন ভাই-বোনের সম্মতিতে ব্র্যাক ব্যাংকের সিলেট শাখায় জমা হওয়া ভাড়ার টাকা মায়ের ব্যাংক হিসাবে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এ জন্য ডাকযোগে পাঠানো অনুমতিপত্রে এহসানুল ইসলাম ও তানজিন ইসলাম স্বাক্ষর করে ফেরত পাঠান।
মুমিনুল ইসলাম চৌধুরীর দাবি, ২০২১ বা ২০২২ সালে দেশে অবস্থানকালেও এহসানুল ইসলাম ওই স্বাক্ষরকে জাল বলে দাবি করেননি। কিন্তু সম্প্রতি মা ভাড়ার লভ্যাংশ দেওয়া বন্ধ করার পর ওই অনুমতিপত্রকে জাল পাওয়ার অব অ্যাটর্নি হিসেবে দাবি করা হচ্ছে। অথচ সংশ্লিষ্ট ভাড়ার টাকা সরাসরি মায়ের ব্যাংক হিসাবেই জমা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে, প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও নাকচ করেছেন সংবাদ সম্মেলনকারীরা। তাঁদের বক্তব্য, এ অভিযোগ সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও বানোয়াট। কোতোয়ালী থানার তদন্তকারী কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট সময়ের কল লগ পরীক্ষা করলেই অভিযোগটির সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হবে বলে দাবি করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বিচারাধীন বিষয় নিয়ে অসত্য তথ্য প্রচারের নিন্দা জানানো হয়। একই সঙ্গে পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে চলমান বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য বিচারব্যবস্থার ওপর পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করেন মুমিনুল ইসলাম চৌধুরী।
তবে সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে এহসানুল ইসলাম চৌধুরী ও তানজিন ইসলাম চৌধুরীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এসব অভিযোগের সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।








