২০ দিনের প্রেমের সম্পর্ক, যেভাবে তিন খুনের ‘রহস্য উদঘাটন’ করল পুলিশ

২০ দিনের প্রেমের সম্পর্ক, যেভাবে তিন খুনের ‘রহস্য উদঘাটন’ করল পুলিশ - Surma Times | Sylhet News

২০ দিনের প্রেমের সম্পর্ক, সিলেটে একাই তিন খুনের দাবি পুলিশের - Surma Times | Sylhet Newsসিলেট, ১২ আগস্ট: সিলেট মহানগরীর রায়নগর মিতালি আবাসিক এলাকায় একই বাসায় তিনজনকে হত্যার ঘটনায় রহস্যের জট খুলেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। নিহত গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমের সঙ্গে ২০ দিনের প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে দেখা করতে গিয়ে তাঁকে হত্যার পর একে একে গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্তা আব্দুস সাত্তারকেও ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন বাবুল মিয়া। পুলিশের কাছে দেওয়া জিজ্ঞাসাবাদে এমন স্বীকারোক্তি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে মহানগর পুলিশ। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিটি উদ্ধারে অভিযান চালানো হলেও এখন পর্যন্ত সেটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে নগরীর রায়নগর মিতালি আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহতরা হলেন বাসার মালিক ও সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক ও কয়লা ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম এবং তাঁদের গৃহকর্মী তাহমিনা বেগম (২৫)।

সকালে প্রতিবেশীরা বাসার দরজার নিচ দিয়ে রক্ত বের হতে দেখে সন্দেহ করেন। পরে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দরজার তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে। পরে পিবিআই ও সিআইডির ক্রাইমসিন ইউনিট ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহগুলো সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়।

তিনজনের একসঙ্গে নিহত হওয়ার ঘটনায় শুরুতেই হত্যার কারণ নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। এটি ডাকাতি, পারিবারিক বিরোধ নাকি সম্পত্তিসংক্রান্ত কোনো বিরোধ, এমন একাধিক সম্ভাবনা সামনে রেখে তদন্ত শুরু করে পুলিশ।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম। তিনি জানান, হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য বিভিন্ন মোটিভ সামনে রেখে তদন্ত করা হচ্ছে। দ্রুত রহস্য উদঘাটনে বিশেষ তদন্তও শুরু করা হয়।

তদন্তের শুরুতেই বাসার আশপাশের বিভিন্ন সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে পুলিশ। ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীদের নজরে আসে লাল টি-শার্ট ও মাথায় ক্যাপ পরা এক ব্যক্তি। পরে তাঁর পরিচয় শনাক্তে অনুসন্ধান শুরু হয়।

সিলেট কোতোয়ালি থানার ওসি মাইনুল জাকির জানান, ঘরের ভেতরের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে লাল জামা পরা একজন বাসায় ঢুকছেন। এর পরপরই সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ হয়ে যায়। ওই ফুটেজের সূত্র ধরেই সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে শনাক্তের চেষ্টা চালায় পুলিশ।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় একজন ভিডিও দেখে বাবুল মিয়াকে শনাক্ত করেন। পরে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার পর রায়নগর রাজবাড়ির আক্তার মিয়ার কলোনিতে তাঁর বাসার চারপাশে সাদাপোশাকে পুলিশ অবস্থান নেয়। একপর্যায়ে মরদেহ উদ্ধারের কাজ শেষ হওয়ার পর বাবুল মিয়া বাসায় ফিরলে তাঁকে আটক করা হয়। তখনও তাঁর পরনে লাল গেঞ্জি ছিল। তাঁর দুই হাতে ছুরির আঘাতের চিহ্নও দেখতে পায় পুলিশ বলে জানান ওসি মাইনুল জাকির।

ঘটনার প্রায় চার ঘণ্টার মধ্যেই নূর মিয়ার ছেলে বাবুল মিয়াকে আটক করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি তিনজনকে হত্যার কথা স্বীকার করেন বলে পুলিশের দাবি।

পুলিশ জানায়, নিহত গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমের সঙ্গে বাবুল মিয়ার ২০ দিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। বুধবার সকালে তাহমিনার সঙ্গে দেখা করতে ওই বাসায় যান বাবুল। তাহমিনার সম্মতিতেই তিনি বাসায় প্রবেশ করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে বাবুল তাহমিনার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাব দেন। তাহমিনা এতে রাজি না হওয়ায় দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও ধস্তাধস্তি শুরু হয়। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে বাবুলের হাতে থাকা ছুরি দিয়ে তাহমিনাকে আঘাত করা হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

তাহমিনার চিৎকার শুনে গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম ছুটে এলে তাঁকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। এরপর ধস্তাধস্তি ও চিৎকারের শব্দ শুনে গৃহকর্তা আব্দুস সাত্তার ঘর থেকে বেরিয়ে এলে তাঁকেও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের কাছে বাবুল মিয়া স্বীকার করেছেন।

তিনজনকে হত্যার পর বাসার ভেতর থেকে দরজা লাগিয়ে বেলকনি দিয়ে বেরিয়ে যান বাবুল। পরে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিটি বাসার পাশের একটি জঙ্গলাকীর্ণ মাঠে ফেলে দেন বলে পুলিশকে জানান তিনি। এরপরও এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাননি। রায়নগর এলাকাতেই অবস্থান করছিলেন।

সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল জানিয়েছেন, তিনি ওই বাড়িতে রংমিস্ত্রির কাজ করতেন। সেই সুবাদে গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বুধবার সকাল ৯টার দিকে তিনি ওই বাসায় প্রবেশ করেন এবং তাহমিনা তাঁকে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকিয়ে দেন।

পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, পরে বাবুল গৃহকর্মীকে নিয়ে একটি কক্ষে প্রবেশ করেন। সেখানে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন নিয়ে তাঁদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে বাবুল ছুরি দিয়ে তাহমিনাকে আঘাত করেন। শব্দ শুনে সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এলে তাঁকেও ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়। তাঁদের চিৎকার শুনে আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে তাঁকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে বাবুল বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যান।

নগরীর সোবাহনীঘাট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই (নিরস্ত্র) শিপলু চৌধুরী জানান, বাবুল মিয়া পেশায় রঙ মিস্ত্রি। পাশাপাশি মাঝেমধ্যে কসাইয়ের কাজও করতেন। কসাইয়ের কাজের সুবাদে তাঁর কাছে থাকা ছুরিটিই হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।

পুলিশ জানিয়েছে, বাবুল মিয়ার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাসার পাশের ঝোপঝাড় ও জঙ্গলাকীর্ণ মাঠে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চালানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ছুরিটি পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

হত্যাকাণ্ডের পরপরই সিলেট নগরীতে আতঙ্ক তৈরি হলেও সিসিটিভি ফুটেজ, স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য এবং সন্দেহভাজনের গতিবিধি অনুসরণ করে দ্রুত তদন্তে অগ্রগতি আসে। মাত্র চার ঘণ্টার মধ্যে একজনকে আটকের পর পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের কারণ ও ঘটনার ধারাবাহিকতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।

রায়নগরের একটি বাসায় একই ঘটনায় তিনজনের মৃত্যুর ঘটনায় নগরজুড়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে বাবুল মিয়ার কথিত প্রেমের সম্পর্ক এবং সেই সম্পর্কের জেরে বিরোধ থেকে একের পর এক হত্যার যে বর্ণনা পুলিশ দিয়েছে, তা এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তবে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার এবং মামলার পরবর্তী তদন্তে ঘটনার আরও বিস্তারিত তথ্য সামনে আসবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

★★★★★

সুরমা টাইমস পড়ে ভালো লাগলো?
আপনার মতামত জানান!

গুগলে রেটিং দিন রিভিউ লিখুন ⭐
Share This Article