ঢাকা, ১৫ জুলাই: শিশুদের মানবিক গুণাবলি বিকাশে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ, রাষ্ট্র, গণমাধ্যম ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন সমাজসেবক ও শিক্ষাবিষয়ক পর্যবেক্ষক লায়ন মো. গনি মিয়া বাবুল। তিনি বলেন, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিশুদের নৈতিকতা, মানবিকতা ও মূল্যবোধের ওপর। তাই কেবল শিক্ষিত নয়, মানবিক ও মূল্যবোধসম্পন্ন প্রজন্ম গড়ে তোলার দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
এক নিবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, শিশুদের মধ্যে সততা, সহানুভূতি, দায়িত্ববোধ, পরোপকারিতা, শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম ও মানবপ্রেমের মতো গুণাবলি ছোটবেলা থেকেই বিকশিত করতে হবে। তবে বর্তমান সময়ে ভোগবাদী সংস্কৃতি, অতিরিক্ত প্রযুক্তিনির্ভরতা, সামাজিক অবক্ষয় এবং পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা শিশুদের মানবিক বিকাশের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তার মতে, প্রত্যেক শিশু জন্মগতভাবেই নানা মানবিক গুণের সম্ভাবনা নিয়ে পৃথিবীতে আসে। এসব গুণ যথাযথ পরিবেশ ও পরিচর্যার মাধ্যমে বিকশিত হয়। কিন্তু অনুকূল পরিবেশের অভাবে অনেক সময় সেই সম্ভাবনা পূর্ণতা পায় না। ফলে শিশুদের মানবিক বিকাশ নিশ্চিত করতে সমাজের সব স্তরের অংশগ্রহণ অপরিহার্য।
লায়ন গনি মিয়া বাবুল বলেন, মানবিক গুণাবলি বলতে এমন নৈতিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে বোঝায়, যা একজন মানুষকে অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল, দায়িত্বশীল, ন্যায়পরায়ণ ও উদার করে তোলে। সত্যবাদিতা, সততা, ক্ষমাশীলতা, সহনশীলতা, সহযোগিতা, সম্মানবোধ, শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেম এসব গুণাবলির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
তিনি ধর্মীয় মূল্যবোধের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, সব ধর্মই মানুষকে সত্য, ন্যায়, সততা, দয়া, সহানুভূতি ও আত্মসংযমের শিক্ষা দেয়। শিশুদের মধ্যে ধর্মীয় মূল্যবোধ গড়ে উঠলে তারা মানবিক চরিত্রের অধিকারী হয়ে ওঠে এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে বেড়ে ওঠে।
নিবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, ধর্মীয় শিক্ষা শিশুদের নৈতিক চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর মাধ্যমে তারা সত্য কথা বলা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা, বড়দের সম্মান করা এবং ছোটদের স্নেহ করার মতো গুণ অর্জন করে। একই সঙ্গে অসহায়, দরিদ্র ও বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতাও তৈরি হয়।
শিশুর মানবিক বিকাশে পরিবারের ভূমিকাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরিবারই শিশুর প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বাবা-মাই তার প্রথম শিক্ষক। অভিভাবকরা যদি নিজেদের আচরণের মাধ্যমে সততা, শৃঙ্খলা, সহানুভূতি ও সৌজন্যবোধের উদাহরণ তৈরি করেন, তবে শিশুরাও সেসব মূল্যবোধ সহজেই গ্রহণ করে।
তিনি বলেন, শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সত্য কথা বলা, বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করা, ছোটদের স্নেহ করা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রকৃতি ও প্রাণীর প্রতি মমত্ববোধ শেখানো প্রয়োজন। গল্প বলা, নৈতিক শিক্ষা এবং পারিবারিক আলোচনায় শিশুদের সম্পৃক্ত করাও তাদের মানবিক বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
বিদ্যালয়ের ভূমিকা প্রসঙ্গে লায়ন গনি মিয়া বাবুল বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেওয়ার স্থান নয়; বরং এটি শিশুদের সামাজিকতা, নেতৃত্ব, দায়িত্ববোধ ও শৃঙ্খলা শেখার ক্ষেত্র। তিনি বিদ্যালয়ে নিয়মিত নৈতিক শিক্ষা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিতর্ক, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রমের আয়োজনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সমাজের প্রভাব সম্পর্কে তিনি বলেন, একটি সুস্থ, নিরাপদ ও মূল্যবোধসম্পন্ন সামাজিক পরিবেশ শিশুদের মানবিক বিকাশে সহায়ক। অন্যদিকে সহিংসতা, দুর্নীতি, মাদকাসক্তি ও সামাজিক বৈষম্য শিশুদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন, ক্রীড়া ক্লাব, পাঠাগার ও সামাজিক সংগঠনগুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তথ্যপ্রযুক্তির যুগে শিশুদের ওপর গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবের বিষয়েও তিনি সতর্কতা জানান। তিনি বলেন, প্রযুক্তি জ্ঞান অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করলেও অনুপযুক্ত বিষয়বস্তু শিশুদের মানসিক ও নৈতিক বিকাশে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই অভিভাবকদের সচেতন তদারকির পাশাপাশি গণমাধ্যমেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শিক্ষানীতিতে নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে শিশুশ্রম, নির্যাতন, বাল্যবিবাহ ও সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
এ প্রসঙ্গে তিনি ১৫ জুলাই রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের কথা উল্লেখ করেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিক্ষকদের উদ্দেশে বলেন, “মানুষ করার কারিগর আপনারা।” তিনি শিশুদের মানবিকভাবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, কোনো শিশু যেন নির্দয় হয়ে না ওঠে এবং মানবিক বাংলাদেশ গড়তে মানবিক সৈনিক তৈরি করতে হবে।
লায়ন গনি মিয়া বাবুল মনে করেন, বর্তমানে অতিরিক্ত প্রযুক্তিনির্ভরতা, পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা, পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা, সামাজিক বৈষম্য ও ভোগবাদী সংস্কৃতি শিশুদের মানবিক বিকাশের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের শুধু ভালো ফলাফলের জন্য চাপ দেওয়া হলেও নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধ গঠনের বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
তিনি বলেন, শিশুদের মানবিক গুণাবলি বিকাশে কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। পরিবার, বিদ্যালয়, সমাজ, রাষ্ট্র, গণমাধ্যম, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক সংগঠনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শিশুদের সামনে ইতিবাচক আচরণের উদাহরণ তৈরি করতে পারলেই একটি নৈতিক, মানবিক ও মূল্যবোধসম্পন্ন প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
নিবন্ধের উপসংহারে তিনি বলেন, শিশুরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে এবং দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। তাই তাদের মানবিক, নৈতিক ও মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করা সম্ভব, যারা মানবতা, ন্যায়, ভালোবাসা ও সহমর্মিতার আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে একটি শান্তিপূর্ণ, সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।







