
সুরমা টাইমস রিপোর্টঃ সিলেট-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য, প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন ও শিক্ষানুরাগী মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীর জানাজায় কানাইঘাট উপজেলায় হাজার হাজার মানুষের ঢল নেমেছিল। শনিবার বাদ আসর (১৩ জুন) তাঁর নিজ প্রতিষ্ঠিত জামেয়া ইসলামিয়া ইউসুফিয়া দাখিল মাদ্রাসা মাঠে জানাজা শেষে মাদ্রাসা প্রাঙ্গণেই তাঁকে দাফন করা হয়েছে।
মরহুমের ছেলে মাওলানা নাজমুস সাকিব জানাজায় ইমামতি করেন। জানাজায় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর এটিএম আজহারুল ইসলাম এমপি, সিলেট-৫ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য মুফতী মাওলানা মোহাম্মদ আবুল হাসান এমপি, জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহছানুল মাহবুব জুবায়েরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।
বিএনপি, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠনের নেতা এবং স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জানাজায় অংশ নেন। জানাজার আগে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় নেতারা মরহুমের কর্মজীবন ও অবদানের কথা স্মরণ করেন।
শুক্রবার রাতে ইন্তেকাল
শুক্রবার (১২ জুন) দিবাগত রাত দেড়টার দিকে সিলেট নগরীর সোবহানীঘাটস্থ ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। দীর্ঘদিন ক্যান্সার, কিডনি ও বার্ধক্যজনিত জটিল রোগে ভুগছিলেন তিনি। গত মে মাসে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শেষ দুই দিন তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন।
তিনি স্ত্রী, এক ছেলে ও চার মেয়েসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন, শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন।
রাজনীতি ও শিক্ষায় অনন্য অবদান
১৯৪৬ সালের ডিসেম্বরে কানাইঘাটের রাজাগঞ্জ ইউনিয়নের তালবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী। সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা থেকে কামিল এবং এমসি কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। ছাত্রজীবনে ইসলামী ছাত্রসংঘের সিলেট জেলা সভাপতি ছিলেন তিনি। পরে জামায়াতে ইসলামীর সিলেট জেলা আমীর, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ ও মজলিসে শূরা সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০০১ সালে চার দলীয় জোটের প্রার্থী হয়ে সিলেট-৫ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এমপি থাকাকালীন নির্বাচনী এলাকায় রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্টসহ অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। আশির দশকে সিলেটে প্রথম জামেয়া ইসলামিয়া মিরাবাজার উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া পাঠানটুলা জামেয়া ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা, আল-আমিন জামেয়া ইসলামিয়াসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। নিজ গ্রাম তালবাড়িতে জামেয়া ইসলামিয়া ইউসুফিয়া দাখিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন।
সামাজিক ও ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। আনজুমানে খেদমতে কুরআন গঠন এবং আল-হামরা শপিং সিটির উদ্যোক্তা হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।
মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুতে সিলেটের রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমেছে। নেতৃবৃন্দ তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। সিলেটবাসী একজন নির্লোভ ও সাদাসিধে মানুষকে হারিয়ে গভীর শূন্যতা অনুভব করছেন।
বিভিন্ন মহলের শোক
সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য, বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ও প্রখ্যাত আলেম অধ্যক্ষ মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীর ইন্তেকালে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সরকারি穿梭ন ও সংশ্লিষ্ট নেতৃবৃন্দ।
সরকারি মন্ত্রীদের শোকবার্তা
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী
আজ শনিবার এক শোকবার্তায় মাননীয় মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, “মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন সিলেটের জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট অঞ্চলের মানুষের এক পরম শ্রদ্ধেয় অভিভাবক। শিক্ষা বিস্তার, দ্বীনি দাওয়াত ও সমাজসেবায় তাঁর অনন্য অবদান এ অঞ্চলের মানুষ দীর্ঘকাল শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ রাখবে। তাঁর মৃত্যুতে আমরা একজন নিবেদিতপ্রাণ জননেতা এবং প্রাজ্ঞ আলেমকে হারালাম, যা দেশের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।”
মন্ত্রী মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
বাণিজ্য, শিল্প, পাট ও বস্ত্র মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির
শনিবার (১৩ জুন) গণমাধ্যমে প্রেরিত এক শোক বার্তায় মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন একাধারে বরেণ্য আলেম, সৎ জননেতা এবং সিলেটের আধুনিক ইসলামী শিক্ষার অন্যতম অগ্রদূত। সংসদ সদস্য হিসেবে কানাইঘাট ও জকিগঞ্জের মানুষের কল্যাণে এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
বিএনপি নেতৃবৃন্দের শোক
শনিবার (১৩ জুন) এক যৌথ শোক বার্তায় সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী ও সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী এই শোক প্রকাশ করেন।
বিএনপি নেতৃবৃন্দ বলেন, অধ্যক্ষ মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন একাধারে একজন প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ, নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষাবিদ এবং সমাজ সংস্কারক। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব ও সামাজিক অবদান সিলেটবাসী তথা দেশবাসী চিরকাল শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।
জামায়াত ইসলামীর শোকবার্তা
শনিবার (১৩ জুন) এক যৌথ শোক বার্তায় জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগরী আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও সিলেট জেলা আমীর মাওলানা হাবিবুর রহমান, মহানগর নায়েবে আমীর ড. নূরুল ইসলাম বাবুল ও সেক্রেটারী মোহাম্মদ শাহজাহান আলী এবং জেলা সেক্রেটারী জয়নাল আবেদীন বলেন— বৃহত্তর সিলেটের ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম সিপাহশালার।
তিনি দ্বীনের দ্বায়ি হিসেবে আজীবন কুরআন ও ইসলামের খেদমতে কাজ করে গেছেন। দ্বীনি শিক্ষার প্রসার মসজিদ মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় অগ্রনী ভুমিকা পালন করেছেন। একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁর নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন ও সততার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।
অমায়িক ব্যবহারের কারণে তিনি দল মত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের কাছে ছিলেন শ্রদ্ধা ও প্রিয় ব্যক্তিত্ব। বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও প্রখ্যাত প্রবী আলেমে দ্বীন অধ্যক্ষ মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীর ইন্তেকালে সিলেটবাসী একজন অভিভাবকতুল্য আলেম ও রাজনীতিবিদকে হারালো।
অন্যান্য শোকবার্তা
- সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিইউকে) চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী গভীর শোক প্রকাশ করেছেন
- বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস সিলেট মহানগর শাখার সভাপতি জননেতা আলহাজ্ব মাওলানা এমরান আলম ও সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ আব্দুল গাফফার শোক প্রকাশ করেছেন
সকল নেতৃবৃন্দ মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজন, গুণগ্রাহী ও সহকর্মীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।







