গাজীপুরের কালিয়াকৈরের সফিপুরে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর (ভিডিপি) ৪৬তম জাতীয় সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সদস্যদের প্রতি শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব এবং দেশপ্রেমের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন।
বুধবার সকালে আনসার-ভিডিপি একাডেমিতে আয়োজিত এই সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, শৃঙ্খলার সামান্য ঘাটতিও জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে। তাই একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী গড়ে তুলতে ‘চেইন অব কমান্ড’ ও কঠোর শৃঙ্খলা মেনে চলা অপরিহার্য।
প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের মাধ্যমে আনসার-ভিডিপি ভবিষ্যতে একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং মানবিক বাহিনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। তিনি উল্লেখ করেন, তৃণমূল পর্যায়ে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সামাজিক উন্নয়নে অবদানের মাধ্যমে এই বাহিনী ইতোমধ্যে একটি জনমুখী ও বহুমাত্রিক সংগঠনে পরিণত হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেই সংকটময় সময়ে আনসার-ভিডিপি সদস্যরা থানা পাহারা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা প্রদানের ক্ষেত্রেও তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ব্যাটালিয়ন আনসার, অঙ্গীভূত আনসার, থানা ও উপজেলা পর্যায়ের ইউনিট এবং ভিডিপি-টিডিপির সমন্বিত কাঠামো দেশের নিরাপত্তা ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
প্রধানমন্ত্রী আনসার-ভিডিপির সামাজিক কার্যক্রমের প্রশংসা করে বলেন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নারী নির্যাতন মোকাবিলা, মাদকবিরোধী কার্যক্রম এবং জাতিগত সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় এই বাহিনীর ভূমিকা প্রশংসনীয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই বাহিনী শুধু নিরাপত্তা নয়, সামাজিক পরিবর্তনেরও এক গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।
মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে আধুনিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, জাপানি ভাষা শিক্ষা, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং ও সিক্স-জি ওয়েল্ডিংয়ের মতো সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ সদস্যদের দক্ষতা বাড়াচ্ছে এবং দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আনসার-ভিডিপিকে একটি নির্ভরযোগ্য ‘ফাস্ট রেসপন্ডার’ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বন্যা, অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন দুর্যোগে তাদের সাহসিকতা ও দ্রুত পদক্ষেপ জনগণের আস্থা অর্জন করেছে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ যেমন রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং, সোলার প্যানেল ও বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের মাধ্যমে তারা টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
ক্রীড়া ক্ষেত্রেও আনসার-ভিডিপির সাফল্যের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশ গেমসে ধারাবাহিক চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে বাহিনীটি ‘স্বাধীনতা পদক’ অর্জন করে। এছাড়া আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া আয়োজন নিরাপদ করতে দেশের ১০টি ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ৩৭৯ জন অঙ্গীভূত আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধে আনসার বাহিনীর অবদান স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, প্রায় ৪০ হাজার সদস্য রাইফেল হাতে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, যাদের মধ্যে ৬৭০ জন শহীদ হন। তিনি শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান এবং তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।
অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী আনসার-ভিডিপি একাডেমির বিভিন্ন কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। তিনি তাঁত ও বুনন শিল্প, মৃৎশিল্প, গবাদিপশু খামার এবং জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ঘুরে দেখেন এবং সদস্যদের কাজ সম্পর্কে অবহিত হন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা এটিএম শামসুল ইসলাম, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানসহ সংসদ সদস্য ও ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা।
এর আগে, সকাল ১০টায় জাতীয় সমাবেশে যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শহীদদের স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে দিনের কর্মসূচি শুরু করেন। একাডেমির প্যারেড গ্রাউন্ডে পৌঁছালে তাকে স্বাগত জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী এবং আনসার-ভিডিপির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ।



