খুনির স্বীকারোক্তি – রামিসার জন্য কান্না-ক্ষোভ

ঢাকার মিরপুরে আট বছরের এক শিশুকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া নৃশংস হত্যাকাণ্ডে দেশজুড়ে শোক, ক্ষোভ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। মামলার প্রধান আসামি আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেছে, যা আরও নাড়িয়ে দিয়েছে জনমত।

মিরপুরে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড

নিহত রামিসা আক্তার পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর পল্লবী থানাধীন মিরপুর-১১ এলাকার একটি বাসা থেকে তার মস্তকবিহীন মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে একই বাসার বাথরুমের একটি বালতি থেকে তার মাথা উদ্ধার করা হয়।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিদিনের মতো সেদিনও স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতির সময় রামিসা বাসা থেকে বের হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর তাকে না পেয়ে খোঁজ শুরু করেন মা। পাশের ফ্ল্যাটের সামনে শিশুটির স্যান্ডেল পড়ে থাকতে দেখে সন্দেহ হলে দরজায় কড়া নাড়া হয়, কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া মেলেনি। পরে জরুরি সেবা নম্বরে ফোন করা হলে পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে এবং রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে।

মায়ের বর্ণনায় ঘটনার ভয়াবহতা

নিহতের মা পারভীন আক্তার জানান, দরজায় বারবার কড়া নাড়ার সময় ভেতরে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে পুলিশ ঢুকে যে দৃশ্য দেখে, তা ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক। তিনি দাবি করেন, ওই সময় ঘরের ভেতরেই অপরাধ সংঘটিত হচ্ছিল এবং আসামির স্ত্রী দরজা না খুলে সময়ক্ষেপণ করছিলেন।

তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তার মেয়েকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং ঘটনাটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়।

স্বীকারোক্তিতে উঠে এলো ঘটনার বিবরণ

তদন্ত কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, গ্রেপ্তার হওয়া সোহেল রানা (৩৪) আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে হত্যার দায় স্বীকার করেছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন সকালে মাদক সেবনের পর সে শিশুটিকে কৌশলে নিজের বাসায় নিয়ে যায়।

এরপর ঘরের ভেতরে তাকে নির্যাতনের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে অপরাধের প্রমাণ গোপন করতে মরদেহ খণ্ডবিখণ্ড করার চেষ্টা করা হয়। ঘটনার এক পর্যায়ে বাইরে থেকে দরজায় ধাক্কা পড়লে মরদেহ লুকিয়ে ফেলা হয় এবং পরে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়।

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনায় ব্যবহৃত অস্ত্রসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধার করা হয়েছে।

দ্রুত গ্রেপ্তার ও তদন্ত

ঘটনার পরপরই অভিযান চালিয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয় তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে, যিনি ঘটনার বিষয়ে ভিন্ন দাবি করেছেন।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত ও তাৎক্ষণিক অভিযানের মাধ্যমে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়।

নিহতের বাবা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। আদালতের নির্দেশে দুই আসামিকেই কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

আদালত প্রাঙ্গণে উত্তেজনা, বিচার দাবি

আসামিদের আদালতে হাজির করা হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা দেখা যায়। অনেকেই তাদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।

নিহতের বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা শোক ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তিনি তার সন্তানকে আর ফিরে পাবেন না এবং বিচার প্রক্রিয়া নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

নিহতের বাড়িতে গিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য কর্নেল (অব.) আব্দুল বাতেন পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেন। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যথাযথ তদন্ত ও শক্ত মামলা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে কোনো ফাঁকফোকর না থাকে।

তিনি আরও বলেন, এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধ করা যায়।

এই ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হচ্ছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।