মস্কো, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬: ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করার জোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে মস্কোতে ‘রুদ্ধদ্বার’ বৈঠক করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শীর্ষ দুই প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার। তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এই বৈঠকটিকে ক্রেমলিন ‘অত্যন্ত উপযোগী’ বলে বর্ণনা করলেও যুদ্ধ বন্ধের চুক্তির বিষয়ে কোনো বড় ধরনের অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়নি।
ক্রেমলিনের সহকারী ইউরি উশাকভ বলেন, মার্কিন প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার ‘সংকট সমাধানের সম্ভাব্য বিভিন্ন উপায় নিয়ে বেশ কিছু চিন্তাভাবনা উপস্থাপন করেছেন’। তবে উশাকভ সেগুলোর বিস্তারিত প্রকাশ করেননি। তিনি জানান, পুতিন মার্কিন দুই প্রতিনিধিকে বলেছেন যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়া ‘বাস্তব অগ্রগতি’ অর্জন করছে এবং নিজের লক্ষ্য অর্জনে তার আত্মবিশ্বাসী। একইসঙ্গে যুদ্ধের ‘মূল কারণগুলো’ সমাধানের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন পুতিন।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণ মাত্রায় আগ্রাসন শুরুর পর থেকে মস্কো বারবার এসব বক্তব্য দিয়ে আসছে। সম্প্রতি দুই পক্ষই তাদের দূরপাল্লার বিমান হামলা জোরদার করলেও যুদ্ধের ফ্রন্টলাইন অনেকটাই অপরিবর্তিত রয়েছে।
হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, এই আলোচনা ছিল ‘গঠনমূলক’ এবং আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পরবর্তী পদক্ষেপ ঘোষণা করা হবে।
জানুয়ারির পর মস্কোতে এটিই ছিল উইটকফ ও কুশনারের প্রথম সফর। তারা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে এ সফর পরিচালনা করেন। তবে বৈঠক শেষে তারা কোনো মন্তব্য করেননি। বৈঠক শেষেই তারা মস্কো ত্যাগ করেন। রবিবার কিয়েভে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে দেখা করার কথা রয়েছে।
উশাকভ বলেন, এই আলোচনা কেবল ইউক্রেন সংকট সমাধানের মতবিনিময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এতে অর্থনৈতিক বিষয়াদি এবং সম্ভাব্য বড় ও পারস্পরিক লাভজনক রুশ-আমেরিকান প্রকল্প নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সার্বিকভাবে বলা যায়, এই আলোচনা ছিল সময়োপযোগী এবং উভয় পক্ষের জন্যই অত্যন্ত ফলপ্রসূ।
বৈঠকে উপস্থিত পুতিনের বিনিয়োগ বিষয়ক প্রতিনিধি কিরিল দিমিত্রিভ এক্স-এ লিখেছেন, এই বৈঠকটি ছিল একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ শান্তি মিশন’।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট এই যুদ্ধ শেষ করতে ট্রাম্পের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন। পুতিন বৈঠকের শুরুতে প্রচারিত এক টেলিভিশনে বলেন, তিনি (ট্রাম্প) যে একটি জটিল পরিস্থিতিতে পা রাখছেন তা বোঝা সত্ত্বেও সংকট সমাধানে সহায়তা এবং ভূমিকা রাখতে পিছপা হচ্ছেন না।
গত শুক্রবার ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যুদ্ধ শেষ করার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একটি নতুন প্রস্তাব রয়েছে, তবে তিনি এর বিস্তারিত জানাননি।
মার্কিন আলোচকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন পুতিন। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ আগে জানিয়েছিলেন, প্রতিনিধিদলের সফরের কারণে পুতিন রুশ সামরিক বাহিনীকে তিন দিনের জন্য কিয়েভে হামলা না চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
গত ১০ দিনে রাশিয়া ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে দিনরাত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যার মধ্যে শুক্রবার ইউক্রেনের এসবিইউ নিরাপত্তা সংস্থার হেডকোয়ার্টারে হামলাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
অন্যদিকে, যুদ্ধ চালিয়ে যেতে মস্কোর খরচ বাড়িয়ে দিতে ইউক্রেনও গ্রীষ্মকাল জুড়ে রাশিয়ার শোধনাগার, তেল টার্মিনাল এবং অনলাইন খুচরা বিক্রেতা ‘ওয়াইল্ডবেরিজ’-এর গুদামগুলোতে মারাত্মক হামলা চালিয়েছে। জেলেনস্কি জানিয়েছেন, কিয়েভও সোমবার পর্যন্ত মস্কোতে হামলা চালানো থেকে বিরত থাকতে প্রস্তুত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে প্রাণঘাতী এই যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে, সে বিষয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেন এখনো পরস্পরের থেকে বহু দূরে অবস্থান করছে।
ক্রেমলিনের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি মার্কিন প্রতিনিধিদের সফরের খবর আসার আগেই রয়টার্সকে বলেছিলেন, পুতিন এখনো আরও ভূখণ্ড দখল করতে মরিয়া। তিনি বলেন, দনেৎস্ক অঞ্চলের অবশিষ্টাংশ পুতিনের নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্রে চুক্তি বা সমঝোতার কোনো সুযোগ নেই। তিনি আরও জানান, সামরিক কমান্ডারদের রিপোর্টের ভিত্তিতে ক্রেমলিন প্রধান আত্মবিশ্বাসী যে, এ বছরের শেষের মধ্যেই তারা এটি অর্জন করবেন।
তবে পশ্চিমা সামরিক বিশ্লেষকরা মস্কোর বর্তমান ধীরগতির অগ্রগতির কথা বিবেচনা করে এমন সম্ভাবনা কম বলেই মনে করেন। রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে রক্ষা করা ভূমি ছেড়ে দিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছে ইউক্রেন এবং এ ধরনের শর্তকে আত্মসমর্পণের শামিল বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ক্রেমলিন শুক্রবার জানায়, দুই বছর আগে দেওয়া বক্তব্যে পুতিনের নির্ধারণ করা অবস্থানটি ছিল ‘অটল’- যা অনুযায়ী ইউক্রেনকে রাশিয়া দাবি করা চারটি অঞ্চল ছেড়ে দিতে হবে এবং ন্যাটোতে যোগদানের পরিকল্পনা ত্যাগ করতে হবে।






