গুমের ১৫ বছর, এখনো ফেরেনি প্রিয়জন

গুমের ১৫ বছর, এখনো ফেরেনি প্রিয়জন - Surma Times | Sylhet News

গুমের ১৫ বছর, এখনো ফেরেনি প্রিয়জন - Surma Times | Sylhet Newsঢাকা, ৩০ আগস্ট: একজন মানুষ হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান। থানায় মামলা নেই, আদালতে হাজির করা হয়নি তাকে। তিনি কোথায় আছেন, কেমন আছেন, এমনকি বেঁচে আছেন কি না, এসব প্রশ্নের কোনো জবাব নেই কারো কাছে। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কেটে যায় শুধু অপেক্ষায়। গুম হওয়া স্বজন একদিন ফিরে আসবেন, এই আশাতেই এখন সময় কাটছে হাজারো পরিবারের। আওয়ামী লীগের শাসনামলে গুম হওয়া অনেকের স্বজন এখন শুধু প্রিয়জনের স্মৃতি হাতড়ে কাঁদেন, দিনরাত অপেক্ষা করেন এই বুঝি ফিরে এলেন। কিন্তু সেই অপেক্ষার শেষ হয় না, স্বজনও ফেরেন না। এমনই এক দুঃসহ বাস্তবতার মধ্যে দেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস।

মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গুমের শিকার মানুষদের বিষয়ে তদন্ত এবং তাদের পরিণতি নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, নতুন করে আর কেউ গুমের শিকার হচ্ছেন না বলে মনে করছেন তারা।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গুমের অভিযোগ তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিশন গঠন করা হয়। ২০১০ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট পর্যন্ত সময়ে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখাই ছিল কমিশনের কাজ। গত জানুয়ারিতে সরকারের কাছে জমা দেয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে কমিশন জানায়, তারা মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ পেয়েছিল, যাচাই শেষে যার মধ্যে ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে জোরপূর্বক গুম হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তিকে মৃত বলে ধারণা করা হয়েছে। কমিশনের সদস্যরা মনে করছেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে, সম্ভাব্য পরিসংখ্যান ৪ হাজার থেকে ৬ হাজারের মধ্যে। কারণ দীর্ঘদিন ভয়, সামাজিক চাপ ও প্রতিশোধের আশঙ্কায় অনেক ভুক্তভোগী পরিবার কখনোই কমিশনের কাছে আসেননি।

বাংলাদেশে গুমের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত নাম ‘আয়নাঘর’। ২০২৪ সালের পর একাধিক ব্যক্তি গোপন আটককেন্দ্রে দীর্ঘদিন বন্দি থাকার অভিজ্ঞতা প্রকাশ্যে আনেন। তাদের বর্ণনায় উঠে এসেছে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে একাকী আটক রাখা, জিজ্ঞাসাবাদ এবং নির্যাতনের ঘটনা। কমিশন নিজেও ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় গোপন আটককেন্দ্র থাকার তথ্য পেয়েছে, বেশ কয়েকটি আয়নাঘর সরেজমিন পরিদর্শনও করেছে তারা। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর তথা ডিজিএফআই-এর সদর দপ্তরের ভেতরের জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলসহ র‍্যাব, ডিবি ও সিটিটিসির অন্তত আটটির বেশি গোপন বন্দিশালার তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। ডিজিএফআই সদর দপ্তরের ইন্টারোগেশন সেলও পরিদর্শন করেছে কমিশন, যেখানে অন্তত ২২টি সেল পাওয়া গেছে।

ভুক্তভোগী পরিবার ও সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু তালিকা তৈরি বা অভিযোগ নথিভুক্ত করলেই তাদের অপেক্ষার অবসান হবে না। প্রয়োজন প্রতিটি ঘটনার স্বাধীন তদন্ত, জড়িতদের শনাক্তকরণ, প্রমাণ সংরক্ষণ, দায়ীদের বিচার এবং ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে জরুরি নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান, গোপন আটককেন্দ্রের তথ্য প্রকাশ এবং পরিবারগুলোর ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন।

মানবাধিকারকর্মী ও গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সাবেক সদস্য মো. নূর খান লিটন বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের দোহাই দিয়ে দীর্ঘদিন গুমের ঘটনাগুলো আড়াল করা হয়েছে। তার মতে, গুমের অভিযোগের তদন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে দেওয়া হলে তা কার্যকর হবে না। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে শুধু আইন পরিবর্তন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সৎ ও সাহসী ব্যক্তিদের নিয়োগও। কমিশনের আরেক সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস বলেন, গুমের অভিযোগ পুলিশের কাছে জমা দেওয়া এবং পুলিশকেই তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার মধ্যে বড় সমস্যা রয়েছে। কমিশনের কাছে জমা পড়া দেড় হাজারের বেশি অভিযোগের মধ্যে প্রায় ২৫০টিতে প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল, তবে অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ জিডি বা অভিযোগই গ্রহণ করেনি বলে তিনি জানান।

গুমের ১৫ বছর, এখনো ফেরেনি প্রিয়জন - Surma Times | Sylhet Newsগুম সংক্রান্ত অনুসন্ধান কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, গুম মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ। তার ভাষায়, কারো মৃত্যু হলে পরিবার শোকপ্রকাশ ও দাফন-কাফনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে পারে, কিন্তু গুমের ক্ষেত্রে পরিবার জানতেই পারে না প্রিয়জন কোথায় আছেন। দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তার মধ্যে, আশা ও হতাশার মাঝামাঝি এক স্থগিত অবস্থায় জীবনযাপন করতে হয় তাদের, সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক কলঙ্ক ও আর্থিক সংকট। তিনি বলেন, আগের সরকারের আমলে গুম ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের কেন্দ্রে ছিল এই অপরাধ। চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এর অবসান ঘটেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশে গুমের সংস্কৃতির অবসান হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক সরকার গঠনের পর এখন পর্যন্ত নতুন কোনো গুমের অভিযোগ ওঠেনি। বাংলাদেশ ২০২৪ সালের ২৯শে আগস্ট জোরপূর্বক গুম থেকে সকল ব্যক্তির সুরক্ষার আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুমোদন করে, যা এই অপরাধ প্রতিরোধ ও ভুক্তভোগীদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে দেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারকে শক্তিশালী করেছে। এর আগে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫ অনুমোদন করে, যাতে তদন্ত, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষা, ক্ষতিপূরণ এবং জাতীয় তথ্যভাণ্ডারের বিধান রাখা হয়। গুম প্রতিরোধের লক্ষ্যে এখন ‘জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’ নামে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার, বিলটি ইতিমধ্যে জাতীয় সংসদে উপস্থাপনও করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক বাণী দিয়েছেন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার প্রতিটি গুমের ঘটনা তদন্ত করে বিচার কার্যক্রম শুরু করেছে। তিনি বাংলাদেশসহ বিশ্বের সকল গুম হওয়া ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের প্রতি গভীর সহানুভূতি জানিয়ে বলেন, বিশ্বের নিকৃষ্টতম অপরাধগুলোর মধ্যে গুম বা এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স সবচেয়ে ভয়ঙ্কর এবং এটি মানবাধিকারের চরমতম লঙ্ঘন। তিনি অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের পতিত, পরাজিত ও পলাতক ফ্যাসিস্ট সরকার জনগণের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার দমন করতে গুম-অপহরণের পথ বেছে নিয়েছিল এবং ভুক্তভোগীদের দীর্ঘদিন আটকে রাখতে তৈরি করেছিল যেসব গোপন বন্দিশালা, তা পরিচিতি পায় ‘আয়নাঘর’ নামে। দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থার হিসাব অনুযায়ী ওই সরকার কমপক্ষে সাত শতাধিক মানুষকে গুম করেছে বলে দাবি করেন তিনি, একে অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ও হৃদয়বিদারক বলে উল্লেখ করেন। এই বাণীতে তিনি জানান, ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ এবং ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’ ইতিমধ্যে জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়েছে। এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য ‘ভিক্টিমস ফার্স্ট, অ্যাকশন্স নাউ’ উল্লেখ করে তিনি এই অপরাধে জড়িতদের বিচার ও জবাবদিহিতার জন্য বিশ্বব্যাপী ঐক্যের আহ্বান জানান।

তবে নতুন আইন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের এক আলোচনা সভায়। গুম ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দেয়ার দাবি জানানো হয় সেখানে। শেখ হাসিনার সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে গুম হওয়া ব্যক্তি ও তাদের স্বজনদের হয়ে এই দাবি তোলে অধিকার। গতকাল রাজধানীর বিশ্বসাহিত্যকেন্দ্রে আয়োজিত এই আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজন ও গুমফেরত ব্যক্তিরা। অনেকেই গুমের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন, একইসঙ্গে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬ বাতিলের দাবিও জানান তারা।

গত ৩রা আগস্ট মন্ত্রিসভা এই আইন অনুমোদন করে, যেখানে শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল পুলিশকে। পরে ২৭শে আগস্ট কিছুটা পরিবর্তন এনে বিলটি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়। আইনের ১৪(৩) ধারায় বলা হয়েছে, শৃঙ্খলা বাহিনী বা তার কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত সংশ্লিষ্ট বাহিনী নিজে পরিচালনা করতে পারবে না, বরং সরকার সেই তদন্তভার অন্য কোনো বাহিনী বা আন্তঃবাহিনীর তদন্ত দলের কাছে অর্পণ করতে পারবে। তবে অধিকার ও গুমের ভুক্তভোগীদের মতে, এই বিধান বাস্তবায়নযোগ্য নয়। কারণ পুলিশসহ যেকোনো শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক গুমের তদন্ত পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে, বাংলাদেশে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের ইতিহাসও রয়েছে। অধিকার ও গুম সংক্রান্ত ইনকোয়ারি কমিশনের তথ্যেও দেখা গেছে, গুমের ক্ষেত্রে প্রায়ই এক বাহিনী আরেক বাহিনীর নামে মানুষ তুলে নিয়ে যেত, ফলে নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া প্রকৃতপক্ষে কোন বাহিনী দায়ী তা জানা কখনোই সম্ভব হয়নি।

এই পরিসংখ্যান আর নীতিগত আলোচনার ফাঁকে রয়ে গেছে মানুষের ব্যক্তিগত কষ্টের গল্পগুলো। আমেনা আক্তার মিষ্টির স্বামী মোহাম্মদ ফিরোজ খান পিন্টুকে ২০১২ সালের ২৪শে আগস্ট চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানা থেকে গুম করা হয়। তার তিন মাস আগে তার দেবরকেও ঢাকার মিরপুর-১ নম্বর থেকে পুলিশ পরিচয়ে তিনজন লোক তুলে নিয়ে যায়। মিষ্টি বলেন, স্বামীকে হারানোর সময় তাদের সন্তানের বয়স ছিল দুই বছর। সেই সন্তানকে নিয়ে স্বামীর সন্ধানের আশায় কেটে গেছে ১৪ বছর, ২৪শে আগস্ট সন্তান পা দিয়েছে পনেরো বছরে। তবু একটাই প্রশ্ন রয়ে গেছে, স্বামী ও দেবর কোথায়, তাদের সঙ্গে কী করা হয়েছে। স্বামী হারানোর পরের দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, প্রথমে দুই বছর শাশুড়ির কাছে ছিলেন, পরে সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে যেতে হয়। স্বামী গুম হওয়ার কারণে বাসা ভাড়াও পেতেন না, তাকে এমনভাবে ট্যাগ দেয়া হয়েছিল যেন স্বামী খারাপ ছিলেন বলেই সরকার তাকে নিয়ে গেছে। কথাগুলো বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন আমেনা। তার শাশুড়ির দুই সন্তানই গুম হয়েছেন, বৃদ্ধ বয়সে স্বামী নেই, সন্তান নেই, ওষুধ আর ভাতের জন্য এখনো কেন হাত পাততে হবে, এই প্রশ্নই এখন তার সরকারের কাছে। ২০২০ সাল থেকে সাহস করে স্বামীর সন্ধানে রাস্তায় দাঁড়িয়েছেন তিনি, কিন্তু পনেরো বছর পরও রাস্তায় নামতে হচ্ছে সেই একই দাবি নিয়ে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমার স্বামী কোথায় আছে, কেমন আছে, এটুকু জানতে চাই।” গুমের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে সাজা দেয়ার এবং স্বামী-দেবরকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, তার মতো আর কোনো স্ত্রীকে যেন স্বামীর সন্ধানে কাঁদতে না হয়।

সন্ধান চাইতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন আরেক পরিবারও। বাগেরহাটের মোংলা এলাকা থেকে চলতি বছর কোস্ট গার্ড কর্তৃক গুমের শিকার হন মিরাজ শেখ। তার স্ত্রী মুক্তা খাতুন জানান, স্বামীর সন্ধান করতে গিয়ে তিনি নিজেও হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন। ঘটনার বর্ণনায় মুক্তা বলেন, ১০ই এপ্রিল শুক্রবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে লুঙ্গি-গেঞ্জি পরা অবস্থায় তার স্বামীকে কোস্ট গার্ড আটক করে, অপরাধ জানতে চাইলে মারতে মারতে জেটির মাথায় নিয়ে যাওয়া হয় তাকে, সেখানে টানানো হয় কালো কম্বল, চলে অকথ্য নির্যাতন। পরে কোস্ট গার্ডের স্পিডবোটে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে, ছবি-ভিডিও তোলা হয়। এরপর দফায় দফায় কোস্ট গার্ডের দুয়ারে ঘুরেও কোনো সন্ধান পাননি মুক্তা। উল্টো মানববন্ধন করায় তাদের নামে সন্ত্রাসী মামলা দেয়া হয়, গ্রামবাসীর ওপরও চালানো হয় নির্যাতন। মুক্তা জানান, তাকে ও তার শাশুড়ি-ননদকে চুল ধরে কোস্ট গার্ডের লোহার বোটের সঙ্গে টেনে নেয়া হয়, যার মেডিকেল রিপোর্ট এখনো তাদের কাছে সংরক্ষিত আছে। পরে দুটি মামলায় ২৭ দিন জেল খাটতে হয় তাদের, জামিনের পরও আসে হুমকি। মুক্তা জানান, নির্যাতনের সময় তার স্বামীর নখ পর্যন্ত উপড়ে ফেলা হয়েছিল বলে তিনি শুনেছেন, অথচ কর্তৃপক্ষ বলছে মিরাজকে তারা চেনেই না। পাঁচ মাস পার হলেও স্বামীর কোনো খবর নেই তার কাছে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটাই আকুতি জানান তিনি, স্বামীকে যেন ফিরিয়ে দেয়া হয়।

জামিন পেয়েও রেহাই মেলেনি ভয়েস অব এনফোর্সড ডিসঅ্যাপেয়ার্ড পারসন্স-এর প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল কাইয়ুমের। নিজেই গুমের ভুক্তভোগী কাইয়ুম জানান, ২০১৭ সালের ১০ই এপ্রিল সাদা পোশাকধারী একদল লোক রামপুরা থেকে তাকে তুলে নেয়, পরে যারা নিজেদের প্রশাসনের সদস্য বলে পরিচয় দেয়। তাকে নেয়া হয় র‍্যাব-১১-তে, যেখানে তখন কর্মরত ছিলেন এসএইচ আরিফুদ্দিন, যিনি বর্তমানে কারাগারে বন্দি ও যার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে মামলা চলমান। তার নেতৃত্বেই একটানা ২৩ দিন গুম রাখা হয় কাইয়ুমকে। এই সময়ে তার পরিবার একটি জিডি করতে গিয়ে অন্তত ২০টি থানায় ঘুরতে বাধ্য হয়, শেষে এক আত্মীয়ের প্রশাসনিক প্রভাবে জিডি নেয়া হলেও সেই আত্মীয়কেই পরে সাসপেন্ড করা হয়। নির্যাতনের মধ্য দিয়ে ২৩ দিন পর তাকে চালান দেয়া হয়, চার মাস পর হাইকোর্ট থেকে জামিন পেলেও জেলগেট থেকে তাকে আবার নতুন করে গুম করা হয়। কাইয়ুম জানান, চালান দেয়ার সময় র‍্যাব-১১-এর এক কর্মকর্তা তাকে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, জামিনে বের হলে গেট থেকেই তাকে সরিয়ে দেয়া হবে। নির্যাতনের বর্ণনায় তিনি বলেন, ওই ২৩ দিনে এমন কোনো নির্যাতন বাকি ছিল না যা তার ওপর প্রয়োগ করা হয়নি, প্রতিদিনই মনে হতো এই বুঝি শেষ দিন। উলঙ্গ করে ঝুলিয়ে পেটানো এবং পরিবারের নারী সদস্যদের নিয়ে অশ্লীল ভাষায় হুমকি দেয়া, এই দুই ধরনের নির্যাতনকে সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক বলে উল্লেখ করেন তিনি।

গুমের শিকার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসিনুর রহমান নতুন আইন বাতিলের দাবি জানিয়ে বলেন, বিদ্যমান আইনে গুমের শিকার ব্যক্তি নিজের অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারলে তার পাঁচ বছরের দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে, অথচ গুম এমনভাবেই করা হয় যাতে কোনো আলামত না থাকে। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি কটাক্ষ করে বলেন, এই বিষয়টি বোঝানো কঠিন। নিজে দুইবার গুমের শিকার হওয়া এই কর্মকর্তা প্রশ্ন তোলেন, দ্বিতীয়বার গুম করার সঙ্গে জড়িতদের এখনো চিহ্নিত বা গ্রেপ্তার করা যায়নি কেন এবং কেন তিনি নিজেই জানতে পারছেন না প্রকৃতপক্ষে কোন সংস্থা তাকে গুম করেছিল।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি ও নোয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন সংশোধনের দাবি জানান। আইনি লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা থেকে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের গুমের ঘটনা তুলে ধরে তিনি বলেন, কে গুম করেছে তা পুলিশ বা ডিবি কখনোই ইনকোয়ারিতে প্রমাণ করতে পারেনি, তাহলে সাধারণ নাগরিক তা কীভাবে প্রমাণ করবে। বিদ্যমান আইনের শাস্তির বিধানকে যৌক্তিক নয় বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, আইনটি অপব্যবহারের ঝুঁকিতে রয়েছে এবং তা আরও পরিমার্জিত ও সর্বজনীন করা প্রয়োজন।

ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান বলেন, আগের সরকার গুম কমিশন ও একটি শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন গঠন করে গিয়েছিল, যেগুলোকে আরও বেশি অর্থায়ন ও স্বাধীনতা দিয়ে শক্তিশালী করার কথা ছিল। কিন্তু নতুন আইন দিয়ে বরং এই দুই প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। নিজেও গুমের শিকার এই সংসদ সদস্য বলেন, ভবিষ্যতের দিকে তাকালে তিনি একটাই আশঙ্কা দেখেন, আগামী প্রজন্মকেও হয়তো মতপ্রকাশের সময় গুমের ভয়ে থাকতে হবে।

এই সব বক্তব্য ও পরিসংখ্যান মিলিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট, গুম কেবল অতীতের কোনো অধ্যায় নয়। যতক্ষণ না প্রতিটি নিখোঁজ মানুষের সন্ধান মেলে, প্রতিটি অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত হয় এবং দায়ীদের বিচার নিশ্চিত হয়, ততক্ষণ আমেনা আক্তার মিষ্টি কিংবা মুক্তা খাতুনদের মতো হাজারো পরিবারের অপেক্ষা শেষ হবে না। নতুন প্রণীত আইন কতটা কার্যকর হবে, নাকি তা শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে, আগামী দিনগুলোতে সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

★★★★★

সুরমা টাইমস পড়ে ভালো লাগলো?
আপনার মতামত জানান!

গুগলে রেটিং দিন রিভিউ লিখুন ⭐
Share This Article