ডেমরায় জঙ্গি ‘ওস্তাদ’ গ্রেপ্তার, হেফাজত থেকে দুটি হাতবোমা উদ্ধার

ডেমরায় জঙ্গি ‘ওস্তাদ’ গ্রেপ্তার, হেফাজত থেকে দুটি হাতবোমা উদ্ধার - Surma Times | Sylhet News

ডেমরায় জঙ্গি ‘ওস্তাদ’ গ্রেপ্তার, হেফাজত থেকে দুটি হাতবোমা উদ্ধার - Surma Times | Sylhet Newsঢাকা, ১৬ আগস্ট: ঢাকার ডেমরার সারুলিয়া থেকে উদ্ধার করা বোমা সদৃশ দুটি বস্তু আসলে হাতবোমা বলেই নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় নরসিংদীর জেল থেকে পালিয়ে যাওয়া ‘জঙ্গি’ জুয়েল ভুঁইয়া ওরফে ‘ওস্তাদের’ কাছ থেকে এই বোমা দুটি উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, জুয়েল নব্য জেএমবির আলোচিত বোমার কারিগর নাজমুল হাসান মামুন ওরফে বোমারু মামুনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী।

পুলিশ জানায়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই নরসিংদী কারাগারে দাঙ্গার পর যে নয়জন জঙ্গি পালিয়ে যান, তাদের মধ্যে ছিলেন জুয়েল ভুঁইয়া। ছয় দিন পর ২৫ জুলাই তিনি ফের নরসিংদী জেলা পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। এরপর ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেপ্টেম্বরের দিকে জামিনে বেরিয়ে আসেন তিনি।

সবশেষ রোববার (১৬ আগস্ট) বিকেলে বিভিন্ন স্থান থেকে বোমা উদ্ধার এবং পুলিশের ওপর জঙ্গি হামলার তদন্তের সূত্র ধরে ডেমরার সারুলিয়া এলাকার পশ্চিম নিঝুমবাগ থেকে গ্রেপ্তার করা হয় জুয়েলকে। এসময় তার হেফাজত থেকে দুটি বোমা উদ্ধারের তথ্য দিয়েছে পুলিশ। জঙ্গি নেটওয়ার্কে জুয়েলের কোডনেম ‘ওস্তাদ’। তার বাড়ি নরসিংদীর শিবপুরের কাজীরচরে।

এ প্রসঙ্গে ডিএমপির ডেমরা জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার মোহসিন মাসুদ জানান, বোমারু মামুনের সহযোগী হিসেবে সন্দেহভাজন জুয়েল ওই এলাকায় অবস্থান করছেন, এমন তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ ও অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) যৌথভাবে এই অভিযান চালায়। তিনি জানান, অভিযানে দুটি হাতে তৈরি বোমা উদ্ধার করা হয়েছে এবং এই ঘটনায় একজনকে আটক করা হয়েছে।

জুয়েল যে বাড়িতে অবস্থান করছিলেন, পরে সেটি ঘিরে তল্লাশি চালায় পুলিশ। বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিতে তল্লাশি শেষে উদ্ধার করা বোমা দুটি নিষ্ক্রিয় করে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের বোম্ব ডিসপোজাল টিম।

সিটিটিসির একজন কর্মকর্তা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন হিযবুত তাহরীরের সদস্য সন্দেহে ২০২৩ সালে জুয়েল ভুঁইয়াকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট এটিইউ। এরপর ২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্যে ১৯ জুলাই কারাগার থেকে আরও কয়েকশ বন্দির সঙ্গে পালিয়ে যান তিনি। পরে ২৫ জুলাই জেলা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারের পর তাকে পাঠানো হয় কাশিমপুর কারাগারে। ওই কারাগারেই বোমারু মামুনের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে তার। এক মাস পরে সরকার পতনের পর সেপ্টেম্বরে বোমারু মামুনদের সঙ্গেই জামিনে বেরিয়ে আসেন জুয়েল।

উল্লেখ্য, কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সহিংসতার মধ্যে ১৯ জুলাই বিকেলে নরসিংদী কারাগারে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। আন্দোলনকারীরা কারাগারের ভেতরে ঢুকে সেলের তালা ভেঙে ফেলেন, যার ফলে নয় জঙ্গিসহ ৮২৬ কয়েদি পালিয়ে যান। এসময় কারাগারের অস্ত্রাগার ও কারারক্ষীদের কাছ থেকে ৮৫টি অস্ত্র ও আট হাজার ১৫০টি গুলি লুট হয়।

পুলিশের ভাষ্যমতে, গত জুলাইয়ে সনাতনধর্মীদের ‘উল্টো রথযাত্রা’র পথে মতিঝিল মেট্রো স্টেশনের নিচে ছাতার ভেতর পাইপ বোমা ফেলে রাখা এবং আশুলিয়ার চারাবাগে চায়ের দোকানে প্রেশার কুকার বোমা ফেলে রাখার ঘটনার পর মামুন ও আরিফদের ধরতে তৎপর হয় পুলিশ। এই ধারাবাহিকতায় আরিফ ধরা পড়লেও মামুন এখনো পলাতক। নব্য জেএমবির মূল বোমার কারিগর হিসেবে তাকে চিহ্নিত করছে পুলিশ।

গত মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সন্ধ্যায় সাভারের শ্যামপুরে বোমারু মামুনের অন্যতম সহযোগী আরিফকে গ্রেপ্তারের পর দক্ষিণ শ্যামপুরে তার আস্তানায় অভিযান চালায় পুলিশ। সন্ধ্যা থেকে বাড়িটি ঘিরে রেখে রাত পৌনে দুইটা পর্যন্ত চলে এই অভিযান, যেখান থেকে উদ্ধার হয় প্রচুর পাইপ বোমা এবং বোমা তৈরির রাসায়নিক ও অন্যান্য সরঞ্জাম। এর পরদিনই সাভারের ভারের গোপেরবাড়ি লালটেক ঘোড়া মসজিদের সামনে একটি মাঠে পড়ে থাকা আরেকটি প্রেশার কুকার বোমা পাওয়ার কথা জানায় পুলিশ।

পুলিশ আরও জানায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকার কেরানীগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণ, এরপর ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে তল্লাশির সময় পুলিশকে ছুরিকাঘাত করে বোমার ব্যাগ ফেলে পালানো, মার্চে কুমিল্লার শিব মন্দিরে বিস্ফোরণ এবং একই মাসে রাজধানীর সায়েদাবাদে পুলিশের তল্লাশির সময় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায়ও মামুন ও তার শিষ্য আরিফ ওরফে ইমরানের সংশ্লিষ্টতা মিলেছে। এই চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তারের ধারাবাহিক অভিযানেরই অংশ হিসেবে রোববার ডেমরা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় জুয়েল ওরফে ওস্তাদকে।

উল্লেখ্য, হোটেল ওলিও মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলেন মামুন। তবে চলতি বছর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ঢাকার একটি আদালত মামুনসহ ওই মামলার ১১ আসামিকেই খালাস দেয়। রায়ের পর্যালোচনায় বিচারক লিখেছেন, আসামিরা সবাই বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারবিরোধী নেতাকর্মী।

গ্রেপ্তার জুয়েলের বিরুদ্ধে কয়টি মামলা রয়েছে, সে বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

জঙ্গি নেটওয়ার্কের সদস্যদের ধরতে পুলিশের এই ধারাবাহিক অভিযান স্পষ্ট করে দেয়, নব্য জেএমবির বোমা তৈরি ও বিস্ফোরণের চক্রটি এখনো সক্রিয় এবং এর মূল হোতা বোমারু মামুন এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাকে গ্রেপ্তার করা গেলেই এই নেটওয়ার্কের পূর্ণাঙ্গ চিত্র উন্মোচিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

★★★★★

সুরমা টাইমস পড়ে ভালো লাগলো?
আপনার মতামত জানান!

গুগলে রেটিং দিন রিভিউ লিখুন ⭐
Share This Article