সরকারি গোপাট উদ্ধার না করে কবরস্থানের ওপর রাস্তা, দক্ষিণ সুরমায় মানববন্ধন

সরকারি গোপাট উদ্ধার না করে কবরস্থানের ওপর রাস্তা, দক্ষিণ সুরমায় মানববন্ধন - Surma Times | Sylhet News

সুরমায় কবরস্থান-জমি বাঁচাতে এলাকাবাসীর মানববন্ধন - Surma Times | Sylhet Newsসিলেট, ৩১ জুলাই: দক্ষিণ সুরমা উপজেলার লালাবাজার ইউনিয়নের খোজখালু-শাহসিকন্দর মৌজায় রেকর্ডভুক্ত সরকারি গোপাট রাস্তা দখলমুক্ত না করে মুসলিম জনসাধারণের কবরস্থান এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রবাসীদের জমির ওপর দিয়ে রাস্তা নির্মাণের প্রতিবাদে মানববন্ধন হয়েছে। শুক্রবার (৩১ জুলাই) শাহসিকন্দর এলাকাবাসীর উদ্যোগে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, প্রবাসীরা এ দেশের রেমিট্যান্স যোদ্ধা এবং তাদের সম্পদ রক্ষা করা নৈতিক দায়িত্ব। তাদের অভিযোগ, সরকারি রেকর্ডভুক্ত জায়গা দখলমুক্ত না করে প্রবাসীদের ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি এবং মুসলিম জনসাধারণের কবরস্থানের ওপর দিয়ে রাস্তা নির্মাণ মোটেও কাম্য নয়।

বক্তারা আরও বলেন, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে খোজখালু গ্রামের বাসিন্দা মবশ্বির আহমদ তৎকালীন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের সহযোগিতায় ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি এবং কবরস্থানের ওপর দিয়ে সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেন। তাদের দাবি, প্রথমে তিনি সরকারি রেকর্ডভুক্ত গোপাট বা রাস্তার একটি অংশ সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করে দখল করেন এবং পরে কবরস্থান ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির ওপর দিয়ে রাস্তা নির্মাণের জন্য স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রায় ৮২ লাখ টাকার সড়ক প্রকল্পের অনুমোদন করিয়ে নেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, খোজখালু-শাহসিকন্দর মৌজায় ১৪ শতক কবরস্থান এবং ২৬ শতক সরকারি গোপাট বা রাস্তা রেকর্ডভুক্ত রয়েছে। বহু বছর ধরে এই গোপাটটি গ্রামের সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। কিন্তু পরে মবশ্বির আহমদ ও তার সহযোগীরা ওই সরকারি গোপাটের বড় একটি অংশে সীমানা প্রাচীর তুলে দখল নেয়, ফলে দীর্ঘদিনের চলাচলের সরকারি পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। তাদের অভিযোগ, সরকারি রেকর্ডে থাকা এই রাস্তা দখলমুক্ত করে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার বদলে পাশের কবরস্থান ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির ওপর দিয়ে বিকল্প সড়ক নির্মাণের চেষ্টা চলছে।

শাহসিকন্দর গ্রামের বাসিন্দারা বলেন, পরিকল্পিতভাবে সরকারি রাস্তা দখল করে সেটি অকার্যকর করার পর নতুন সড়কের নকশা এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে তা কবরস্থান অতিক্রম করে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির ওপর দিয়ে যায়। এতে কবরস্থান ছাড়াও কয়েকটি পরিবারের বসতভিটার সীমানা, পুকুরপাড়, কৃষিজমি এবং যুক্তরাজ্যপ্রবাসী একাধিক জমির মালিকের সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এলাকাবাসীর পক্ষে আরিফুল হক চৌধুরী জানান, বিষয়টি প্রথম থেকেই স্থানীয়ভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হয়। কোনো সমাধান না হওয়ায় ২০২৪ সালের ১১ জুন দক্ষিণ সুরমা উপজেলা চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত আবেদন করা হয়। পরে উপজেলা চেয়ারম্যানের নির্দেশে উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার সরেজমিনে গিয়ে ভূমি জরিপ করেন এবং উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী রাস্তা, কবরস্থান ও পার্শ্ববর্তী জমির অবস্থান চিহ্নিত করেন। সরকারি সার্ভেয়াররা রেকর্ডভুক্ত রাস্তার অবস্থান স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করেন এবং অবৈধভাবে নির্মিত দেয়াল অপসারণের পরামর্শ দেন। তবে এরপরও সরকারি রাস্তা দখলমুক্ত হয়নি।

পরে ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ সুরমা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছেও আরেকটি আবেদন করা হয়। প্রশাসনিক পর্যায়ে একাধিকবার আবেদন, জরিপ ও আলোচনার পরও কার্যকর সমাধান না পাওয়ায় তারা ২০২৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গোলাপগঞ্জ ক্যাম্পের অধিনায়কের কাছেও লিখিত আবেদন করেন।

মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা অভিযোগ করে বলেন, সরকারি দখলকৃত ভূমি ফিরিয়ে না দিয়ে মবশ্বির আহমদ দ্রুত কবরস্থান ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির ওপর দিয়ে রাস্তা নেওয়ার নতুন ফন্দি আঁটেন। এ নিয়ে ২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর দক্ষিণ সুরমা থানার ওসির কাছে “সরকারি গেজেটভুক্ত রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা উচ্ছেদ করে সড়ক নির্মাণ চালুকরণ” শীর্ষক লিখিত অভিযোগও দায়ের করা হয়। অভিযোগপত্রে প্রাণকৃষ্ণ দে কিন্ডারগার্টেন, হযরত আয়শা সিদ্দিকা উচ্চ বিদ্যালয়, শাহ সিকান্দার তালিমুল কোরআন মাদ্রাসা, বিবিদইল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং আবু দৌলত ক্যাডেট মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের নাম ও স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।

তবে পরবর্তীতে অভিযোগপত্রে ব্যবহৃত শিক্ষার্থীদের স্বাক্ষর ও সমর্থনের সত্যতা পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে প্রাণকৃষ্ণ দে কিন্ডারগার্টেন ও হযরত আয়শা সিদ্দিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রত্যয়নপত্রেও বলা হয়, ওই অভিযোগের সঙ্গে তাদের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

বিরোধটি পরে আদালত পর্যন্ত গড়ায়। সিলেটের জেলা জজ আদালতে মামলা দায়ের হলে আদালত প্রবাসী জমির মালিক ও আরিফুল হক চৌধুরীর পরিবারের পক্ষে রায় দেন। পরে বিরোধী পক্ষ উচ্চ আদালতে আপিল করলে হাইকোর্টে তারা অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ লাভ করেন। পরবর্তীতে বিষয়টি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে গেলে মামলাটি বর্তমানে স্থিতাবস্থা অবস্থায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

মানববন্ধনে শাহ সিকান্দার গ্রামের শতাধিক মানুষ উপস্থিত ছিলেন। তারা সরকারি রেকর্ডভুক্ত গোপাট উদ্ধারের পাশাপাশি কবরস্থান ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি রক্ষার দাবি জানান।

★★★★★

সুরমা টাইমস পড়ে ভালো লাগলো?
আপনার মতামত জানান!

গুগলে রেটিং দিন রিভিউ লিখুন ⭐
Share This Article