সিলেট, ২৯ জুলাই: সিলেট নগরীর জিন্দাবাজারে অবস্থিত বাংলাদেশ ওভারসিজ সেন্টার ভবন ভাঙা এবং লিজগ্রহীতা ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদে সাবেক জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের দেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা (ইনজাংশন) আরও ছয় মাস বাড়ানো হয়েছে। গত ২০ জুলাই ২০২৬ তারিখে হাইকোর্ট আবেদনকারীদের পক্ষে পূর্বের আদেশ বহাল রেখে নতুন করে আরও ছয় মাসের ইনজাংশন প্রদান করেন, যা ১৯ জানুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
মামলার পটভূমি
২৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিচারপতি রাজিক-আল-জলিল ও বিচারপতি মো. আনোয়ারুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ জেলা প্রশাসনের ভবন ভাঙা ও ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদের সিদ্ধান্তের ওপর অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দেন। আদালত নির্দেশ দেন, যথাযথ বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদন ছাড়া ভবনের প্রকৃত অবস্থা কারিগরিভাবে মূল্যায়ন না করে কোনো ধরনের উচ্ছেদ বা ভাঙার কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে না এবং আবেদনকারী ব্যবসায়ীদের দখল ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করা যাবে না।
এর আগে ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে আদালত রুল জারি করে জেলা প্রশাসককে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেন এবং জানতে চান, বিশেষজ্ঞ মতামত ছাড়া ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। এর পটভূমিতে ছিল ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখের একটি সিদ্ধান্ত, যেখানে সাবেক জেলা প্রশাসন ভবনটিকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ঘোষণা করে লিজ বাতিল এবং ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর মধ্যে দোকান খালি করার নির্দেশ দিয়েছিল।
তবে লিজগ্রহীতা ব্যবসায়ীদের দাবি, ২০১৯ সালে সিলেট সিটি করপোরেশনের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকায় বাংলাদেশ ওভারসিজ সেন্টারের নাম ছিল না।
লিজ ও ভাড়া সংক্রান্ত ইতিহাস
১৯৭৮ সালে প্রবাসীদের বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত এবং ১৯৮২ সালে চালু হওয়া এই মার্কেটে ব্যবসায়ীরা গত প্রায় ৪৪ বছর ধরে নিয়মিত ভাড়া ও জমিদারি খাজনা পরিশোধ করে আসছেন। ২০১০ সালে ট্রাস্টের ১০৯তম সভায় ব্যবসায়ীদের স্থায়ী লিজ প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হলেও আজ পর্যন্ত কোনো লিখিত স্থায়ী লিজ ডিড প্রদান করা হয়নি, যদিও পরবর্তী সময়ে নিয়মিত ভাড়া গ্রহণ ও রশিদ প্রদান অব্যাহত ছিল বলে ব্যবসায়ীদের দাবি।
ব্যবসায়ী সমিতির প্রতিক্রিয়া
হাইকোর্টের সর্বশেষ আদেশকে স্বাগত জানিয়েছেন জিন্দাবাজার ওভারসিজ সেন্টার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহিদুল ইসলাম মাহিদ। তিনি বলেন, “মহামান্য হাইকোর্ট পুনরায় আমাদের পক্ষে আরও ৬ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন ইনজাংশন প্রদান করেছেন, যা ১৯ জানুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। আদালতের এই আদেশে আমরা অত্যন্ত সন্তুষ্ট এবং আদালতের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করছি। আমাদের উপস্থাপিত নথিপত্র, তথ্য-প্রমাণ ও আইনগত অবস্থান যথাযথ হওয়ায় আদালত দ্বিতীয়বারের মতো আমাদের আইনগত সুরক্ষা প্রদান করেছেন। শুরু থেকেই আমরা আইন মেনে চলেছি, আদালতের প্রতি আস্থা রেখেছি এবং এখনো সেই আস্থাই বজায় রেখেছি। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতেও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং ব্যবসায়ীদের বৈধ অধিকার সংরক্ষিত থাকবে।”
মাহিদুল ইসলাম আরও অভিযোগ করেন, সাবেক জেলা প্রশাসক মো. সরওয়ার আলম ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের অবগত না করে, কোনো সভা বা আলোচনা ছাড়াই এককভাবে তড়িঘড়ি করে ভবনটি ভেঙে ফেলার উদ্যোগ নেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এর ফলে ব্যবসায়ীরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যান এবং কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন, দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা কখনো উন্নয়নের বিরোধিতা করিনি; বরং আধুনিক, নিরাপদ ও পরিকল্পিত ভবন নির্মাণের পক্ষেই ছিলাম। তবে ব্যবসায়ীদের বৈধ অধিকার, লিখিত চুক্তি, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত না করে কোনো উচ্ছেদ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ২০০২ সালে লিজের মেয়াদ শেষ হলেও প্রশাসন পরবর্তী প্রায় দুই যুগ ধরে নিয়মিত ভাড়া গ্রহণ করেছে। তার দাবি অনুযায়ী, ২০১০ সালে স্থায়ী লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করেই ২০২৫ সালে হঠাৎ ভাড়া ৮ টাকা থেকে ১০০ থেকে ১৫০ টাকায় বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং বিষয়টি নিষ্পত্তির আগেই ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। তিনি অভিযোগ করেন, রুল জারি ও আদালতের আদেশ কার্যকর থাকা অবস্থাতেও ব্যবসায়ীদের ওপর দোকান খালি করার জন্য বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি
ব্যবসায়ীদের দাবি, ২০১০ সালের ট্রাস্টের ১০৯তম সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে তাদের স্থায়ী লিজ বা মালিকানা প্রদান করতে হবে। পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে লিখিত চুক্তি, যথাযথ পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ এবং পর্যাপ্ত সময় নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, উন্নয়ন হোক, তবে তা অবশ্যই আইন, ন্যায়বিচার এবং তাদের বৈধ অধিকার সংরক্ষণ করে হতে হবে।
দীর্ঘদিনের এই বিরোধ নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক লিজধারীদের অধিকারের মধ্যে ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে। মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসন ও ব্যবসায়ী উভয় পক্ষকেই আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকতে হবে।






