সিলেট, ২৪ জুলাই: সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের উল্টো রথযাত্রা উপলক্ষে সিলেটে বর্ণাঢ্য কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। শুক্রবার (২৪ জুলাই) আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) সিলেটের উদ্যোগে হরিনাম সংকীর্তন, আলোচনা সভা, ধর্মীয় সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, মহাপ্রসাদ বিতরণ এবং বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়।
আলোচনা সভা ও বক্তব্য
বিকেল ৩টায় ইসকন সিলেট মন্দিরে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভা ভগবদ্গীতার শ্লোকপাঠের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। ইসকন পরিচালিত ভক্তিবেদান্ত ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা অধ্যক্ষ পদ্মলোচন শ্যাম দাসের নেতৃত্বে গীতাপাঠ পরিবেশন করেন। দেবামৃত নিতাই দাসের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইসকন বাংলাদেশের সহ-সভাপতি ও ইসকন সিলেট মন্দিরের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ ভক্তি অদ্বৈত নবদ্বীপ স্বামী মহারাজ। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যুগের পর যুগ সব ধর্মের মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের মধ্য দিয়ে একসঙ্গে বসবাস করে আসছে। এই সম্প্রীতির বন্ধন অটুট থাকলে কোনো অপশক্তিই আমাদের বিভক্ত করতে পারবে না।” তিনি আরও বলেন, “রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি আমাদের বহুত্ববাদী সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীক। দেশের উন্নয়নে সব ধর্মের মানুষের সমান অংশীদারিত্ব রয়েছে। আপনাদের ধর্মীয় চর্চা ও মন্দিরের উন্নয়নে যখনই প্রয়োজন হবে, সরকার সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।”
প্রধান বক্তা সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, “এই নগরীতে সব ধর্মের মানুষ স্বাধীনভাবে ও শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করবে। সব ধর্মীয় অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে প্রশাসনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। আগামী দিনগুলোতেও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অটুট থাকবে।”
সভাপতির বক্তব্যে শ্রীমৎ ভক্তি অদ্বৈত নবদ্বীপ স্বামী মহারাজ বলেন, “সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের চর্চা অত্যন্ত প্রয়োজন। আমরা সকলের কল্যাণ, বিশ্বশান্তি ও মানবতার মঙ্গল কামনা করি।”
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি সুদীপ রঞ্জন সেন বাপ্পু, সাবেক ট্রাস্টি নীহার রঞ্জন দাস, মহানগর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আবদুল কাইয়ুম জালালী পংকী, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. নুরের জামান চৌধুরী, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. এনামুল হক এবং ইসকন সিলেট বিভাগীয় কমিটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও সমাজসেবা বিভাগের সম্পাদক বুদ্ধি গৌর দাস অধিকারী। স্বাগত বক্তব্য দেন ইসকন সিলেট মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক ভাগবত করুনা দাস ব্রহ্মচারী। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ইসকন সিলেট গৃহস্থ কাউন্সিল বিভাগের সভাপতি সুমঙ্গল গৌর দাস।
শোভাযাত্রার বিবরণ
আলোচনা সভা শেষে বিকেল ৪টায় শ্রীশ্রী জগন্নাথ, বলদেব ও সুভদ্রা মহারানীকে বহনকারী তিনটি সুসজ্জিত রথ নিয়ে উল্টো রথযাত্রার শোভাযাত্রা বের হয়। শোভাযাত্রাটি রিকাবীবাজার, চৌহাট্টা, জিন্দাবাজার, কোর্ট পয়েন্ট, তালতলা, মির্জাজাঙ্গাল ও লামাবাজার প্রদক্ষিণ করে পুনরায় ইসকন সিলেট মন্দিরে এসে শেষ হয়। মৃদঙ্গ, করতাল, ঘণ্টা, উলুধ্বনি ও হরিধ্বনিতে মুখরিত এই শোভাযাত্রায় হাজার হাজার নারী-পুরুষ, শিশু, তরুণ ও প্রবীণ অংশ নেন।
শোভাযাত্রা শেষে মন্দির প্রাঙ্গণে ভক্তিমূলক সংগীত, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও মহাপ্রসাদ বিতরণ করা হয়, যেখানে বিপুলসংখ্যক ভক্ত, সুধীজন ও বিভিন্ন ধর্মের মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
তাৎপর্য
সরকারি ও প্রশাসনিক পর্যায়ের ব্যাপক উপস্থিতি এবং বিভিন্ন ধর্ম ও রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ এই আয়োজনকে কেবল একটি ধর্মীয় উৎসবের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীকী প্রকাশ হিসেবে তুলে ধরেছে। হাজারো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ সিলেটে ধর্মীয় সহাবস্থানের একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।






