সুরমা টাইমস ডেস্কঃ সিলেটের হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দান ব্যবস্থাপনা ঘিরে সাম্প্রতিক প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং সাবেক জেলা প্রশাসক সারোয়ার আলমের গণমাধ্যমে দেয়া বক্তব্য নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। জেলা প্রশাসনের দানবাক্স সিলগালা ও অর্থ গণনার উদ্যোগকে কেন্দ্র করে একদিকে অনিয়মের অভিযোগ উঠছে, অন্যদিকে এই হস্তক্ষেপের বৈধতা ও উদ্দেশ্য নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
সাবেক জেলা প্রশাসক সারোয়ার আলম প্রকাশ্যে দাবি করেছেন, মাজারকেন্দ্রিক একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে দানের অর্থের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে সরিয়ে নিচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দানবাক্সে জমা হওয়া অর্থ প্রকৃত আয়ের তুলনায় কম, এবং সরাসরি নগদ গ্রহণের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে সাবেক জেলা প্রশাসক সারোয়ার আলম বলেন, প্রথমবার ২২ জুন দানের অর্থ গণনার সময় প্রকৃত সংগ্রহের মাত্র ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পাওয়া গেছে বলে তার ধারণা। বাকি অর্থ নগদভাবে সংগ্রহ করে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি আরও বলেন, ১১ জুলাইয়ের গণনায়ও প্রকৃত দানের মাত্র ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পাওয়া গেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মাজারের কবরস্থানের পাশের ঝরনা এলাকাকে কেন্দ্র করে অধিকাংশ অর্থ সংগ্রহ করা হয় এবং সেখানে ভক্তদের কাছ থেকে সরাসরি টাকা নেওয়া হয়।
সারোয়ার আলমের দাবি, অর্থ সংগ্রহকারীরা অনেক ক্ষেত্রে ভক্তদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা যদি মাজারকে দিতে চান তাহলে আমাদের কাছে দেন, আর যদি সরকারকে দিতে চান তাহলে এই বক্সের মধ্যে ফেলেন।’ তার মতে, এ ধরনের প্রচারণার কারণেই দানবাক্স ও ডেকে প্রত্যাশিত পরিমাণ অর্থ জমা পড়েনি। তবে অভিযোগের পক্ষে কোনো নথি, আর্থিক হিসাব, তদন্ত প্রতিবেদন বা অন্য কোনো প্রমাণ তিনি প্রকাশ্যে উপস্থাপন করেননি।
তবে প্রশাসনের এই অবস্থানের বিপরীতে একাধিক সাংবাদিক ও আইনসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, জেলা প্রশাসনের সরাসরি কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দান তদারকি বা নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার এখতিয়ার নেই। তাদের মতে, প্রশাসন প্রয়োজনে কর বা আর্থিক স্বচ্ছতা সংক্রান্ত বিষয় দেখতে পারে, কিন্তু দানবাক্স সিলগালা বা সরাসরি অর্থ ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
মাজার কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে, মাজারের পরিচালনা ও দান ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত বিষয়ে উচ্চ আদালতের একাধিক আদেশ রয়েছে। এদিকে, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে কয়েকজন আইনজীবী ও আইনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় সরকারি হস্তক্ষেপের প্রশ্নে ‘আল্ট্রা ভাইরেস’ বা ক্ষমতার সীমা অতিক্রমের বিষয়টি সামনে এনেছেন। তবে সংশ্লিষ্ট আদালতের আদেশগুলোর অনুলিপি পর্যালোচনা করা সম্ভব হয়নি। ফলে এসব আদেশের নির্দিষ্ট বিধান এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে সেগুলোর প্রয়োগযোগ্যতা সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো আইনি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ। অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের একটি অংশের দাবি, মাজারের বিপুল আর্থিক প্রবাহ দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের আগ্রহের কেন্দ্র। তাদের ভাষ্যমতে, সাম্প্রতিক প্রশাসনিক উদ্যোগের পেছনে আর্থিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা এবং রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত থাকতে পারে। যদিও এই অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
এদিকে, সাবেক ডিসি সারোয়ার আলমকে নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। সরকারি একটি মামলায় অতীতে অনিয়মের অভিযোগে তাকে জরিমানা করা হয়েছিল বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও অন্যান্য দুর্নীতির অভিযোগও বিভিন্ন মহলে আলোচিত। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার কোনো সাম্প্রতিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি এবং স্বাধীনভাবে সব অভিযোগ যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পুরো বিতর্কে মাজার কর্তৃপক্ষ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিস্তারিত বক্তব্য দেয়নি। তাদের অবস্থান স্পষ্ট না হওয়ায় একতরফা অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের মধ্যে প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকদের মতে, বিষয়টি এখন শুধু দান ব্যবস্থাপনার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি প্রশাসনিক ক্ষমতার সীমা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাব-এই তিনটি স্তরের একটি সংবেদনশীল ইস্যুতে রূপ নিয়েছে।
এ অবস্থায় নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে। একই সঙ্গে সব পক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এবং প্রামাণ্য তথ্য প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এই বিতর্ক আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।






