কুয়ালালামপুর, ৮ জুলাই: নতুন ই-পাসপোর্ট ব্যবস্থায় তথ্যগত অসঙ্গতির কারণে মালয়েশিয়ায় বসবাসরত শত শত বাংলাদেশি প্রবাসী দীর্ঘ ভোগান্তিতে পড়েছেন। কারও অপেক্ষা তিন মাস, কারও ছয় মাস, আবার কারও ক্ষেত্রে তারও বেশি সময় লেগে যাচ্ছে একটি পাসপোর্ট হাতে পেতে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুরোনো মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন এবং কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারের তথ্যের মধ্যে সামান্য অমিল থাকলেই আবেদন আটকে যাচ্ছে। এসব আবেদন বাংলাদেশে আগারগাঁওয়ের পাসপোর্ট অধিদপ্তরে পুনঃযাচাইয়ের জন্য পাঠানো হচ্ছে। ফলে অনেকের পাসপোর্ট মাসের পর মাস ঝুলে থাকছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, পাসপোর্ট হাতে না পাওয়ায় অনেক প্রবাসীর ওয়ার্ক পারমিট ও ভিসা নবায়ন আটকে যাচ্ছে। এতে তারা কোনো দোষ না করেও অনিয়মিত অভিবাসীতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছেন।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে বাংলাদেশ সরকার ধাপে ধাপে এমআরপি কার্যক্রম বন্ধ করে ই-পাসপোর্ট চালু করে। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনে প্রতি মাসে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ হাজার প্রবাসী ই-পাসপোর্টের আবেদন করছেন। যাদের জাতীয় পরিচয়পত্র নেই, তাদের জন্মনিবন্ধনের ভিত্তিতে আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে।
তবে হাইকমিশন সূত্রে জানা গেছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আবেদন তথ্যগত অসঙ্গতির কারণে আটকে যাচ্ছে। অনেক আবেদন আবার ‘মাল্টিপল অ্যাকটিভ’ হিসেবে শনাক্ত হওয়ায় অতিরিক্ত যাচাইয়ের প্রয়োজন হচ্ছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, আবেদনকারীদের বয়স, নামের বানান, পিতা-মাতার নাম, জন্মতারিখ কিংবা স্থায়ী ঠিকানায় সামান্য অমিল থাকলেই আবেদন স্থগিত হয়ে যাচ্ছে। অতীতে এমআরপি পাসপোর্ট তৈরির সময় যেসব ভুল অজান্তে থেকে গিয়েছিল, এখন সেগুলোই বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে আবেদনকারীরা নিজেরাই আগের ভুল সংশোধন করে নতুন তথ্য দিয়েছেন। কিন্তু নতুন তথ্যের সঙ্গে পুরোনো পাসপোর্টের তথ্য না মেলায় আবেদন পুনঃযাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশে পাঠাতে হচ্ছে। হাইকমিশনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এসব আবেদনের নিষ্পত্তি অনেক সময় তিন থেকে ছয় মাস, কখনও তারও বেশি সময় নিচ্ছে।
কুয়ালালামপুরের একটি উৎপাদন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক বাংলাদেশি শ্রমিক বলেন, “চার মাস আগে আবেদন করেছি। হাইকমিশনে গেলে বলে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশে যোগাযোগ করলে বলে প্রক্রিয়াধীন। মাঝখানে পড়ে আমরা অসহায় হয়ে গেছি।” তার ভাষায়, পাসপোর্ট না থাকায় ওয়ার্ক পারমিট নবায়ন করতে পারছেন না, ফলে নিয়োগকর্তাও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারছেন না।
সেলাঙ্গরের এক প্রবাসী বলেন, “আগের পাসপোর্টে বাবার নামের বানানে ভুল ছিল। এবার জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী ঠিক করেছি। এখন সেই পুরোনো ভুলের কারণেই পাঁচ মাস ধরে নতুন পাসপোর্ট আটকে আছে।”
জোহর বাহরুতে কর্মরত এক নির্মাণশ্রমিক জানান, মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়েও দেশে যেতে পারেননি। টিকিট কেটেও শেষ পর্যন্ত যাওয়া হয়নি, কারণ নতুন পাসপোর্ট পাননি।
অন্যদিকে, সেরেম্বানে কর্মরত এক প্রবাসী জানান, তার সব তথ্য সঠিক থাকায় মাত্র ২৫ দিনের মধ্যেই তিনি নতুন পাসপোর্ট পেয়েছেন।
বাংলাদেশ হাইকমিশনের কনস্যুলার শাখার দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, তথ্যগত অসঙ্গতি পাওয়া গেলে আবেদন প্রয়োজনীয় যাচাই শেষে দ্রুত আগারগাঁওয়ের পাসপোর্ট অধিদপ্তরে পাঠানো হয়। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং তথ্য সংশোধনের কাজ বাংলাদেশ থেকেই সম্পন্ন হয়। ফলে কিছু ক্ষেত্রে সময় বেশি লাগছে। তিনি বলেন, আবেদন করার আগে জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন এবং আগের পাসপোর্টের তথ্য মিলিয়ে নিলে অনেক জটিলতা এড়ানো সম্ভব। মালয়েশিয়ায় বৈধভাবে কাজ করতে হলে পাসপোর্ট, ভিসা এবং ওয়ার্ক পারমিট তিনটিই বৈধ থাকতে হয়।
প্রবাসীরা জানান, নতুন পাসপোর্ট না পাওয়ায় অনেক নিয়োগকর্তা ওয়ার্ক পারমিট নবায়নের আবেদন করতে পারছেন না। এতে কর্মীরা অনিচ্ছাকৃতভাবে আইনি জটিলতায় পড়ছেন। দীর্ঘসূত্রতার কারণে চাকরি হারানোর ঝুঁকিও বাড়ছে।
মালয়েশিয়ার বাংলাদেশি কমিউনিটির নেতাদের মতে, ই-পাসপোর্ট ব্যবস্থা নিরাপদ ও আধুনিক হলেও বিদেশে থাকা আবেদনকারীদের জন্য আলাদা দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা না থাকলে সংকট আরও বাড়বে। তাদের দাবি, বিদেশে অবস্থানরত আবেদনকারীদের জন্য বিশেষ ফাস্ট-ট্র্যাক ভেরিফিকেশন সেল গঠন করা প্রয়োজন।
আরেকজন প্রবাসী সংগঠক বলেন, বাংলাদেশের প্রশাসনিক বিলম্বের পুরো চাপ বহন করছেন বিদেশে থাকা শ্রমিকরা। অনেক নিয়োগকর্তা দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে চান না, ফলে চাকরি হারানোর ঘটনাও বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ই-পাসপোর্ট ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদেশে থাকা আবেদনকারীদের জন্য পৃথক ও দ্রুত তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ হাইকমিশন ও আগারগাঁওয়ের পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মধ্যে রিয়েল-টাইম ডিজিটাল সমন্বয় এবং দ্রুত নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন তারা।
প্রতিদিন কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কনস্যুলার শাখায় ভিড় করছেন অসংখ্য প্রবাসী। সবার মুখে একটাই প্রশ্ন, আমার পাসপোর্ট কবে আসবে?
কারও অপেক্ষা দুই মাস, কারও চার মাস, আবার কেউ ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে প্রতীক্ষায় আছেন। একটি পাসপোর্টের বিলম্ব তাদের কাছে শুধু প্রশাসনিক জটিলতা নয়, এটি প্রবাসজীবনের নিরাপত্তা, বৈধ কর্মসংস্থান এবং পরিবারের ভবিষ্যতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এক কঠিন বাস্তবতা।






