নামেই আন্তর্জাতিক, বাস্তবে নয়: ওসমানী বিমানবন্দরের আড়ালে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অনিয়ম

নামেই আন্তর্জাতিক, বাস্তবে নয়: ওসমানী বিমানবন্দরের আড়ালে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অনিয়ম - Surma Times | Sylhet News

নামেই আন্তর্জাতিক, বাস্তবে নয়: ওসমানী বিমানবন্দরের আড়ালে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অনিয়ম - Surma Times | Sylhet Newsসিলেট, ৭ জুলাই ২০২৬: নামের সঙ্গে “আন্তর্জাতিক” যুক্ত থাকলেও সিলেটের এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দীর্ঘদিন ধরে কার্যত দেশি এয়ারলাইন্সনির্ভর ছিল। কয়েক হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প, রানওয়ে সম্প্রসারণ, নতুন টার্মিনাল ও কার্গো অবকাঠামো গড়ে ওঠার পরও বিদেশি এয়ারলাইন্সের নিয়মিত ওঠানামা না থাকা নিয়ে সিলেটবাসীর অভিযোগ ছিল পুরোনো। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সূত্রে উঠে আসা তথ্য সেই বঞ্চনা ও নীতিগত শূন্যতার চিত্র আরও স্পষ্ট করেছে।

এই পরিস্থিতির পেছনে দীর্ঘদিনের ষড়যন্ত্র ও বঞ্চনার অভিযোগ রয়েছে। সুরমা টাইমস এ ২০১৫ সালের ৪ এপ্রিল প্রকাশিত প্রতিবেদন ‘আর এলো না ‘ফ্লাই দুবাই’! ॥ বাসে গেলেন বিমানের যাত্রীরা!’-এ উল্লেখ করা হয়েছে যে, ১ এপ্রিল ফ্লাই দুবাইয়ের উদ্বোধনী ফ্লাইটের পর পরবর্তী দিনগুলোতে ফ্লাইট ওসমানীতে না এসে ঢাকায় অবতরণ করে এবং যাত্রীদের বাসযোগে ঢাকায় পাঠানো হয়। একই বছরের ২৯ এপ্রিল প্রকাশিত ‘গভীর ষড়যন্ত্রের ফাঁদে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর!’ শীর্ষক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা যায়, স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা এটিকে সিলেটবিরোধী ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং অভিযোগ উঠেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের প্রতিকূল শর্তের কারণে ফ্লাই দুবাইকে সরে আসতে হয়। ২ এপ্রিল ২০১৫-এ ক্যাবের আদেশে সিলেট বিমানবন্দরের ধারণক্ষমতা ও লোকবল সংকটের কারণ দেখিয়ে অনুমোদন বাতিলের কথা জানানো হয়। তবে ফ্লাই দুবাই ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ তখন এ ব্যাপারে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।

পরবর্তীতে ফ্লাই দুবাই সিলেট রুটে ফ্লাইট চালু রাখলেও ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে নিজেদের সমস্যার কারণে এ রুট থেকে সরে আসে। এরপর থেকে ওসমানী থেকে শুধু বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স যুক্তরাজ্যের লন্ডন ও ম্যানচেস্টার, সৌদি আরব, কাতার, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ ও আবুধাবিতে সরাসরি ফ্লাইট চালু রাখে।

অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ ২০২০ সালে বড় পরিসরে শুরু হয়। নতুন টার্মিনাল, রানওয়ে সম্প্রসারণ, কার্গো স্টেশন, এপ্রোন, কন্ট্রোল টাওয়ার ও আধুনিক প্যাসেঞ্জার সুবিধা যুক্ত হয়, যা বিমানবন্দরটিকে পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্যেই নেওয়া হয়েছিল। কার্গো অপারেশন চালু হওয়ায় বাণিজ্যিক সক্ষমতার দিক থেকে আরও অনেক দূর এগোনো সম্ভব ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। তবে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ২ হাজার ১১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার চলমান উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠে এসেছে। ২২ শতাংশ কাজ শেষ করেই শত শত কোটি টাকা ব্যয়, প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ও কাজের গুণগত মান নিয়েও সমালোচনা রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, বিদেশি এয়ারলাইন্স না থাকায় যাত্রীদের বিকল্প কমে গেছে, ভাড়া বেড়েছে এবং প্রবাসীদের ভোগান্তি দীর্ঘায়িত হয়েছে। যুক্তরাজ্য, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপগামী সিলেটিদের জন্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ওপর নির্ভরতা বাড়ায় বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়নি। সিলেটের ভৌগোলিক অবস্থান, প্রবাসী জনগোষ্ঠী ও পর্যটন সম্ভাবনা সত্ত্বেও কাতার, এমিরাত, তার্কিশ বা সৌদি এয়ারলাইন্সের নিয়মিত সেবা গড়ে তোলা যায়নি—এ প্রশ্নের উত্তর এখনো অনেকের কাছে অস্পষ্ট।

২০২২ সালের ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের সময় ঢাকার বিমানবন্দর থেকে ডাইভার্ট হয়ে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ওসমানীতে অবতরণ করেছিল, যা বিমানবন্দরের সক্ষমতার বাস্তব প্রমাণ হিসেবে দেখা হয়। সমর্থকদের মতে, এটি স্পষ্ট করে দেয় যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নীতিগত সিদ্ধান্ত ও পরিচালনাগত প্রস্তুতি থাকলে বিমানবন্দরটি বিদেশি এয়ারলাইন্সের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত করা সম্ভব।

সম্প্রতি রাষ্ট্র ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে ওসমানীকে সত্যিকার অর্থে কার্যকর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগের কথা সামনে এসেছে। চলতি বছরের শেষের দিকে একাধিক বিদেশি এয়ারলাইন্স সিলেট থেকে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করতে যাচ্ছে। ওমানভিত্তিক সালাম এয়ার ১ সেপ্টেম্বর থেকে সিলেট-মাস্কট রুটে সরাসরি ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে। শুরুতে সপ্তাহে তিনটি ফ্লাইট পরিচালনার আগ্রহ ব্যক্ত করেছে বলে জানিয়েছেন বিমানবন্দর পরিচালক হাফিজ আহমদ। সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক এয়ার আরাবিয়াও সিলেট-দুবাই রুটে ফ্লাইট পরিচালনার সম্ভাবনা দেখছে।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ফ্লাই দুবাই ফের সিলেট থেকে ফ্লাইট পরিচালনায় আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, এয়ারলাইন্সটিকে ফ্লাইট অপারেশনের জন্য নীতিগত সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। ট্রাভেলস ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চলতি বছরের শেষের দিকে ফ্লাই দুবাই ওসমানী থেকে ফের ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারে। আগামী আগস্টে ইউএস-বাংলা সৌদি আরবের মক্কা ও মদিনায় সরাসরি ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা করছে।

গত রবিবার বিমানের সিলেট-ম্যানচেস্টার ফ্লাইট পুনরায় চালু হয়েছে। যাত্রীদের স্বাগত জানান মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, ওসমানীকে কার্যকর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপান্তরিত করতে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। ভারতের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক সেই উচ্চতায় গেলে সিলেট-গোয়াহাটি ফ্লাইট চালু হতে পারে। এতে আন্তঃরাষ্ট্রীয়, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বাড়বে।

আটাব সিলেটের সাবেক সভাপতি আবদুল জব্বার জলিল বলেন, ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার আমরা করতে পারছি না। বিদেশি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ওঠানামা করবে এটা সিলেটবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি। সরকারের উদ্যোগ সফল হলে প্রবাসীরাও উপকৃত হবেন।

তবে স্থানীয় পর্যবেক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের অনেকে বলছেন, এ উদ্যোগ নতুন হলেও প্রশ্ন রয়ে গেছে -এই পরিবর্তন কি সত্যিই স্থায়ী হবে, নাকি আবারও কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। বিমানবন্দরকে ঘিরে সেবা, ভাড়া, যাত্রীস্বার্থ, বিনিয়োগ, পর্যটন ও আঞ্চলিক সংযোগের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য ও পুরোনো প্রতিবেদনগুলো বলছে, ওসমানীকে সত্যিকার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছাতে হলে শুধু অবকাঠামো নয়, স্বচ্ছতা, সমান সুযোগ এবং বিদেশি এয়ারলাইন্সের জন্য কার্যকর নীতিগত দরজাও খুলতে হবে।

★★★★★

সুরমা টাইমস পড়ে ভালো লাগলো?
আপনার মতামত জানান!

গুগলে রেটিং দিন রিভিউ লিখুন ⭐
Share This Article