সুরমা টাইমস ডেস্কঃ সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের আকস্মিক প্রত্যাহার নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হলেও সংশ্লিষ্ট মহলের একটি বড় প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে, কেন তিনি নিজের মূল প্রশাসনিক দায়িত্বের বাইরে গিয়ে মাজারের দানের অর্থ নিয়ে এতটা সক্রিয় হলেন।
দায়িত্ব গ্রহণের পর শুরুতে কিছু উদ্যোগ প্রশংসিত হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোতে কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়নি। সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক প্রকল্প, নগরের ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণ, হকার সমস্যা কিংবা সাদাপাথর লুটকাণ্ডের তদন্ত—এসব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দৃশ্যমান ফল না আসায় প্রশ্ন উঠতে থাকে তার দায়িত্ব পালনের দক্ষতা নিয়ে।
এরই মধ্যে হঠাৎ করে হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের শতাব্দীপ্রাচীন দান ব্যবস্থায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করে দানের ডেগ সিলগালা ও নতুন দানবাক্স বসানোর উদ্যোগ নেন তিনি। যা অনেকের মতে ছিল তার প্রশাসনিক দায়িত্বের বাইরে এবং অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ।
মাজার সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এটি ঐতিহ্য ও ধর্মীয় ব্যবস্থাপনায় অযাচিত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের একাংশও প্রশ্ন তুলেছেন, যেখানে নগরের বহু সমস্যা অমীমাংসিত, সেখানে কেন মাজারের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে এত আগ্রহ দেখানো হলো।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার কোনো প্রকাশ্য বিতর্ক না তৈরি করে ‘জনস্বার্থে’ তাকে নীরবে প্রত্যাহার করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই জনমতের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মূল দায়িত্ব হচ্ছে জনসেবা, উন্নয়ন ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা। সেই জায়গায় ব্যর্থতা ঢাকতে গিয়ে অন্য ইস্যুতে অতিরিক্ত সক্রিয়তা দেখালে তা উল্টো বিতর্ক তৈরি করে।
সার্বিক পরিস্থিতিতে সরকারের এই পদক্ষেপকে অনেকেই সময়োপযোগী বলে মনে করছেন, যাতে প্রশাসনের প্রতি জনআস্থা অটুট থাকে এবং অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা এড়ানো যায়।
এদিকে সারওয়ার আলমের প্রত্যাহারের প্রতিবাদে সিলেট নগরীতে মানববন্ধনও হয়েছে। বক্তারা দাবি করেন, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণেই তাকে সরানো হয়েছে।
অন্যদিকে সমালোচকরা বলছেন, দায়িত্ব পালনে নানা সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবায়নের ঘাটতির কারণে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ ছিলেন। গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়াও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসেবে উঠে আসে।
সাদাপাথর লুটকাণ্ডের পর ২০২৫ সালের আগস্টে তাকে সিলেটে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই মূল দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়ে তিনি হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের ঐতিহাসিক দানের ডেগ সিলগালা ও নতুন দানবাক্স বসানো নিয়ে বিতর্কিত হয়ে পড়েন। মাজারের আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা আনার নামে এই পদক্ষেপকে অনেকে প্রশাসনিক অতি-উৎসাহ বলে মনে করছেন।
প্রশ্ন উঠেছে— জেলা প্রশাসকের কাজ কি মাজারের দানের তহবিল নিয়ে এতটা মনোযোগ দেওয়া? সাদাপাথর লুটের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ, ফুটপাত দখলমুক্তকরণ, হকার সমস্যা সমাধান, ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি বন্ধ, ওসমানী হাসপাতালে দালালমুক্তকরণসহ মূল প্রশাসনিক দায়িত্বগুলোতে তিনি স্থায়ী সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। শুরুর কিছু উদ্যোগ পরে আবার পুরনো অবস্থায় ফিরে যায়।
রোববার জারি করা প্রজ্ঞাপনে নতুন জেলা প্রশাসক নিয়োগ না করলেও, সরকারের এই নীরব সিদ্ধান্তকে সিলেটের জনগণের আবেগ ও দাবির প্রতি সম্মান দেখানো হিসেবে দেখা হচ্ছে। মাজার সংশ্লিষ্টরা ও স্থানীয়দের ক্ষোভের মুখে প্রশাসন যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।
সারওয়ার আলম আগামীকাল সোমবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে যোগ দেবেন। তিনি একসময় র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে আলোচিত ছিলেন। কিন্তু সিলেটে দায়িত্ব পালনকালে মাজারের ডেগ সিলগালা নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়, তা শেষ পর্যন্ত তার প্রত্যাহারের অন্যতম কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সিলেটবাসী এখন আশা করছেন, নতুন জেলা প্রশাসক এসে মূল সমস্যাগুলো— বিশেষ করে সাদাপাথরসহ প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা, নাগরিক সেবা ও আইনশৃঙ্খলায় দৃশ্যমান উন্নতি আনবেন।
প্রত্যাহারের বিষয়ে সারওয়ার আলম জানিয়েছেন, তাকে দ্রুত ঢাকায় যোগ দিতে বলা হয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়মিত বদলি নাকি অন্য কোনো কারণে, তা নিয়ে এখনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা আসেনি।
এ ঘটনায় সিলেটজুড়ে আলোচনা চলছে, বিশেষ করে মাজার ইস্যু ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে।






