নাটোর, ২৯ অক্টোবর: ছাত্রদল নেতা শাকিল হত্যা মামলায় এমপি পুত্র মিন্টুর জড়িত থাকার ঘটনায় ক্ষোভে উত্তাল নাটোর। গত কয়েকদিনের চলমান উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই খোদ এমপি আব্দুল আজিজের অশালীন ভিডিও দৃশ্যত ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে। এই দুই ইস্যুতে টালমাটাল নাটোরের রাজনীতি।
নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজের আপত্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় চলছে সমালোচনার ঝড়। ফেসবুকজুড়ে সমালোচনার পাশাপাশি ধিক্কার জানাচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ। ট্রলও করছেন অনেকে। এদিকে বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা বড়াইগ্রামের বনপাড়া বাইপাস চত্বরসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে আজিজের ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টার ছিঁড়ে ফেলছেন।
এর আগে মঙ্গলবার রাতে ছাত্রদল নেতা শাকিলের জানাজা ও দাফনের পরই আজিজের নৈতিক স্খলনের ভিডিও ভাইরাল হয়। আশফাক আহমেদ নামে প্রবাসী এক ব্যক্তির ফেসবুক আইডি থেকে প্রথমে তিনটি ভিডিও ক্লিপ প্রকাশ পায়। মুহূর্তেই এটি ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ক্ষোভে ফেটে পড়েন সাধারণ ভোটারসহ বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ। এমনকি বিএনপির জেলা নেতৃবৃন্দসহ ছাত্রদল ও যুবদলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা তাঁর পদত্যাগ দাবি করেন।
প্রায় পাঁচ মিনিটের তিনটি ভিডিও ক্লিপে আজিজকে এক নারীর সঙ্গে বিভিন্ন স্পর্শকাতর কথা বলতে দেখা যায়। এ সময় তিনি নানা ধরনের অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করেন। আশফাক নামের ওই আইডি থেকে এরইমধ্যে তাঁর বিভিন্ন অপকর্ম ও তাঁর দুই সন্তানের নানা ধরনের অনৈতিক কাজের সমালোচনা করা হচ্ছিল।
এদিকে গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব শাকিল ইসলাম (৩২) দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হন। এই হত্যা মামলায় আজিজের পুত্র নুরুজ্জামান মিন্টুকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। শাকিলের জানাজায় আজিজের বক্তব্য দেওয়ার সময় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় নেতাকর্মীরা ভুয়া ভুয়া স্লোগান দিতে থাকে। জানাজা শেষে বিক্ষোভকারীরা একটি শপিংমল ভাঙচুর করে।
গুরুদাসপুর প্রতিনিধি জানান, সন্ত্রাসী হামলায় ছাত্রদল নেতার মৃত্যুতে যুবদল নেতা ও এমপিপুত্র নুরুজ্জামান মিন্টুকে তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়ার পরই দায়িত্বে অবহেলার কারণে থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। মিন্টুকে উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক পদ থেকেও বহিষ্কার করেছে দল। সেই সঙ্গে ওসি আব্দুল হান্নানকে রাজশাহী রেঞ্জে সংযুক্ত করা হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখার আলম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
জাতীয়তাবাদী যুবদল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিনহাজুল ইসলাম ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত পরিপত্রে জানা যায়, জীবনহানির মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গুরুদাসপুর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুজ্জামান মিন্টুকে প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছেন যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন। যুবদলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের তাঁর সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে সন্ত্রাসী হামলায় আহত হওয়ার ১২ দিন পর গত সোমবার রাত ৮টায় ঢাকার বিএমইউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব শাকিল ইসলাম। মঙ্গলবার দুপুরে নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে তাঁর প্রথম জানাজা হয়। রাত ১০টার দিকে গুরুদাসপুরের বিলচলন শহীদ শামসুজ্জোহা কলেজ মাঠে দ্বিতীয় জানাজার সময় বক্তব্যে নিহতের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে চান এমপি আব্দুল আজিজ। এ সময় এমপিকে ভুয়া ভুয়া স্লোগান দেন উপস্থিত বিক্ষুব্ধ জনতা। জানাজার পরপরই চাঁচকৈড় বাজারের রাশ আরবান মেগা শপিংমল ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় দুর্বৃত্তরা।
ফেসবুকে নিজের অশালীন ভিডিও ভাইরাল প্রসঙ্গে আব্দুল আজিজ এমপি বলেন, এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মান ক্ষুণ্ন করার জন্য এআই প্রযুক্তি দিয়ে আমাকে হেয় করার চেষ্টা করছে প্রতিপক্ষ। এ ব্যাপারে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি ভাবছি।
ছাত্রদল সূত্রে জানা যায়, এমপি আজিজের দুই ছেলের পৃথক সমর্থকগোষ্ঠী আছে। দুই ভাইয়ের অনুসারীদের মধ্যে দ্বন্দ্বও আছে। নিহত শাকিল এমপির ছোট ছেলে মাহমুদুজ্জামান সোহাগের অনুসারী। মিন্টু উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং ছোট ভাই সোহাগ উপজেলা বিএনপির সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক।
নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় ছিলেন শাকিল। গত ২০ এপ্রিল নিজের নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়ে ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট দেন তিনি। সেখানে থানায় সাধারণ ডায়েরি করার কথাও উল্লেখ করেছিলেন। তাঁর বাবা রবিউল করিম বলেন, শাকিলের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি পুলিশ। শাকিল আহত হওয়ার পরও পুলিশ হামলাকারীদের চিহ্নিত করতে পারেনি।
উল্লেখ্য, গত ১৪ অক্টোবর রাত ১০টার দিকে চাঁচকৈড় বাজার থেকে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফেরার পথে শাকিলের ওপর হামলা চালিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে হেলমেট পরা দুই যুবক। তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে রাজশাহী এবং পরে ঢাকার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে সোমবার রাত ৮টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। শাকিলের মৃত্যুর খবরে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল করেন।
ছাত্রদল নেতার হত্যাকাণ্ড ও এমপির ভিডিও বিতর্ক মিলিয়ে নাটোরের রাজনীতি এখন চরম অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের গ্রেপ্তার ও দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ।






