সিলেট, ১৭ আগস্ট: সিলেট নগরের রায়নগরে দম্পতি ও তাঁদের গৃহকর্মীকে হত্যার ঘটনায় নিহত তাহমিনা বেগমের বয়স নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অসঙ্গতি। হত্যাকাণ্ডের পর বিভিন্ন সময় তাঁর বয়স ২৫, ১৫ ও ১৮ বছর উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে তাহমিনার বাবা আফতাব মিয়া জানিয়েছেন, তাঁর মেয়ের বয়স ১২ থেকে ১৩ বছর। মামলার বাদীও তাঁকে ‘বাচ্চা মেয়ে’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
একই ব্যক্তির বয়স নিয়ে এমন পার্থক্য তদন্তে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। কারণ বয়স এখানে শুধু পরিচয় নির্ধারণের বিষয় নয়, মামলার তদন্ত, ঘটনাপ্রবাহ এবং পুলিশের সামনে আসা হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণের সঙ্গেও এটি সরাসরি সম্পর্কিত।
গত ১২ আগস্ট রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার একটি বাসা থেকে আব্দুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর প্রথম দিকের বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে তাহমিনার বয়স ২৫ বছর উল্লেখ করা হয়। পুলিশের পক্ষ থেকেও পরে গণমাধ্যমকে তাঁর বয়স ১৫ বছর বলা হয়।
ঘটনার পর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে পরিবারের সদস্যদের বরাত দিয়ে তাহমিনাকে ১৫ বছর বয়সী কিশোরী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সেখানে বলা হয়েছিল, কোরবানির ঈদের পর তিনি রায়নগরের ওই বাসায় কাজে যোগ দেন।
তবে আদালতে বাবুল মিয়াকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডের আবেদন করার নথিতে তাহমিনার বয়স ১৮ বছর উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত ২৫ বছর, পুলিশের দেওয়া ১৫ বছর এবং আদালতে দেওয়া ১৮ বছরের তথ্যের পাশাপাশি পরিবারের দেওয়া ১২ থেকে ১৩ বছরের তথ্যও সামনে এসেছে।
পরিবারের বক্তব্যে নতুন প্রশ্ন
তাহমিনার বাবা আফতাব মিয়া একজন দিনমজুর। তিনি জানিয়েছেন, তাঁর মেয়ের বয়স ১২ থেকে ১৩ বছর হবে। পরিবারের সদস্যদের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আর্থিক সংকটের কারণে অল্প বয়সেই তাহমিনাকে কাজে যেতে হয়েছিল।
একজন বাবা নিজের সন্তানের বয়স সম্পর্কে এমন বক্তব্য দেওয়ার পর বিষয়টি তদন্তে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাহমিনার জন্মনিবন্ধন সনদ, স্কুলের নথি, টিকা কার্ড কিংবা অন্য কোনো সরকারি কাগজপত্র থাকলে সেগুলো যাচাই করলেই বয়স সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব।
নিহত দম্পতির মেয়ে ও মামলার বাদী সেলিনা সুলতানাও তাহমিনাকে ‘বাচ্চা মেয়ে’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, তাহমিনা তাঁদের কাছে অত্যন্ত পরিচিত ও বিশ্বস্ত ছিলেন। কাজের মেয়েটিকে বাঁচাতে গিয়ে তাঁর মা মারা গেছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
সেলিনার বক্তব্য পুলিশের দেওয়া ১৫ বছর বয়সের তথ্যের সঙ্গে কিছুটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও আদালতে দেওয়া ১৮ বছর বা প্রথম দিকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা ২৫ বছর বয়সের সঙ্গে তা মেলে না।
হত্যার কারণ নিয়েও মতভেদ
রায়নগরের তিন খুনের ঘটনায় পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য ছিল, গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে বাবুল মিয়ার কথিত সম্পর্ক ও বিরোধের জেরে হত্যাকাণ্ড ঘটে। পুলিশ দাবি করেছে, তাহমিনাকে হত্যার পর তাঁকে বাঁচাতে এগিয়ে আসা গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম এবং পরে গৃহকর্তা আব্দুস সাত্তারও হামলার শিকার হন।
অন্যদিকে নিহত দম্পতির মেয়ে সেলিনা সুলতানার করা মামলায় দীর্ঘদিনের সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধ ও পূর্বশত্রুতার বিষয় সামনে এসেছে। তাঁর অভিযোগ, বাবা-মা ও গৃহকর্মীকে পরিকল্পিতভাবে ভাড়াটে খুনিদের দিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
সেলিনা পুলিশের সামনে আসা কথিত সম্পর্কের বর্ণনাও প্রশ্ন করেছেন। তাঁর বক্তব্যে তাহমিনাকে ‘বাচ্চা মেয়ে’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে তাহমিনার প্রকৃত বয়স নির্ধারণ পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক যাচাইয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে পুলিশ যখন কথিত সম্পর্ককে হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ হিসেবে সামনে এনেছে, তখন তাহমিনার বয়স নিশ্চিত করা আরও জরুরি। বয়সের তথ্য সঠিক না হলে তদন্তের ঘটনাক্রম, সম্পর্কের প্রকৃতি এবং সম্ভাব্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে তৈরি ধারণাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
নথি যাচাই জরুরি
তাহমিনার বয়স নিয়ে বিভ্রান্তির অবসান ঘটাতে তদন্তকারীদের জন্মনিবন্ধন সনদ, স্কুলের রেকর্ড, টিকা কার্ড এবং অন্যান্য সরকারি নথি যাচাই করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে চিকিৎসা ও ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমেও বয়সসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে আদালতে দেওয়া নথিতে ১৮ বছর, পুলিশের বক্তব্যে ১৫ বছর এবং পরিবারের বক্তব্যে ১২ থেকে ১৩ বছর বয়স কীভাবে এসেছে, সেটিও তদন্তের অংশ হওয়া উচিত। প্রকৃত বয়স নির্ধারণ হলে নিহত তাহমিনার পরিচয়, তাঁর সামাজিক অবস্থান এবং হত্যাকাণ্ডের পেছনের সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে তদন্ত আরও নির্ভরযোগ্যভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।







