—ম্যাচ কাভার করে এক শহর থেকে অন্য শহরে ছুটতে হতো ফিফা ট্রেনে।
বিশ্বকাপ এবং ক্রীড়া সাংবাদিকতা
বিশ্বকাপ ফুটবলকে ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ বলা হয়। এটি শুধু ফুটবলার ও কোচদের মঞ্চ নয়; সমর্থক, পৃষ্ঠপোষক থেকে সাংবাদিকসহ নানা পর্যায়ের মানুষ এতে জড়িত। পেশাদার ক্রীড়া সাংবাদিকদের জন্য বিশ্বকাপ কাভার করা বিশেষ এক অধ্যায়।
২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপ কাভার করার সুযোগ হয়েছিল। আট বছর পেরিয়ে গেলেও রাশিয়া বিশ্বকাপ কাভারের অনেক স্মৃতি এখনো হৃদয়পটে। সমর্থকরা ফুটবলের প্রাণ। রাশিয়া বিশ্বকাপে টিকিট প্রাপ্ত দর্শকরা ‘ফ্যান আইডি’ পেয়েছিলেন; সেই ফ্যান আইডি দিয়েই ভিসা এবং ট্রেনে যাতায়াত করতে পারতেন অনায়াসে।
সাংবাদিকদের চ্যালেঞ্জ
সাংবাদিকরা প্রতিনিয়ত খবরের পেছনে ছোটেন। বিশ্বকাপের মতো আসর তো খবরের জন্য মহাসাগর। বাংলাদেশি সাংবাদিকদের জন্য সেটা বিশাল এক চ্যালেঞ্জ, কারণ বাংলাদেশ যেহেতু বিশ্বকাপ খেলে না, তাই ম্যাচ, প্রেস কনফারেন্স টিকিটসহ নানা প্রোগ্রামে অনেক সময় অপেক্ষামান থাকতে হয়।
এর সঙ্গে যোগ হয় ভাষাগত সমস্যাও। বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে ইংরেজি ভাষাভাষি দেশ তুলনামূলক কম। ফলে মিক্সড জোনে ফুটবলার ও কোচদের কাছাকাছি পেয়েও অনেক সময় ভাষার কারণে কাঙ্ক্ষিত প্রশ্ন করা যায় না। যদিও প্রেস কনফারেন্সে কোচ ও ফুটবলাররা নিজ ভাষায় কথা বললেও সেটা ইংরেজি, স্প্যানিশ ও ফরাসি ভাষায় অনুদিত হতো স্বয়ংক্রিয়ভাবে।
ফিফা ট্রেন এবং যাতায়াত
ট্রেনে ফ্রি’তে ভ্রমণ করার সুযোগ ছিল গণমাধ্যমকর্মীদেরও। আয়তনে বিশ্বের সবচেয়ে বড় দেশ রাশিয়া। রাজধানী মস্কো থেকে কাজান, সামারা, সোচি, পিটার্সবার্গসহ অনেক ভেন্যু ছিল অনেক দূরত্বের। বিশেষ করে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল বেস ক্যাম্প করেছিল সোচিতে।
মস্কোতে সাংবাদিক ও সমর্থকদের পৌঁছানোর ব্যবস্থা রেখেছিল আয়োজকরা। এ জন্য ট্রেনে একদিনের বেশি সময় লাগত। সোচির দূরত্ব অনেক বেশি হলেও কাজান, সামারা, পিটার্সবার্গ মোটামুটি দূরত্বে।
বিশ্বকাপে এক ম্যাচ কাভার করে আরেক ম্যাচ কাভার করতে ছুটতে হতো সাংবাদিকদের। ফিফার অ্যাক্রিডিটেশনপ্রাপ্ত সাংবাদিকদের জন্য ট্রেন ফ্রি ছিল। বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে রাশিয়া ‘ফিফা ট্রেন’ নামে বিশেষ ট্রেন চালু করেছিল। মস্কো থেকে পিটার্সবার্গ, আবার পিটার্সবার্গ থেকে কাজান, কাজান থেকে মস্কো आবার মস্কো থেকে সামারা এভাবে ট্রেনে চড়েই রাশিয়া ঘুরতে হয়েছে।
এক শহর থেকে আরেক শহরে ট্রেনে যেতে কমপক্ষে ৬ থেকে ৮-৯ ঘণ্টাও লাগত। ট্রেনের সময় কখনো ছিল ম্যাচের পরপর, আবার কখনো মধ্যরাতে। কোনো কোনো সময় ভোরেও ছিল। ফলে অনেক রাতই কেটেছে ট্রেনে ঘুমিয়ে, আবার কখনো ঘুম ভেঙে দৌড়াতে হয়েছে ট্রেন স্টেশনে।
বাংলাদেশ থেকে রাশিয়া তিন ঘণ্টা পিছিয়ে। তখন কাজ করতাম দৈনিক সংবাদে। পত্রিকা প্রকাশের একটি ডেডলাইন থাকে। ঐ সময়ের মধ্যে সংবাদ পাঠাতেই হবে। ল্যাপটপ খুলে চলত কি-বোর্ডের ঝড়। ট্রেনের একটি কক্ষে চারটি বেড ছিল। এক কক্ষে অনেক সময় চারজনও সাংবাদিক পড়েছে। তখন সেটাই হয়ে যেত যেন মিনি নিউজরুম।
সমর্থকদের মাতিয়ে রাখা
ফিফা ট্রেনে সাংবাদিক ছাড়াও সমর্থকরাও ভ্রমণ করতেন। মাঠের মতো ট্রেনেও সমর্থকরা গান-বাজনা হৈ-হুল্লোড় করে মাতিয়ে রাখতেন। চুলচেরা বিশ্লেষণ করতেন। ক্রীড়া সাংবাদিকরা খেলাধুলার তথ্য উপাত্ত নিয়েই কাজ করতেন, কিন্তু অনেক সমর্থক নিজের প্রিয় দলের বিশ্লেষণ কিংবা তথ্য আহরণে সাংবাদিকদেরও চমকে দিতেন।
ট্রেনের প্রভাব
রাশিয়া বিশ্বকাপে ট্রেনই হয়ে উঠেছিল যেন জীবনের অনুষঙ্গ। দিনের তিন ভাগের এক ভাগ সময় লাগত এক শহর থেকে আরেক শহরে পৌঁছাতে। ফলে গোসল, ঘুমসহ নিত্য-নৈমিত্তিক বিষয়গুলো ট্রেনেই করতে হতো। আন্তঃশহর ট্রেনের পাশাপাশি শহরের মধ্যেও মেট্রোরেলে যাতায়াত করতে হয়েছে। ফলে পুরো বিশ্বকাপটাই ছিল ট্রেন নির্ভর।
আর মনে হতো বাংলাদেশের ট্রেনের ব্যবস্থা কবে এই রকম হবে। বছর দু’য়েক আগে ঢাকায় মেট্রোরেল ব্যবস্থা শুরু হয়ে নাগরিক জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। অদূর ভবিষ্যতে আন্তঃনগর ট্রেনও ভ্রমণে স্বস্তি আনবে এটাই প্রত্যাশা।






