সহকর্মী নারীকে ৭ বছর নির্যাতন, ব্যাংক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভয়ংকর রায়

সুরমা টাইমস ডেস্কঃ ফ্রান্সে এক সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উঠল এমন ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের অভিযোগ, যা শুনে হতবাক আদালত। সাবেক সহকর্মী এক নারীকে বছরের পর বছর ধরে মানসিক চাপ, ভয়ভীতি আর বিকৃত যৌনাচারের মাধ্যমে নির্যাতন চালানোর দায়ে গিয়োম বুচিকে ২৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।

এই মামলায় সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, ভুক্তভোগী নারীকে শুধু একা নির্যাতনই নয়, অনলাইনে খুঁজে আনা শত শত অপরিচিত পুরুষের সঙ্গে জোর করে শারীরিক সম্পর্কে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ। আদালতে ভুক্তভোগী লেতিসিয়া আর জানান, ২০১৫ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তিনি এক দীর্ঘ ভয়ংকর বন্দিজীবন কাটিয়েছেন, যেখানে তাকে দাসীর মতো ব্যবহার করা হতো।

কীভাবে শুরু হয় নির্যাতন

ভুক্তভোগী লেতিসিয়া আর চার সন্তানের জননী। আদালতে দেওয়া সাক্ষ্যে তিনি বলেন, শুরুতে বিষয়টি স্যাডোম্যাসোকিস্টিক গেমের আড়ালে এগোতে থাকে। কিন্তু পরে সেটি রূপ নেয় নির্মম সহিংসতা, নিয়ন্ত্রণ আর অবমাননাকর নির্যাতনে। তার ভাষায়, বুচি শুধু তাকে যৌন কাজে বাধ্য করতেন না, বরং কে, কোথায়, কখন তার সঙ্গে মিলিত হবে, সেটিও ঠিক করে দিতেন।

তিনি জানান, বড়দিনের আগের এক রাতে বুচি তাকে একটি মোটরওয়ে সার্ভিস স্টেশনে গিয়ে অপরিচিত পুরুষদের কাছে নিজেকে সঁপে দিতে বলেন। সেই সময় তিনি ফোনে পুরো ঘটনাটি শুনছিলেন। পরে তাকে ক্রমাগত আরও পুরুষের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করতে বাধ্য করা হয়। লেতিসিয়া আদালতে বলেন, ৪৮৭ জন পুরুষের পর তিনি আর গোনা বন্ধ করে দেন।

প্রকাশ্য বিচার চাওয়ার কারণ

বুচির বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় শুরুতে গোপন বিচার চাইতে পারতেন লেতিসিয়া। কিন্তু তিনি প্রকাশ্য বিচার বেছে নেন। আদালতে তিনি বলেন, ফ্রান্সের আরেক আলোচিত ভুক্তভোগী গিসেলে পেলিকটের সাহস তাকে এই সিদ্ধান্ত নিতে অনুপ্রাণিত করেছে।

গিসেলে পেলিকটের মামলা ফ্রান্সে নারীর প্রতি সহিংসতা এবং সম্মতি প্রশ্নে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। সেই মামলার পর এবার লেতিসিয়ার সাক্ষ্যও দেশটিতে নতুন করে আলোড়ন তুলেছে।

আদালতে কী বললেন বুচি

গিয়োম বুচি আদালতে কিছু নির্যাতনের কথা স্বীকার করলেও দাবি করেন, সেগুলো ছিল তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের অংশ এবং সম্মতিসূচক। তিনি বলেন, তিনি কখনও ভাবেননি যে লেতিসিয়াকে আঘাত করছেন।

তবে প্রসিকিউটররা আদালতে এমন টেক্সট ও ভয়েস মেসেজ উপস্থাপন করেন, যেখানে বুচি হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ আনা হয়। তদন্তকারীদের মতে, এসব প্রমাণ করে যে লেতিসিয়া ভয়, চাপ ও মানসিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিলেন।

ভুক্তভোগীর ভেঙে পড়ার কাহিনি

লেতিসিয়া আদালতে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ২০১৭ সালে কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ার পর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার একদিন পরই তাকে আবারও যৌন কর্মকাণ্ডে বাধ্য করা হয়। তার ভাষায়, প্রতিটি জোরপূর্বক ঘটনার সঙ্গে তার একটি অংশ চিরতরে ভেঙে গেছে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, বুচি তাকে অপমানজনক ও অবমাননাকর নানা কাজ করতে বাধ্য করতেন। তার জীবন তখন ভয়, লজ্জা আর নিরব আতঙ্কে ভরে ওঠে।

রায় ও শাস্তি

প্রসিকিউটররা বুচির জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দাবি করেছিলেন। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতেও তিনি অন্য নারীর বিরুদ্ধে একই ধরনের অপরাধ করতে পারেন।

শেষ পর্যন্ত আদালত তাকে ২৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়। রায়ে বলা হয়, প্যারোলের জন্য আবেদন করার আগে তাকে অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সাজা ভোগ করতে হবে।

কেন এই মামলা আলোচনায়

এই মামলাটি শুধু একটি অপরাধের রায় নয়, বরং ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ, ভয়ভীতি আর যৌন সহিংসতার ভয়াবহ চিত্র উন্মোচন করেছে। বিশেষ করে ভুক্তভোগীর প্রকাশ্য সাক্ষ্য এবং শত শত পুরুষের সঙ্গে জোরপূর্বক সম্পর্কের অভিযোগ ফ্রান্সজুড়ে নতুন করে চাঞ্চল্য তৈরি করেছে।

Share This Article