ঈদের আগে পশ্চিমবঙ্গে গবাদিপশু জবাইয়ে কড়াকড়ি, চাপে কৃষক ও খামারিরা

ঈদের আগে পশ্চিমবঙ্গে গবাদিপশু জবাইয়ে কড়াকড়ি, চাপে কৃষক ও খামারিরা - Surma Times | Sylhet News

ঈদের আগে গবাদিপশু জবাইয়ে পশ্চিমবঙ্গে কড়াকড়ি scaledঈদুল আজহা সামনে রেখে পশ্চিমবঙ্গে গবাদিপশু জবাই সংক্রান্ত কঠোর বিধিনিষেধ নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে। খামারি ও কৃষকেরা বলছেন, এই সিদ্ধান্তে তাদের লোকসান বাড়ছে, পশুর বাজার ভেঙে পড়ছে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

খবর অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকার পুরোনো **পশ্চিমবঙ্গ পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৫০** আরও কঠোরভাবে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন নির্দেশনায় গরু জবাইয়ের আগে স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারি পশুচিকিৎসকের যৌথ ‘জবাইযোগ্য’ সনদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই সঙ্গে গরু ও মহিষ পরিবহন এবং খোলা জায়গায় জবাইয়ের ওপরও নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

ঈদের বাজারে অস্থিরতা

ঈদের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে এমন সিদ্ধান্তে দক্ষিণ ২৪ পরগনা, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ ও বীরভূমের মতো জেলায় উদ্বেগ বেড়েছে। এসব এলাকার ছোটখাটো দুগ্ধ ও পশুপালন খামারিরা সাধারণত ঈদের সময় পুরোনো বা অনুৎপাদনশীল গরু বিক্রি করে খরচ উঠিয়ে নেন এবং নতুন পশু কেনেন।

দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়ের বামনগাছির এক খামারি বলেন, সরকার পশু অর্থনীতির বাস্তবতা বোঝেনি। তার অভিযোগ, একটি গরু পালতে দৈনিক ২০০ থেকে ৩০০ রুপি পর্যন্ত খরচ হয়, অথচ ১৪ বছরের আগে গরু বিক্রি করা যাবে না—এমন কড়াকড়ি বাস্তবে সমস্যায় ফেলছে। তার প্রশ্ন, যেসব গরু অনেক আগেই দুধ দেওয়া বন্ধ করে দেয়, সেগুলোর কী হবে?

আইন অনুযায়ী, কোনো গবাদিপশু ১৪ বছরের বেশি বয়সী হলে, কাজ বা প্রজননের অনুপযোগী হলে কিংবা স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়ে পড়লে তবেই জবাইয়ের অনুমতি মিলতে পারে।

লোকসানের আশঙ্কা

খামারিদের অভিযোগ, কঠোর প্রয়োগের ফলে মৌসুমি পশুর বাজার কার্যত স্থবির হয়ে গেছে। আইনি জটিলতা ও কট্টরপন্থীদের হামলার আশঙ্কায় পাইকার ও ক্রেতারা সরে যাচ্ছেন। ভাঙড়ের আরও এক খামারি জানান, তিনি ঋণ নিয়ে এই ব্যবসা করছেন, কিন্তু এখন ক্রেতা না থাকায় সংকটে পড়েছেন। তার দাবি, সরকার যেন বিকল্প জীবিকা বা ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ করে পশু কেনার ব্যবস্থা করে, যেমন ধান কেনা হয়।

একই এলাকার আরেক খামারি বলেন, ঈদের আগে বিক্রির জন্য প্রস্তুত রাখা প্রায় ২০টি গরুর ক্রেতা মিলছে না। আগে যারা অগ্রিম টাকা দিয়েছিলেন, তারাও এখন তা ফেরত চাইছেন।

বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ‘ঘোষ’ সম্প্রদায়

পশ্চিমবঙ্গের গোয়ালা ও সদগোপ সম্প্রদায়ভুক্ত ‘ঘোষ’ পদবিধারীরা ঐতিহ্যগতভাবে দুগ্ধ ও পশুপালনের সঙ্গে যুক্ত। তাদের কাছে পশু বেচাকেনা অতিরিক্ত আয়ের বড় উৎস। তাই এই বিধিনিষেধে তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে ব্যবসায়ীদের দাবি।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদের বাজারে তোলা একটি গরুর দাম আকার, বয়স ও অবস্থাভেদে ২ লাখ থেকে ৫ লাখ রুপি পর্যন্ত হতে পারে।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

বিরোধীরা বলছে, বিজেপির ‘গরু রক্ষা’ রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গের কৃষিনির্ভর বাস্তবতার সঙ্গে সংঘাতে যাচ্ছে। ভাঙড়ের আইএসএফ বিধায়ক নৌশাদ সিদ্দিকি দাবি করেন, বিজেপি মুসলিমদের নিশানা করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেদেরই এক বড় অংশের মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তার বক্তব্য, গবাদিপশু পালনের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষই মুসলিম নন।

তিনি আরও বলেন, মুসলমানদের কোরবানির জন্য ছাগল-ভেড়ার বিকল্প রয়েছে, কিন্তু খামারিরা একটি গরুতে ২০ থেকে ৩০ হাজার রুপি খরচ করে অন্তত ১ লাখ রুপিতে বিক্রির আশা করেন। তাই ঈদের সময় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে নির্দিষ্ট এলাকায় সাময়িক শিথিলতার প্রস্তাবও দেন তিনি।

‘জন্মসনদ’ বিতর্ক

বিতর্ক আরও বেড়েছে বিজেপির নবনির্বাচিত বিধায়ক রেখা পাত্রের এক মন্তব্যকে ঘিরে। হিঙ্গলগঞ্জে গরুবাহী একটি গাড়ি থামিয়ে তিনি গরুর ‘জন্মসনদ’ দেখতে চেয়েছিলেন, যাতে বোঝা যায় জবাইয়ের বয়স হয়েছে কি না। সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, ১৪ বছরের কম বয়সী গরু জবাই নিষিদ্ধ, তাই অবৈধ পরিবহনের ক্ষেত্রে জন্মসনদ দেখাতে হবে। এতে ঈদের আগে ব্যবসায়ী ও খামারিদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উদ্বেগ

মুর্শিদাবাদের মতো সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত এলাকায় এই নির্দেশনা ‘দ্বিধা, ক্ষোভ ও উদ্বেগ’ তৈরি করেছে বলে কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী মুখ্যমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়েছেন। রাজ্য কংগ্রেস এই পদক্ষেপকে সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় চর্চায় হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে এবং বলছে, এতে পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক সম্প্রীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এদিকে মুসলিম ধর্মীয় নেতা ও সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা আইন মেনে চলার পক্ষে মত দিয়েছেন এবং প্রয়োজনে কোরবানির জন্য ছাগল বা ভেড়া বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

মানবাধিকার কর্মী কিরিটি রায় বলেন, এই বিতর্কে হিন্দুত্বভিত্তিক গরু-রাজনীতি এবং পশ্চিমবঙ্গের ভিন্নধর্মী গ্রামীণ অর্থনীতির সংঘাত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তার মতে, পুরোনো গরু বিক্রি কৃষকের অর্থনৈতিক চক্রের অংশ, যা পরিবার চালাতে এবং নতুন পশু কিনতে সাহায্য করে। কোনো রকম রূপান্তর পরিকল্পনা বা সহায়তা ছাড়া কঠোর আইন প্রয়োগ করলে নিম্নআয়ের গ্রামীণ হিন্দু পরিবারগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সর্বোপরি, ঈদের আগে পশ্চিমবঙ্গের গবাদিপশু বাজারে এই কঠোরতা এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তাপও বাড়িয়ে তুলেছে।

★★★★★

সুরমা টাইমস পড়ে ভালো লাগলো?
আপনার মতামত জানান!

গুগলে রেটিং দিন রিভিউ লিখুন ⭐
Share This Article