কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার তদন্তে নতুন অগ্রগতি এসেছে। উদ্ধার হওয়া আলামতের একটি রক্তমাখা কাপড় থেকে অজ্ঞাত এক চতুর্থ ব্যক্তির পূর্ণ ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া গেছে। এতে মামলায় শনাক্ত ডিএনএ প্রোফাইলের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে চারটিতে, আর সন্দেহভাজনের সংখ্যা নতুন করে চারজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এর আগে তনুর ওড়না, সালোয়ার ও অন্তর্বাসে তিনজন ভিন্ন পুরুষের বীর্য পাওয়া যায়। সিআইডি আলামতের বিভিন্ন অংশ থেকে তিনজন ভিন্ন পুরুষের পূর্ণ ডিএনএ প্রোফাইলও উদ্ধার করেছিল।
তনুর বাবা ইয়াওর হোসেন শুরু থেকেই দাবি করে আসছেন, “আমার মেয়ের হত্যায় ক্যান্টনমেন্টের আরও অনেকেই জড়িত।”
২০১৬ সালের ২০ মার্চ রাতে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের পাওয়ার হাউস এলাকার একটি কালভার্টের পাশের ঝোপ থেকে তনুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সেদিন ১১ ধরনের আলামত জব্দ করে সিআইডির ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবে পাঠানো হয়।
দশ বছর পর মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইর পরিদর্শক (তদন্ত) মো. তারিকুল ইসলাম পরীক্ষার প্রতিবেদন কুমিল্লা মুনিমুল হক আদালতে জমা দেন। সিআইডির ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবের ডিএনএ পরীক্ষক নুসরাত ইয়াসমিনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলায় মোট ২৪টি আলামত পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল।
এর মধ্যে ছিল তনুর কালো, লাল ও হলুদ প্রিন্টের কামিজ, বেগুনি ওড়না, কালো সালোয়ার, লাল ও হালকা বেগুনি অন্তর্বাস, তনুর চারটি দাঁত, ভ্যাজাইনাল সোয়াব, ৫ ফুট ও ১০ ফুট লম্বা খাকি ও হলুদ টেপ, একটি ছেঁড়া পুরুষ জুতা, একটি বলপেন এবং একটি কাপড়ের টুকরা। বাকি ১৩টি নমুনা ছিল ১৩ জন সন্দেহভাজন ব্যক্তির ডিএনএ প্রোফাইল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ওড়না, সালোয়ার ও অন্তর্বাসে মানব বীর্যের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এসব আলামতের বিভিন্ন অংশ থেকে তিনজন ভিন্ন পুরুষের পূর্ণ ডিএনএ প্রোফাইল মেলে।
আরও উল্লেখ করা হয়, একটি কাপড়ের টুকরায় রক্তের উপস্থিতি পাওয়া গেছে এবং সেখান থেকে অজ্ঞাত এক ব্যক্তির পূর্ণ ডিএনএ প্রোফাইল উদ্ধার করা হয়েছে। ওই ডিএনএ প্রোফাইলটি সালোয়ার, ওড়না ও অন্তর্বাসে পাওয়া বীর্যের ডিএনএর সঙ্গে মেলে না।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তনুর দাঁত থেকে পূর্ণ নারী ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া গেছে। কামিজ ও অন্তর্বাসে মানব রক্তের উপস্থিতি মিললেও তা তনুর দাঁত থেকে পাওয়া ডিএনএ প্রোফাইলের সঙ্গে শতভাগ মিলে গেছে। অর্থাৎ ওই রক্ত তনুর নিজের।
এছাড়া কামিজ, অন্তর্বাস, ভ্যাজাইনাল সোয়াব এবং কাপড়ের টুকরায় কোনো বীর্য পাওয়া যায়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
তদন্ত কর্মকর্তা মো. তারিকুল ইসলাম ২৩ এপ্রিল প্রতিবেদনটি গ্রহণ করেন এবং ২৫ এপ্রিল কুমিল্লা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-১ এ তা নথিভুক্তির জন্য জমা দেন।
এর আগে ২০১৭ সালের মে মাসে সিআইডি জানিয়েছিল, তনুর পোশাকে তিনজন পুরুষের বীর্য পাওয়া গেছে এবং ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের তিন সন্দেহভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে তখন তাদের নাম প্রকাশ করা হয়নি এবং ডিএনএ মিলিয়ে দেখার জন্য নমুনাও সংগ্রহ করা হয়নি।
পরে আদালতের আদেশে দাখিল করা আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা মো. তারিকুল ইসলাম তিন সন্দেহভাজনের নাম উল্লেখ করেন। তারা হলেন, কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে কর্মরত ১২ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নের সার্জেন্ট মো. জাহিদুজ্জামান (৩৮), বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের গারঘাটা এলাকার বাসিন্দা; স্ট্যাটিক সিগন্যালের ওয়ারেন্ট অফিসার মো. হাফিজুর রহমান (৪২), টাঙ্গাইল সদর উপজেলার হোগড়া গ্রামের বাসিন্দা; এবং ২ সিগন্যাল ব্যাটালিয়নের সৈনিক মো. শাহিন আলম (২৭), কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার পীরযাত্রাপুরের গোবিন্দপুর এলাকার বাসিন্দা।
গত ৬ এপ্রিল তনু হত্যা মামলার তদন্তের অগ্রগতি জানাতে তদন্ত কর্মকর্তা তারিকুল ইসলামকে আদালতে হাজির হতে বলা হয়। তিনি উপস্থিত হয়ে তিন সন্দেহভাজনের রক্তের নমুনা ডিএনএ পরীক্ষার জন্য সংগ্রহের অনুমতি চাইলে কুমিল্লা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-১ এর বিচারক মুনিমুল হক তা মঞ্জুর করেন।
এরই মধ্যে পিবিআই ঢাকার কেরানীগঞ্জের আর্শিনগরের একটি বাসা থেকে ওয়ারেন্ট অফিসার মো. হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে। পরে ২২ এপ্রিল তাকে আদালতে হাজির করা হলে সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে তদন্তকারী কর্মকর্তা কোনো তথ্য পেয়েছেন কি না, তা জানা যায়নি।
সূত্র জানায়, বাকি দুই সন্দেহভাজনের একজন বর্তমানে বিদেশে আছেন, আর অন্যজন ঢাকার বিমানবন্দর এলাকার কাছাকাছি নিখোঁজ রয়েছেন।
অজ্ঞাত এক নতুন ব্যক্তির পূর্ণ ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়ায় তনু হত্যা মামলার তদন্তে নতুন মোড় এসেছে। তনুর বাবা ইয়াওর হোসেন বরাবরই বলে আসছেন, “ক্যান্টনমেন্টের মতো নিরাপদ এলাকায় আমার মেয়ের হত্যায় বহু মানুষ জড়িত।”
তিনি বলেন, “তিনজন সন্দেহভাজন ছাড়াও আরও অনেকেই জড়িত। আমি লিখিতভাবে ছয়জনের নাম দিয়েছি, কিন্তু তা আমলে নেওয়া হয়নি।”
গত ১০ বছরে সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় চারটি তদন্ত সংস্থা ও ছয়জন তদন্ত কর্মকর্তা কাজ করলেও অগ্রগতি ছিল খুবই সীমিত। আদালতের তলবের পর মামলায় গতি আসে এবং একজন সাবেক সেনাসদস্য গ্রেপ্তার হন।
আগামী ৮ জুন তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই ঢাকার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. তারিকুল ইসলাম ২০২০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তদন্তের দায়িত্ব নেন। তিনি আদালতের কাছে মো. জাহিদুজ্জামান ও শাহিন আলমের দেশত্যাগ বা দেশে ফেরার সময় তাদের গ্রেপ্তার এবং তথ্য সংগ্রহের অনুমতিও চেয়েছেন।



