বোনের বদলে কারাগারে ছোট বোন, ঢাকার আদালতে যেন সিনেমার দৃশ্য

ঢাকার একটি আদালতে ঘটেছে সিনেমার মতো এক ঘটনা। প্রতারণার মামলায় বড় বোনের পরিবর্তে ছোট বোন আত্মসমর্পণ করে কারাগারে চলে যান। কয়েকদিন সবকিছু স্বাভাবিকই মনে হলেও, পরে ডকে দাঁড়ানো নারীর চেহারা জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের ছবির সঙ্গে না মেলায় পুরো ‘প্রক্সি’ কৌশলটি ধরা পড়ে।

গতকাল ঢাকার মহানগর হাকিম কামাল উদ্দিন তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে ওই নারীকে তিন দিনের রিমান্ডে পাঠান। একই সঙ্গে আদালত তদন্ত কর্মকর্তাকে ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন।

ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর আসামিপক্ষের আইনজীবী নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে মামলা থেকে সরে দাঁড়ানোর আবেদন করেন। গত মঙ্গলবারের ওই ঘটনায় ছোট বোন বড় বোনের নামে আত্মসমর্পণ করে কারাগারে যান বলে জানা গেছে।

তবে বৃহস্পতিবার রিমান্ড শুনানিতে বাদীপক্ষের আইনজীবীরা দাবি করেন, ডকে দাঁড়ানো নারী আসল আসামি নন। তিনি অন্য কেউ।

কীভাবে ধরা পড়ল ‘প্রক্সি’ আত্মসমর্পণ

আদালত সূত্র জানায়, ১২ মে প্রতারণার মামলায় দুই নারী আত্মসমর্পণ করেন। তাদের একজন নিজেকে শারমিন আক্তার একা পরিচয় দিয়ে জামিনের আবেদন করেন। আদালত জামিন নামঞ্জুর করে তাদের কারাগারে পাঠান।

পরে ১৪ মে রিমান্ড শুনানির জন্য শারমিনকে আদালতে হাজির করা হলে বাদীপক্ষের আইনজীবীদের সন্দেহ হয়। তারা দাবি করেন, ডকে দাঁড়ানো নারী প্রকৃত আসামি নন। এরপর বিচারক নারীকে মুখ স্পষ্ট করে দেখাতে বলেন। তখন আদালতে থাকা জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের ছবির সঙ্গে তার চেহারার সুস্পষ্ট অমিল ধরা পড়ে।

বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আদালত তদন্ত কর্মকর্তাকে আসল পরিচয় যাচাইয়ের নির্দেশ দেন।

আদালতে আইনজীবীদের বক্তব্য

রিমান্ড শুনানিতে উত্তরা পূর্ব থানার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মাহবুবুল আলম আদালতকে জানান, প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করতে ওই নারীর জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, শিক্ষাগত সনদ এবং ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করতে হবে। তাই তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী আলমগীর হোসেন আদালতে বলেন, ডকে থাকা তরুণী শারমিন আক্তার একা নন, তার নাম ভাবনা। তিনি মামলার প্রকৃত আসামি নন, কেবল বড় বোনের হয়ে ‘প্রক্সি’ আত্মসমর্পণ করেছিলেন। তিনি আদালতকে জানান, এ বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছে।

তবে তিনি দাবি করেন, যেহেতু তরুণী নিজের ভুল স্বীকার করেছেন, তাই তাকে ছেড়ে দেওয়া উচিত। অপরদিকে বাদীপক্ষের আইনজীবী রাকিবুল ইসলাম ও কাইয়ুম হোসেন নয়ন বলেন, তিনি পুরো প্রতারণা চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। তাই তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা জরুরি।

দুই পক্ষের শুনানি শেষে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

২০ কোটি টাকার আত্মসাতের অভিযোগ

মামলাটিতে আরও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ রয়েছে। উত্তরা পূর্ব থানায় করা মামলায় ব্যবসায়ী আজিজুল আলম অভিযোগ করেন, ‘প্রাচীন খুঁটি’ বিক্রির প্রলোভন দেখিয়ে একটি চক্র তাকে ফাঁদে ফেলে প্রায় ২০ কোটি ৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে। এছাড়া উত্তরা খানের ২৭ দশমিক ১৫ কাঠা জমিও তারা হুমকি দিয়ে দখলে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

শারমিন আক্তার একাসহ মোট ২৪ জনকে এ মামলায় আসামি করা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি বাদী তার বন্ধু মনিরের মাধ্যমে মিজান নামের একজনের সঙ্গে পরিচিত হন। পরে মজহারুল ইসলাম সোহেল ফকির, নাজমুল হাসান ও কামালসহ কয়েকজন তার অফিসে গিয়ে দাবি করেন, তারা প্রাচীন খুঁটি বিদেশে বিক্রি করবেন এবং বিপুল টাকা আনবেন, যার বড় অংশ তিনি লাভ হিসেবে পাবেন।

বাদীর অভিযোগ, ধর্মীয় আবহ, ‘সুন্নতি’ পোশাক এবং মিষ্টি কথার মাধ্যমে তারা তার আস্থা অর্জন করে। পরে ‘কাফেরের কথা’, ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ এবং অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার ভয় দেখিয়ে ধীরে ধীরে তাকে নিয়ন্ত্রণে নেয়।

‘জিনের মা’ ও ‘জিনের বাদশাহ’র ভয়

মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়, বিভিন্ন সময়ে আসামিরা অজ্ঞাত পদার্থ মিশিয়ে তাকে খাবার ও মিষ্টি খাওয়ায়। এতে তার স্বাভাবিক চিন্তাশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ত এবং তিনি তাদের নির্দেশ মতো চলতেন।

নিজেকে ‘জিনের মা’ পরিচয় দেওয়া এক নারী বিভিন্ন নম্বর থেকে তাকে ফোন করতেন। পরে ‘জিনের বাদশাহ’ পরিচয় দিয়ে র‍্যাসেল নামের একজন ফোন করে ৫ কোটি টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে ভয়াবহ ক্ষতি করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।

বাদীর দাবি, ২০২৫ সালের ১৫ মে পর্যন্ত বিভিন্ন তারিখে ওই চক্র প্রতারণার মাধ্যমে তার কাছ থেকে ২০ কোটি টাকারও বেশি হাতিয়ে নেয়।

এই ঘটনা আদালত, আইনজীবী মহল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।