ক্যানসার টিকায় মেলানোমার ঝুঁকি কমল ৪২ শতাংশ

ক্যানসার টিকায় মেলানোমার ঝুঁকি কমল ৪২ শতাংশ - Surma Times | Sylhet News

ব্যক্তিভিত্তিক ক্যানসার টিকায় মেলানোমার ঝুঁকি কমল ৪২ শতাংশ - Surma Times | Sylhet Newsঢাকা: ত্বকের মারাত্মক ক্যানসার মেলানোমার চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে ব্যক্তিভিত্তিক ক্যানসার টিকা। রোগীর নিজস্ব টিউমারের জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে তৈরি এই টিকা প্রচলিত রোগ প্রতিরোধক্ষমতাভিত্তিক চিকিৎসার সঙ্গে প্রয়োগ করে ক্যানসার ফিরে আসা বা মৃত্যুর সম্মিলিত ঝুঁকি ৪২ শতাংশ কমানো সম্ভব হয়েছে। এক হাজার ১৩৭ জন রোগীর ওপর পরিচালিত তৃতীয় ধাপের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় এ সাফল্য পাওয়া গেছে। গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে ২০২৬ সালের ২৩ অক্টোবর।

গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমার অপসারণ করা উচ্চ ঝুঁকির মেলানোমায় আক্রান্ত রোগীদের নিয়ে। এতে ব্যক্তিভিত্তিক এমআরএনএ টিকা ইনটিসমেরান (ভি৯৪০) এবং পেমব্রোলিজুমাব নামের একটি রোগ প্রতিরোধক্ষমতাভিত্তিক ওষুধ একসঙ্গে প্রয়োগের ফলাফল তুলনা করা হয় শুধু পেমব্রোলিজুমাব গ্রহণকারী রোগীদের ফলাফলের সঙ্গে। দুই চিকিৎসা একসঙ্গে ব্যবহারের ক্ষেত্রে ক্যানসার ফিরে আসার ঝুঁকি কমার পাশাপাশি রোগের দূরবর্তী বিস্তার ও মৃত্যুর ঝুঁকিতেও উল্লেখযোগ্য হ্রাস দেখা গেছে।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসা শুরুর দুই বছর পর টিকা ও ওষুধ একসঙ্গে গ্রহণকারী রোগীদের ৮২ দশমিক ২ শতাংশের ক্যানসার ফিরে আসেনি। বিপরীতে, শুধু পেমব্রোলিজুমাব গ্রহণকারী রোগীদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ৭০ শতাংশ। অর্থাৎ, দুই চিকিৎসার সমন্বয়ে ক্যানসার পুনরায় দেখা দেওয়ার বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে ভালো ফল পাওয়া গেছে।

গবেষকদের হিসাব বলছে, টিকা ও ওষুধ একসঙ্গে প্রয়োগে ক্যানসার ফিরে আসা বা মৃত্যুর সম্মিলিত ঝুঁকি ৪২ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে ক্যানসার শরীরের দূরবর্তী অংশে ছড়িয়ে পড়া অথবা মৃত্যুর ঝুঁকি কমেছে ৩৮ শতাংশ। অস্ত্রোপচারের পর ক্যানসার ফিরে আসার আশঙ্কা যেসব রোগীর ক্ষেত্রে বেশি, তাঁদের চিকিৎসায় এই ফল বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

সাধারণত প্রচলিত টিকা সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে ব্যবহৃত হয়। তবে ইনটিসমেরান ভিন্ন উদ্দেশ্যে তৈরি। এটি ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় সহায়তা করার জন্য উদ্ভাবিত একটি ব্যক্তিভিত্তিক টিকা, যা বার্তাবাহক আরএনএ বা এমআরএনএ প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল।

এই পদ্ধতিতে প্রথমে রোগীর টিউমারের জিনগত পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়। সেই বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট রোগীর জন্য আলাদাভাবে টিকা তৈরি করা হয়। ফলে একই ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত হলেও প্রত্যেক রোগীর টিকা এক রকম নাও হতে পারে। টিকা তৈরির মূল লক্ষ্য হলো, নির্দিষ্ট রোগীর ক্যানসার কোষের বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করতে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে আরও কার্যকরভাবে প্রস্তুত করা।

ক্যানসারের চিকিৎসায় এ ধরনের পদ্ধতির গুরুত্ব রয়েছে অস্ত্রোপচারের পরও শরীরে ক্যানসার কোষ থেকে যাওয়ার আশঙ্কার কারণে। দৃশ্যমান টিউমার অপসারণ করা হলেও কিছু ক্যানসার কোষ শরীরে রয়ে যেতে পারে, যা পরবর্তী সময়ে রোগটি আবার ফিরে আসার কারণ হতে পারে। ব্যক্তিভিত্তিক টিকাটি রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে ক্যানসার কোষের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য চিনতে প্রশিক্ষিত করার মাধ্যমে এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। এর ফলে অবশিষ্ট ক্যানসার কোষ শনাক্ত করে আক্রমণ করার ক্ষেত্রে শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধব্যবস্থা আরও কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

তবে গবেষণার ফল আশাব্যঞ্জক হলেও এই টিকাকে এখনই সব ধরনের ক্যানসারের চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। পরীক্ষাটি নির্দিষ্টভাবে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমার অপসারণ করা উচ্চ ঝুঁকির মেলানোমা রোগীদের ওপর পরিচালিত হয়েছে। তাই অন্যান্য ধরনের ক্যানসারে একই পদ্ধতি কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

এ ছাড়া, চিকিৎসাটির দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা এবং রোগীদের সামগ্রিকভাবে বেঁচে থাকার ওপর এর প্রভাব সম্পর্কে আরও তথ্য প্রয়োজন। দুই বছর পর পাওয়া ফলাফল চিকিৎসার সম্ভাবনা তুলে ধরলেও দীর্ঘ সময় ধরে রোগীদের পর্যবেক্ষণ করলে এর সুফল কতটা স্থায়ী হচ্ছে, সে বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। টিকাটি এখনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পায়নি। ফলে গবেষণায় পাওয়া সাফল্যকে সরাসরি নিয়মিত চিকিৎসায় ব্যবহারের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

গবেষকদের প্রত্যাশা, রোগীর জিনগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারণের এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন গবেষণার পথ তৈরি করবে। বিশেষ করে অস্ত্রোপচারের পর রোগ ফিরে আসার ঝুঁকি কমাতে ব্যক্তিভিত্তিক চিকিৎসার সম্ভাবনা আরও বিস্তৃত হতে পারে। তবে মেলানোমার বাইরে অন্য ক্যানসারের চিকিৎসায় এই পদ্ধতি কার্যকর কি না, তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন হবে পৃথক ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি মূল্যায়ন।

সব মিলিয়ে, ইনটিসমেরান ও পেমব্রোলিজুমাবের সমন্বিত প্রয়োগের ফল মেলানোমার চিকিৎসায় ব্যক্তিভিত্তিক টিকার সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করেছে। তবে এই সাফল্য কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং বৃহত্তর পরিসরে রোগীদের চিকিৎসায় কীভাবে কাজে লাগানো যাবে, তা নির্ধারণে পরবর্তী গবেষণা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।

★★★★★

সুরমা টাইমস পড়ে ভালো লাগলো?
আপনার মতামত জানান!

গুগলে রেটিং দিন রিভিউ লিখুন ⭐
Share This Article