গুমের ৬১ দিন: কবরের মতো কক্ষে বন্দিজীবনের কথা শোনালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

গুমের ৬১ দিন: কবরের মতো কক্ষে বন্দিজীবনের কথা শোনালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী - Surma Times | Sylhet News

গুমের ৬১ দিন: কবরের মতো কক্ষে বন্দিজীবনের কথা শোনালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী - Surma Times | Sylhet Newsঢাকা, ৩০ আগস্ট: গুমের শিকার হয়ে ভারতের শিলংয়ে নিয়ে যাওয়ার সেই ৬১ দিনের ভয়ংকর অভিজ্ঞতা এবার নিজ মুখে তুলে ধরলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরে আয়োজিত এক প্রদর্শনী ও প্যানেল ডিসকাশন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি স্মরণ করেন গুম থাকাকালীন সেই দুঃসহ দিনগুলোর কথা। ‘মায়ের ডাক’ প্লাটফর্মের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে বসেছিল ভুক্তভোগীদের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার এক প্রদর্শনীও।

নিজের বর্ণনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, চোখ ও হাত বেঁধে সীমান্ত পার করিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ভারতের শিলংয়ে। তিনি বলেন, গুম অবস্থায় প্রতিটি মুহূর্তে মনে হতো পরের ভোরটি তিনি দেখতে পারবেন কি না। বন্দিদশায় দিনের আলো দেখার কোনো সুযোগ ছিল না, সকালের নাশতা এলে বোঝা যেত সকাল হয়েছে। নখের আঁচড় দিয়ে দেয়ালে দাগ কেটে কেটে দিন গুনতেন তিনি। সালাহউদ্দিন আহমদের ভাষায়, সেই ৬১ দিনের প্রতিটি মিনিট, প্রতিটি মুহূর্ত যদি লিখে রাখা যেত, তাহলে তা দিয়ে জাদুঘরের সংকলন নয়, তৈরি হতো গোটা একটি কিতাব।

বন্দিদশার বর্ণনায় উঠে আসে এক ভয়াবহ চিত্র। প্রায় ৮ ফুট বাই ৪ ফুটের একটি সংকীর্ণ স্থানে রাখা হতো তাকে, যা দেখতে ছিল অনেকটা কবরের মতো। সেখানে ছিল একটি পানির কল আর প্রস্রাব-পায়খানার জন্য একটি ছিদ্র। দুর্গন্ধের পাশাপাশি দেখা যেত বিষাক্ত পোকামাকড়ও। মেঝেতে একটি কম্বল পেতে ঘুমাতে হতো, বালিশ ছিল পাতলা একটি।

খাবার, পানি ও ওষুধ নিয়মিত মিললেও অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসকের সহায়তা পাওয়া যেত না বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। নিজের হার্টে স্টেন্টিং থাকার কথা, কিডনি জটিলতার কথা গুমকারীদের বারবার জানিয়েছিলেন তিনি, এমনকি বলেছিলেন, মৃত্যু হলে যেন লাশটা অন্তত পরিবারের কাছে ফেরত দেওয়া হয়। একদিন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। খাবার দিতে এসে তার কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে দরজা খোলা হয়, গামছা ফেলে টেনে তোলা হয় তাকে। বুকে তীব্র ব্যথার কথা জানালে জবাব আসে, এখানে ডাক্তার আসা নিষেধ। এরপর নিজে নিজেই সুস্থ থাকার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়েছিল তাকে।

এর কিছুদিন পর তাকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়। সেদিন সকালে পানি কম খেতে বলা হয়েছিল তাকে, তখনই মনে হয়েছিল হয়তো এটাই শেষ দিন। মোটা কাপড় দিয়ে চোখ বেঁধে, হাত বেঁধে তাকে তোলা হয় একটি মাইক্রোবাসে, গাড়িতে আরও কয়েকজন ছিলেন বলে তার ধারণা। কয়েক ঘণ্টা যাত্রার পর একটি স্থানে দীর্ঘ সময় বসিয়ে রাখা হয়, এরপর কিছুটা হাঁটিয়ে তোলা হয় একটি জিপের মতো গাড়িতে। আবার দীর্ঘ পথ, তারপর এক উঁচু জায়গায় পৌঁছানো। চারপাশে মানুষের হিন্দিতে কথাবার্তা শুনে তিনি নিশ্চিত হন, তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ভারতের কোনো এলাকায়। নির্জন এক জায়গায় ফুটপাতে নামিয়ে দিয়ে বলা হয়, ‘ইউ আর ফ্রি নাউ’।

আরও কয়েক ঘণ্টা গাড়িতে চলার পর ভোরের দিকে তার চোখ খুলে দেওয়া হয়। সামনে দেখতে পান একটি চৌরাস্তা, ক্যান্টনমেন্ট এলাকা আর একটি বড় মাঠ। পরে জানতে পারেন, জায়গাটি শিলংয়ের গলফ লিংক এলাকা। ততক্ষণে পা ফুলে গিয়ে ঠিকমতো হাঁটতেও পারছিলেন না তিনি। আশপাশের পথচারীদের সাহায্য চাইলেও দাড়ি, ময়লা পোশাক ও শারীরিক অবস্থা দেখে অনেকে তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন ভেবে বসেন।

পরে পুলিশে খবর দেওয়া হলে তাকে নেওয়া হয় একটি বিট হাউসে। সেখানেও নিজের পরিচয় দেওয়ার পর প্রথমে বিশ্বাস করা হয়নি তার কথা। এরপর তাকে পাঠানো হয় শিলং সিভিল হাসপাতালে, সেখান থেকে নর্থ ইস্টার্ন ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড সায়েন্সেসে অর্থাৎ মিমহানসে। সেখানকার এক চিকিৎসকের কাছে নিজের পরিচয় ও পরিবারের ফোন নম্বর দিয়ে যোগাযোগের অনুরোধ জানান সালাহউদ্দিন আহমদ। এক পর্যায়ে সেই নম্বরে বাংলাদেশে ফোন করা হয়। তার স্ত্রী তখন বাইরে থাকায় প্রথম কলটি ধরতে পারেননি, পরে বিদেশি নম্বর দেখে কলব্যাক করেন। ফোনে পরিচয় দেওয়ামাত্র স্ত্রী চিৎকার করে বলে ওঠেন, আমি জান্নাত পেয়ে গেছি। এই মুহূর্তটিকে জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা বলে বর্ণনা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

শিলং সিভিল হাসপাতালে চিকিৎসকের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় তার মানসিক সুস্থতার বিষয়টি। কড়া পুলিশি নজরদারির মধ্যেও দূর থেকে একটি ভারতীয় টেলিভিশন ক্যামেরা তার একটি মুহূর্ত ধারণ করে ফেলে, যেখানে মাত্র এক সেকেন্ডের জন্য তিনি বলেছিলেন, ‘ইয়েস, আই অ্যাম সালাহউদ্দিন’। পরে সেই ভিডিও প্রচারিত হয় বাংলাদেশে। এরপর ভারতে তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে ফরেনার্স অ্যাক্টের মামলায় মুখোমুখি হতে হয় দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের। বছরের পর বছর আদালতের প্রক্রিয়া পেরিয়ে অবশেষে তৈরি হয় দেশে ফেরার পথ।

দেশে ফিরতে পারার পেছনে বাংলাদেশের মানুষ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের অবদানের কথা স্মরণ করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘ ফ্যাসিজম থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করেছেন যারা, গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছেন যারা, তাদের প্রতিই তার এই কৃতজ্ঞতা।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই আত্মকথন কেবল একজন ব্যক্তির বেঁচে ফেরার গল্প নয়। এটি একইসঙ্গে দেশের গুম রাজনীতির নির্মম বাস্তবতার একটি জীবন্ত দলিল হয়ে থাকল, যা আগামী দিনে গুম সংক্রান্ত জাতীয় বিতর্ক ও আইনি সংস্কারের আলোচনায়ও গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হয়ে দাঁড়াতে পারে।

★★★★★

সুরমা টাইমস পড়ে ভালো লাগলো?
আপনার মতামত জানান!

গুগলে রেটিং দিন রিভিউ লিখুন ⭐
Share This Article