সুরমা টাইমস ডেস্কঃ সিলেটের ওসমানীনগরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে দুই যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৯ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ২৪ জন। প্রাথমিক তদন্তে দুর্ঘটনার পেছনে চালকদের গাফিলতি, অতিরিক্ত গতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিংকে দায়ী করছে পুলিশ। দুর্ঘটনার পর দুই বাসের চালকই পালিয়ে গেছেন। তাদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) সকাল ৭টা ১০ মিনিটের দিকে উপজেলার কাশিকাপন এলাকায় ঢাকাগামী ইউনিক পরিবহন ও সিলেটগামী বেঙ্গল পরিবহনের মধ্যে এ সংঘর্ষ ঘটে। সংঘর্ষের তীব্রতায় ইউনিক পরিবহনের বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের ধানক্ষেতে পড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই সাতজন মারা যান। পরে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও দুজনের মৃত্যু হয়। নিহতদের সবাই ইউনিক পরিবহনের যাত্রী ছিলেন।
ফুটেজে যা দেখা গেছে
দুর্ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও বিশ্লেষণ করেছে পুলিশ। ইউনিক পরিবহনের বাসের পেছনে থাকা একটি গাড়ির ড্যাশক্যামে ফুটেজটি ধারণ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শেরপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনিসুর রহমান জানান, পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই ভিডিও সংগ্রহ করে। ফুটেজে দেখা যায়, ইউনিক পরিবহনের বাসটি কয়েক দফা সড়কের ডান পাশে গিয়ে ওভারটেকের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে আবার বাম লেনে ফিরে আসে। ঠিক তখন বিপরীত দিক থেকে দ্রুতগতিতে আসা বেঙ্গল পরিবহনের স্লিপার বাসটি ইউনিক বাসের সামনের অংশে ধাক্কা দেয়। এতে ইউনিক বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের খাদে পড়ে যায়।
তবে ঘটনাস্থলে থাকা কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, সামনে থাকা একটি পিকআপ ভ্যানকে ওভারটেক করতে গিয়ে বেঙ্গল পরিবহনের বাসটি বিপরীত লেনে চলে আসে। এরপরই ইউনিক পরিবহনের বাসের সঙ্গে সেটির সংঘর্ষ হয়। ফলে দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করতে পুলিশ আরও তদন্ত করছে।
পুলিশের বক্তব্য
ওসি আনিসুর রহমান বলেন, সকালে মহাসড়ক ফাঁকা থাকায় দুই বাসই দ্রুতগতিতে চলছিল। একে অপরকে অতিক্রম করার প্রতিযোগিতার মধ্যে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুই চালকই ‘ঘুমঘুম চোখে’ গাড়ি চালাচ্ছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে। অতিরিক্ত গতির কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটতে পারে। তবে বিষয়টি আরও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
দুর্ঘটনার পর দুই বাসের চালক পালিয়ে যাওয়ায় তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। এ ঘটনায় মামলা করার প্রস্তুতিও চলছে বলে জানিয়েছে হাইওয়ে পুলিশ।
উদ্ধার ও চিকিৎসা
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস, শেরপুর হাইওয়ে পুলিশ ও ওসমানীনগর থানা পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে সাতজনের মরদেহ উদ্ধার করে হাইওয়ে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন। নিহতদের মধ্যে সাতজনের মরদেহ শেরপুর হাইওয়ে থানায় এবং দুজনের মরদেহ সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছিল।
ওসমানীনগর ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কর্মকর্তা মো. অপু মিয়া বলেন, খাদে পড়ে যাওয়া ইউনিক পরিবহনের বাসেই হতাহত বেশি হয়েছে। নিহত সবাই ওই বাসের যাত্রী।
ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. উমর রাশেদ মুনীর জানান, দুর্ঘটনার পর হাসপাতালের ক্যাজুয়ালিটি বিভাগে ১৬ জনকে ভর্তি করা হয়। পরে কয়েকজনকে নাক-কান-গলা, চক্ষু ও নিউরোসার্জারি বিভাগে স্থানান্তর করা হয়।
নিউরোসার্জারি বিভাগে ভর্তি তিনজনের মধ্যে একজনের সিটি স্ক্যান রিপোর্ট স্বাভাবিক এসেছে। একজনের সিটি স্ক্যান তখনো সম্পন্ন হয়নি। অপর একজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি ১৬ জনের মধ্যে একজন শিশুকে প্রথমে মৃত ঘোষণা করা হয় এবং পরে আরও একজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। বাকি ১৪ জনের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানান হাসপাতাল পরিচালক।
দুর্ঘটনায় আহত কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের বাসিন্দা ফারুক মিয়া (৫২) বলেন, পাঁচ বন্ধু মিলে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করতে সিলেটে এসেছিলেন। দুর্ঘটনার সময় তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। বিকট শব্দে ঘুম ভাঙার পর স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। তার বন্ধু সাইফুল ইসলাম নিহত হয়েছেন বলে জানান তিনি।
নিহতদের পরিচয়
নিহতরা হলেন কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর থানার লক্ষ্মীপুর গ্রামের মৃত সাফিউদ্দিনের ছেলে হাজি সাইফুল ইসলাম (৫০), সিলেট নগরীর দক্ষিণ সুরমা থানার চণ্ডীপুল এলাকার জাহাঙ্গীরের মেয়ে শিশু জাইফা ইসলাম ফাইজা (৪), সিলেটের সোবহানীঘাট এলাকার উত্তম রায়ের ছেলে সপ্তম রায় প্রীতম (২২), কিশোরগঞ্জের ভৈরব থানার চণ্ডিবের গ্রামের বাবুল মিয়ার মেয়ে বাউলশিল্পী পেহেলী ভৈরবী (১৭), ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থানার বগডহর গ্রামের মৃত বারেক মিয়ার ছেলে আবুল হোসেন (৪৪), সিলেটের জৈন্তাপুর থানার উমনপুর গ্রামের রফিকুল ইসলামের ছেলে আরমান (১৯), কুমিল্লার বাঙ্গুরা বাজার থানার পীরকাশিমপুর গ্রামের আব্দুস সালামের ছেলে সানিয়াদ জাহাঙ্গীর সৌরভ (৩৯), ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার শেরপুর গ্রামের সিরাজুল ইসলামের ছেলে মো. সাইফুল ইসলাম ইমন এবং কিশোরগঞ্জের নিকলী থানার ষাইধার বা আটরামপুর গ্রামের রঞ্জিত সূত্রধরের ছেলে রুবেল সূত্রধর (৩৭)।
নিহত পেহেলী ভৈরবী বাউলশিল্পী ছিলেন। পরিচিতজনেরা জানান, তিনি সিলেটে একটি অনুষ্ঠানে গান গেয়ে ঢাকার দিকে ফিরছিলেন। নিহত নয়জনের পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
দুর্ঘটনার পর মহাসড়কে কিছু সময় যান চলাচল ব্যাহত হলেও বর্তমানে ওই সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।







