ছাতক (সুনামগঞ্জ), ৪ আগস্ট: সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার সদর ইউনিয়নের বাউসা-কেশবপুর গ্রামে সুরমা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে বসতভিটা, ফসলি জমি, গাছপালা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে শতবর্ষী পূর্ব বাউসা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ এবং বাউসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীতে হারিয়ে গেছে।
স্থানীয়রা জানান, বর্ষা এলে সুরমা নদী ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। প্রবল স্রোত ও ঢেউয়ের আঘাতে নদীতীরের মাটি ধসে পড়ে নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে একের পর এক এলাকা। বছরের পর বছর ধরে চলা এ ভাঙনে বাউসা ও কেশবপুর গ্রামের বিস্তীর্ণ অংশ ইতোমধ্যে নদীর বুকে তলিয়ে গেছে। তবে স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় প্রতি বছরই নতুন নতুন এলাকা ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দাদের ভাষ্য, কয়েক বছর আগেও যেখানে সবুজ ধানের ক্ষেত, ফলের বাগান, শিশুদের খেলার মাঠ, বসতঘর ও ঐতিহ্যবাহী মসজিদ ছিল, সেখানে এখন শুধু অথৈ পানি আর নদীর গর্জন। তারা বলছেন, ভাঙন শুধু জমি বা ঘর কেড়ে নিচ্ছে না, গ্রামটির স্মৃতি, ইতিহাস ও অস্তিত্বও ধীরে ধীরে মুছে দিচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকরাও একই অভিযোগ করে বলেন, একসময় নিজেদের জমিতে চাষাবাদ করে স্বচ্ছলভাবে সংসার চালালেও এখন তারা নিঃস্ব। জমি হারিয়ে অনেকেই দিনমজুর, রিকশাচালক বা শ্রমিকের কাজ করে পরিবার চালাচ্ছেন। পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি হারিয়ে বহু পরিবার অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
এলাকাবাসীর সবচেয়ে বড় উদ্বেগ শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি নিয়ে। শতবর্ষের ইতিহাস বহনকারী পূর্ব বাউসা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় তারা গভীরভাবে মর্মাহত। একইভাবে বাউসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হারিয়ে যাওয়ায় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, একটি বিদ্যালয় একটি গ্রামের ভবিষ্যৎ গড়ার কেন্দ্র, আর একটি মসজিদ মানুষের বিশ্বাস ও সামাজিক বন্ধনের প্রতীক। সেই দুটি স্থাপনাই এখন নদীতে হারিয়ে যাওয়ায় গ্রামবাসীর মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা আরও বেড়েছে।
নদীভাঙনে এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদীতীরবর্তী সড়কের বিভিন্ন অংশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের চলাচলে দুর্ভোগ বাড়ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে গুরুত্বপূর্ণ সড়কও নদীগর্ভে চলে যেতে পারে।
এ বিষয়ে ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মহি উদ্দিন নদীভাঙনের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, সুরমা নদীর ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হয়েছে এবং করণীয় বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এখন বাউসা-কেশবপুরের মানুষের একটাই দাবি, আর আশ্বাস নয়, দ্রুত বাস্তব পদক্ষেপ। তারা বলছেন, টেকসই বাঁধ ও তীররক্ষা ব্যবস্থা না নিলে আগামী বর্ষায় আরও বিস্তীর্ণ জনপদ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।






